• রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ১০:২৭ পূর্বাহ্ন
Headline
তৈরি পোশাকের পর বিশ্ববাজার কাঁপাবে বাংলাদেশের গরুর মাংস নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের মাধ্যমে ভাসানীর স্বপ্নপূরণ নেহেরুর বহুমাত্রিক ভারত বদলে যাচ্ছে মোদির হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রে বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিয়ে সুতোয় ঝুলছে বাংলাদেশের কোটি দর্শক যে কারণে শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসা অসম্ভব পরিত্যক্ত সম্পত্তির আড়ালে গায়েব হওয়া ত্রিশ বিলিয়ন ডলার অন্তর্বর্তী সরকারে ‘কিচেন ক্যাবিনেট’: নেপথ্যের ছায়া ক্ষমতা নাকি শুধুই রাজনৈতিক মিথ? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম একশো দিনের সফল শাসনকাল ঈদুল আজহা এলেই সিজনাল সুশীলদের প্রাণিপ্রেমের অদ্ভুত মায়াকান্না শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ

যে কারণে শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসা অসম্ভব

Reporter Name / ২ Time View
Update : রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গত দুই বছর ধরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ। তিনি কি আর কখনো দেশে ফিরবেন? সম্প্রতি ভারতের প্রভাবশালী পত্রিকা আনন্দবাজারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, খুব শিগগিরই তিনি দেশে ফিরে গণতান্ত্রিক পরিবেশ পুনরুদ্ধারে কাজ শুরু করবেন। এর আগে দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে এক অনলাইন ভার্চুয়াল সভাতেও তিনি দ্রুত দেশে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এমনকি আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি এমনও মন্তব্য করেছেন যে, এই নির্বাচনই শেষ নয়; আবারও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং সেই নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হবে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বাস্তবতার নিরিখে বিচার করলে স্পষ্টই বোঝা যায়, তাঁর এসব বক্তব্য কেবলই কথার কথা। মূলত দলের চরম হতাশ ও বিপর্যস্ত নেতাকর্মীদের ভেঙে যাওয়া মনোবল চাঙ্গা করার জন্যই তিনি এমন আশার বাণী শোনাচ্ছেন। কিন্তু পর্দার আড়ালের কঠিন বাস্তবতা হলো, স্বয়ং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা খুব ভালো করেই জানেন যে, শেখ হাসিনার পক্ষে আর কোনোভাবেই স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসা সম্ভব নয়। এর পেছনে বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অকাট্য কারণ রয়েছে।

সাংগঠনিক কাঠামোর চরম বিপর্যয়

প্রথম ও প্রধান কারণটি হলো, বাংলাদেশের মাটিতে বর্তমানে আওয়ামী লীগ নামের রাজনৈতিক দলটির কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। গত বছরের মে মাসে সরকারিভাবে আওয়ামী লীগের সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু আনুষ্ঠানিক এই নিষেধাজ্ঞার প্রায় ১০ মাস আগে থেকেই অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুলাই মাসের শেষার্ধ থেকে বাংলাদেশে দলটির কার্যক্রম কার্যত বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১০ মাস পর ইউনূস সরকার দলটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করে এক অর্থে দলটিকে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাওয়ার হাত থেকে এক অদ্ভুত উপায়ে বাঁচিয়ে দিয়েছে। যেভাবে একসময় জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে কার্যত বিলুপ্তির পথে হেঁটেছিল, ঠিক একই পরিণতি ভোগ করতে হতো আওয়ামী লীগকেও।

বর্তমানে হয়তো অনলাইনে বা ভার্চুয়াল জগতে দলটির কিছু অস্তিত্ব টিকে আছে, কিন্তু গত দুই বছরে বাংলাদেশের রাজপথে বা মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন বা কার্যক্রম দেখা যায়নি। হঠাৎ করে কোনো এক গলিতে দু-একজন নেতার ঝটিকা মিছিল বা স্লোগান দেওয়া আসলে দলটির সাংগঠনিক বিলুপ্তিরই এক করুণ প্রমাণ বহন করে। বর্তমানে রাজনীতির মাঠের যে সার্বিক পরিস্থিতি, তাতে আগামী দুই-তিন বছরেও আওয়ামী লীগ যে সাংগঠনিকভাবে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, এমন সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।

একটি দলের কার্যক্রম পুরোপুরি নিষিদ্ধ থাকলেও তাদের কিছু অন্তর্নিহিত শক্তি থাকে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের মতো একটি প্রাচীন রাজনৈতিক দল, যাদের একসময় দেশের সাংস্কৃতিক বলয় এবং বুদ্ধিজীবী মহলে ব্যাপক আধিপত্য ও প্রভাব ছিল, তাদের রাতারাতি এভাবে শূন্য হয়ে যাওয়ার কথা ছিল না। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসনের চরম প্রতিকূল পরিবেশেও যখন আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তখনও কিন্তু সাংস্কৃতিক চর্চা ও বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দলটি নিজেদের সক্রিয়তা ধরে রেখেছিল। কিন্তু বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন; সেই পুরোনো প্রতিরোধ বা টিকে থাকার ক্ষমতা দলটির আর নেই।

শেখ হাসিনা নিজে দেশের বাইরে থেকে বারবার দলের কর্মী-সমর্থকদের সামাজিক ও পেশাজীবী কার্যক্রমে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি এমনকি এও বলেছেন যে, যদি দলের মূল ব্যানারে কাজ করা সম্ভব না হয়, তবে স্বতন্ত্রভাবে বা অন্য কোনো সামাজিক দলের ব্যানারে হলেও তারা যেন নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যান। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাঁর এই আকুল আহ্বানে দলের কেউ তেমন কোনো সাড়া দেননি। একসময় যে দলে শেখ হাসিনার কথাই ছিল শেষ কথা ও অলঙ্ঘনীয় নির্দেশ, আজ তাঁর কথাতেই যখন নেতাকর্মীরা সাড়া দিচ্ছেন না, তখন বুঝতে হবে যে, তাঁর কথা শোনার মতো বিশ্বস্ত নেতাকর্মী বা সমর্থক আসলেই দলে আর অবশিষ্ট নেই। এই চরম সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটিয়ে উঠে মাঠে আওয়ামী লীগের সক্রিয়তা ফিরে আসতে আরও কয়েক বছর সময় লেগে যাবে। আর যদি ফেরেও, সেটি হয়তো দলীয় ব্যানারে নয়, বরং কোনো সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন বা নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটির মতো ভিন্ন কোনো আবরণে।

আইনি বাধা এবং ফাঁসির দড়ির আতঙ্ক

সামাজিক বা সাংস্কৃতিক ব্যানারে দলের নেতাকর্মীরা হয়তো নিজেদের কিছুটা গুছিয়ে নিতে পারবেন, কিন্তু এই পরিস্থিতি শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে আবার প্রত্যক্ষ রাজনীতি করার কোনো নিশ্চয়তা প্রদান করে না। বরং বর্তমান আইনি বাস্তবতায় দেশে ফিরলে তাঁকে সরাসরি ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হতে পারে। কারণ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) রায়ে ইতিমধ্যে তাঁর মৃত্যুদণ্ড বা ফাঁসির আদেশ ঘোষিত হয়েছে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, আইনি কাঠামো অনুযায়ী এই রায়ের বিরুদ্ধে তাঁর উচ্চ আদালতে আপিল করার মতো কোনো সুযোগ আর অবশিষ্ট নেই। এর অর্থ হলো, তিনি যদি কোনোভাবে দেশে ফেরেন, তবে দেশে পা রাখামাত্রই তাঁর এই ফাঁসির রায় কার্যকর করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা প্রশাসনের সামনে কোনো ধরনের আইনি বাধা থাকবে না। জীবনের এই চরম ঝুঁকি নিয়ে কোনো রাজনৈতিক নেতার পক্ষেই দেশে ফেরা সম্ভব নয়।

ভারতের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ও কূটনৈতিক নীতি

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পথে আরেকটি বড় দেয়াল হলো স্বয়ং ভারত রাষ্ট্র। যখন কোনো ব্যক্তির নিজ দেশে ফিরে গেলে নিশ্চিত প্রাণহানি বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তখন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি ও ভারতের স্বাভাবিক কূটনৈতিক প্র্যাকটিস অনুযায়ী সেই ব্যক্তিকে কোনোভাবেই তাঁর নিজ দেশে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হয় না। ইতিহাস এর সাক্ষী। ঠিক এই একই কারণে তিব্বতের নির্বাসিত আধ্যাত্মিক নেতা দালাইলামাকে ভারত কখনোই চীনে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। এই নীতির আলোকেই ভারত সরকার শেখ হাসিনাকেও বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেবে না।

এই বিষয়টি আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অতীতের দিকে ফিরে তাকানো যেতে পারে। যখন তারেক রহমান যুক্তরাজ্যের লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছিলেন, তখন তাঁর দেশে ফেরাটা কেবল তাঁর নিজের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল ছিল না। যেহেতু বাংলাদেশের আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে সাজা ঘোষিত ছিল, তাই যুক্তরাজ্য সরকার তাঁকে ছাড়তে রাজি ছিল না। এমনকি শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই তিনি চাইলেই দেশে ফিরতে পারেননি। যুক্তরাজ্য সরকার যখন সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত হতে পেরেছিল যে, তারেক রহমান দেশে ফিরলে তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে আর কোনো ধরনের সংকট বা ঝুঁকি থাকবে না, ঠিক তখনই তাঁকে ব্রিটেন ত্যাগের আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও ভারতের অবস্থান ঠিক একই রকম হবে। শেখ হাসিনা কেবল তখনই ভারত থেকে বাংলাদেশে নিরাপদে ফিরতে পারবেন, যখন বাংলাদেশের কোনো আদালত তাঁকে সব অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দেবে। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক ও আইনি প্রেক্ষাপটে এমনটি ঘটার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা দূরদূরান্ত পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।

রাজনৈতিক মেরুকরণের জটিল সমীকরণ

শেখ হাসিনাকে আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্ত করতে হলে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টকে সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকেই বেআইনি বা অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করতে হবে। বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশ সরকারকে একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এই ট্রাইব্যুনাল বাতিল করে এর দেওয়া আগের সব রায় বাতিল বা অকার্যকর ঘোষণা করতে হবে। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার শেখ হাসিনার সাজা বাতিল করার জন্য এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেবে, তার কোনো ন্যূনতম সম্ভাবনা নেই। বরং বিএনপি দীর্ঘকাল ধরেই শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিচারের দাবিতে অনড় রয়েছে।

তবে রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। বিএনপি ১৮০ ডিগ্রি অবস্থান পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগের পক্ষে তখনই দাঁড়াবে, যখন তাদের সামনে রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার আর কোনো দ্বিতীয় উপায় থাকবে না। সেই চরম নিরুপায় অবস্থা তখনই তৈরি হতে পারে, যখন প্রবল কোনো গণআন্দোলনের মুখে বিএনপি সরকারের পতন ঘটার উপক্রম হবে এবং আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের সুযোগ পাবে। কিন্তু বাংলাদেশের গত ৭৭ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, আওয়ামী লীগ কখনোই একটি সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনো পথে ক্ষমতায় যেতে পারেনি। নির্বাচন ব্যবস্থা যেমনই হোক না কেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাস বরাবরই কোনো না কোনো গণতান্ত্রিক বা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। রাজপথে সহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠিত সরকারের পতন ঘটিয়ে জোরপূর্বক ক্ষমতায় বসা বা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কালচার বা সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে না।

এই সমীকরণে একমাত্র বিকল্প হতে পারে জামায়াতে ইসলামী। যদি ভবিষ্যতে জামায়াতে ইসলামী দেশে একটি প্রবল ও অপ্রতিরোধ্য সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলে এবং সেই আন্দোলনের চাপে বিএনপির সামনে রাজনৈতিকভাবে বাঁচার আর কোনো উপায় না থাকে, কেবল তখনই তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে বাধ্য হয়ে আওয়ামী লীগের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়াতে পারে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন উদাহরণ বিরল নয়। পাকিস্তানের রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) অপ্রতিরোধ্য জনপ্রিয়তার হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য চিরশত্রু পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ) এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)-র মধ্যে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক মিলন ঘটেছিল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জামায়াত বা এনসিপি যদি ভবিষ্যতে ঠিক ততটাই পরাক্রমশালী ও অপ্রতিরোধ্য রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়, তবে অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে একটি অলিখিত আঁতাত বা মিলন ঘটা অস্বাভাবিক কিছু হবে না। তবে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি রাজনৈতিক অধ্যায়, এবং এমন মেরুকরণ ঘটতে এখনও বিস্তর সময়ের প্রয়োজন।

বয়সের ভার ও নিঃসঙ্গ প্রবাস জীবন

কিন্তু সবচেয়ে বড় নির্মম সত্য হলো, শেখ হাসিনার হাতে এখন আর সেই সময়টুকু অবশিষ্ট নেই। গত দুই বছরের দীর্ঘ সময়ে তিনি একবারের জন্যও প্রকাশ্যে জনসমক্ষে আসেননি। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তাঁর অডিও বার্তাগুলোর গলার স্বর এবং কথা বলার ধরন গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, মানসিকভাবে তিনি অনেকটাই ভেঙে পড়েছেন। তাঁর বয়স এখন ৭৯ বছর চলছে। এই পড়ন্ত বয়সে আর চার-পাঁচ বছর তিনি যে সম্পূর্ণ সুস্থভাবে বেঁচে থাকবেন বা সক্রিয় রাজনীতি করার মতো শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন, এমন নিশ্চয়তা চিকিৎসাবিজ্ঞানও দিতে পারে না।

বিশেষ করে বিদেশের মাটিতে সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ ও একাকী অবস্থায় জীবন কাটানো যেকোনো মানুষের জন্যই অত্যন্ত কঠিন ও দুর্বিষহ। একদিকে দীর্ঘদিনের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা হারানোর চরম হতাশা, অন্যদিকে পরিবার-পরিজন থেকে যোজন যোজন দূরের বিচ্ছিন্নতা, তার ওপর আবার মাথার ওপরে ঝুলন্ত ফাঁসির রায়ের খড়গ—সব মিলিয়ে তিনি এক অবর্ণনীয় মানসিক চাপের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। এর পাশাপাশি দলের শীর্ষ নেতাদের একে একে হারানো বা দূরে সরে যাওয়ার বেদনা তাঁকে আরও বেশি বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এই বিশাল ও বহুমুখী মানসিক চাপ তিনি আর কতদিন সহ্য করতে পারবেন, তা নিশ্চিত করে বলা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।

সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সন্দেহ

তিনি যতই বিভিন্ন অডিও বার্তায় দাবি করুন না কেন যে “আমি শিগগিরই ফিরব, আবারও নির্বাচন হবে, আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে”—বাস্তবতার নিরিখে এসবই কেবল অন্তঃসারশূন্য প্রলাপ ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি যে আর কখনোই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরবেন না, এই চরম সত্যটি কিছুদিন আগেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন তাঁর নিজ পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। ওই সাক্ষাৎকারে সজীব ওয়াজেদ জয় সম্পূর্ণ প্রকাশ্যে এবং অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে অন্তত তিন থেকে চারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, তাঁর মায়ের বয়স হয়ে গেছে এবং তিনি আর কোনোদিনই প্রত্যক্ষ রাজনীতি করবেন না।

আর ইন্টারনেটে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেখ হাসিনার নামে যেসব অডিও বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে, সেগুলোর সত্যতা নিয়েও এখন যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই সময়ে, পুরোনো কণ্ঠস্বর নকল করে এমন অডিও বা ডিপফেক বার্তা বানানো একেবারেই সাধারণ একটি ব্যাপার। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ও দেশত্যাগের পর থেকে তিনি আদৌ নিজ মুখে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন কি না, তা নিয়ে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরাও শতভাগ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেন না। বরং সার্বিক পরিস্থিতি, আইনি জটিলতা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং বয়সের সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনা করলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের দেওয়া প্রকাশ্য বক্তব্যটিকেই ধ্রুব সত্য বলে মেনে নেওয়াটাই সবচেয়ে বেশি যৌক্তিক। সব বিশ্লেষণ শেষে একটি কথাই চরম সত্য হয়ে দাঁড়ায়—শেখ হাসিনা আর কখনোই রাজনীতি করবেন না, বাংলাদেশের মাটিতে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের চিরস্থায়ী সমাপ্তি ঘটে গেছে।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category