• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫১ অপরাহ্ন
Headline
মানবপাচারের মহোৎসব ও আমাদের দায় মিষ্টির শূন্য আসনে বিএনপি এলিজার মনোনয়নপত্র জমা সোনালী ব্যাংকের এমডি শওকত আলী খান পুনর্বহাল সিঙ্গাপুরে তেলের মজুত গড়বে সৌদি আরামকো ক্রসফায়ারের বক্তব্য প্রত্যাহার করে আইজিপির জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি টিআইবির চলতি বছরই ১ লাখ আনসার সদস্যকে বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা: আনসার ডিজি দুই বছরের মধ্যে জেলা পর্যায়ে ক্যানসার চিকিৎসার রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপন: স্বাস্থ্যমন্ত্রী সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত গেলেন এনএসআই মহাপরিচালক দেশের মানুষ আপনার অপেক্ষায় আছে: হাসিনাকে দুলু রাষ্ট্রায়ত্ত ৩ ব্যাংকে নতুন এমডি নিয়োগ দিয়েছে সরকার

বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিয়ে সুতোয় ঝুলছে বাংলাদেশের কোটি দর্শক

Reporter Name / ১২৭ Time View
Update : রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬

আগামী ১২ জুন থেকে উত্তর আমেরিকার তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাটিতে পর্দা উঠতে যাচ্ছে ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ খ্যাত ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের আনাচে-কানাচেও শুরু হয়ে গেছে ফুটবল উন্মাদনা। প্রিয় দলের জার্সি কেনা, ছাদে কিংবা বারান্দায় পতাকা ওড়ানোর চিরচেনা উৎসবের আমেজ এখন সর্বত্র। কিন্তু এই উৎসবের আবহাওয়ায় হঠাৎ করেই নেমে এসেছে এক বিশাল হতাশার কালো মেঘ। বাংলাদেশের কোটি কোটি ফুটবলপাগল সমর্থক এবার নিজেদের ড্রয়িংরুমে বসে টিভিতে বিশ্বকাপের খেলা দেখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে এক চরম অনিশ্চয়তা। বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র কয়েকদিন বাকি, ঠিক এমন একটি অন্তিম মুহূর্তে এসে ৮৮ কোটি টাকার একটি মেগা সম্প্রচার চুক্তি বাতিল হয়ে যাওয়া এবং ফিফার অনড় অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ সম্প্রচার বিষয়টি এখন আক্ষরিক অর্থেই সুতোয় ঝুলছে।

বিশ্বকাপ ফুটবলের সম্প্রচার নিয়ে দেশে কেন এমন ভয়াবহ অচল অবস্থার সৃষ্টি হলো, তার শেকড় খুঁজতে গেলে বেরিয়ে আসে এক চাঞ্চল্যকর বাণিজ্যিক ব্যর্থতার গল্প। এই পুরো সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি স্পোর্টস ব্রডকাস্টিং প্রতিষ্ঠান, যার নাম স্প্রিংবক প্রাইভেট লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত বাংলাদেশ ভূখণ্ডের জন্য ফিফার কাছ থেকে বিশ্বকাপের মিডিয়া স্বত্ব বা ব্রডকাস্ট রাইটস ক্রয় করেছিল। গত মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফার সঙ্গে স্প্রিংবকের এই চুক্তির আর্থিক মূল্য নির্ধারিত হয়েছিল ৭ দশমিক ২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮৮ কোটি টাকা। চুক্তির আনুষ্ঠানিক নিয়ম অনুযায়ী, চলতি মে মাসের মধ্যেই মোট চারটি কিস্তিতে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ফিফাকে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল স্প্রিংবকের। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রথম তিনটি কিস্তির অর্থ পরিশোধ করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয় প্রতিষ্ঠানটি। এর ফলশ্রুতিতে গত সপ্তাহে ফিফা কোনো ধরনের ছাড় না দিয়ে এই মেগা চুক্তিটি সরাসরি বাতিল করে দেয়। স্প্রিংবকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গোপাল পাড়িয়া নিজেই গণমাধ্যমের কাছে এই চুক্তিবাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এবং জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে তারা এই সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি করতে না পারার কারণেই নিজেদের অধিকার ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।

এখন প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক যে, একটি আন্তর্জাতিক ব্রডকাস্টিং প্রতিষ্ঠান কেন বাংলাদেশের বাজারে তাদের স্বত্ব বিক্রি করতে পারল না? এখানেই বেরিয়ে এসেছে তাদের অতি মুনাফালোভী মানসিকতা এবং এক আকাশচুম্বী দাম হাঁকানোর চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রাপ্ত তথ্যমতে, স্প্রিংবক মাত্র ৮৮ কোটি টাকায় ফিফার কাছ থেকে সম্প্রচার স্বত্ব কিনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল বিটিভির কাছে এর দাম দাবি করেছিল ১২ দশমিক ৩০ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, বাংলাদেশি মুদ্রায় কর ও ভ্যাট ছাড়াই তারা প্রায় ১৫০ কোটি ৯৮ লাখ টাকা চেয়ে বসেছিল। একটি উন্নয়নশীল দেশের রাষ্ট্রীয় বা বেসরকারি চ্যানেলের পক্ষে এই আকাশচুম্বী দাম দিয়ে সম্প্রচার স্বত্ব কেনা এক প্রকার অসম্ভব ব্যাপার। স্প্রিংবকের এই অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক দাম হাঁকানোর কারণেই মূলত দেশের কোনো বেসরকারি স্পোর্টস চ্যানেল বা সরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের কাছ থেকে সম্প্রচার স্বত্ব কিনতে রাজি হয়নি। অতিরিক্ত মুনাফা করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত তারা নিজেরাই নিজেদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে যায় এবং ফিফার কিস্তির টাকা জোগাড় করতে ব্যর্থ হয়।

এইবারের বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্বের দামটি যে কতটা অস্বাভাবিক, তা গত বিশ্বকাপের আর্থিক হিসাবের দিকে তাকালেই একেবারে পরিষ্কার হয়ে যায়। মাত্র চার বছর আগে, ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি স্পোর্টস চ্যানেল টি স্পোর্টস এবং জিটিভি যৌথভাবে বিশ্বকাপের মিডিয়া স্বত্ব কিনেছিল। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, সেবার পুরো টুর্নামেন্টের সম্প্রচার স্বত্ব কিনতে তাদের সম্মিলিতভাবে খরচ হয়েছিল মাত্র দুই থেকে আড়াই মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ছিল ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার আশেপাশে। অথচ মাত্র চার বছরের ব্যবধানে ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য সেই একই স্বত্বের দাম হাঁকা হচ্ছে সাত থেকে ১২ মিলিয়ন ডলার, যা পূর্বের তুলনায় প্রায় তিন থেকে চার গুণ বেশি। অনেকেই যুক্তি দিচ্ছেন যে, এবারের বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বেড়ে ৪৮ হয়েছে এবং ম্যাচের সংখ্যা ৬৪ থেকে বেড়ে ১০৪টি হয়েছে, তাই দাম বাড়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু সম্প্রচার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ম্যাচের সংখ্যা বাড়লেও বাংলাদেশের মতো একটি নির্দিষ্ট বাজারের জন্য চার গুণ দাম বৃদ্ধি কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না। তাছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশে যে তীব্র ডলার সংকট ও অর্থনৈতিক চাপ চলছে, তার মধ্যে দেশের বাজারে স্পোর্টস ব্রডকাস্টিংয়ে এত বিশাল অঙ্কের বিদেশি মুদ্রা ব্যয় করার বিষয়টি একটি বড় অচল অবস্থার জন্ম দিয়েছে।

স্প্রিংবকের সঙ্গে ফিফার চুক্তি বাতিল হয়ে যাওয়ার পর সংকট সমাধানে বাংলাদেশ সরকার সরাসরি উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ করে ফিফার কাছে বিটিভির জন্য বিনামূল্যে বা ফ্রিতে সম্প্রচার স্বত্ব প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়েছিল, যাতে দেশের আপামর জনসাধারণ এই বৈশ্বিক ক্রীড়া উৎসব থেকে বঞ্চিত না হয়। কিন্তু ফিফা বাংলাদেশ সরকারের সেই দাবি একেবারেই সাফ প্রত্যাখ্যান করেছে। ফিফার এই প্রত্যাখ্যানের পেছনে তাদের নিজস্ব একটি অকাট্য বাণিজ্যিক যুক্তি রয়েছে। ফিফা মূলত সারা বিশ্ব থেকে এই সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির মাধ্যমে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করে, সেটিই তাদের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। এই আয়ের টাকা দিয়েই তারা সদস্য দেশগুলোর স্থানীয় ফুটবল ফেডারেশনগুলোকে আর্থিক অনুদান প্রদান করে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ফিফার কাছ থেকে প্রতি বছর ফুটবল উন্নয়নের জন্য মিলিয়ন ডলারের যে অনুদান পেয়ে থাকে, সেটি আসে ফিফার এই সম্প্রচার স্বত্ব ও স্পন্সরশিপের আয় থেকেই। তাই বাণিজ্যিক চুক্তির বাইরে গিয়ে কোনো দেশকে বিনামূল্যে বা ফ্রিতে বিশ্বকাপ সম্প্রচারের ফিড প্রদান করা তাদের গঠনতন্ত্র ও বাণিজ্যিক নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

তাহলে কি বাংলাদেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী মানুষ এবারের বিশ্বকাপ দেখার সুযোগ থেকে চিরতরে বঞ্চিত হবেন? এর উত্তর হলো, আশা এখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। বরং স্প্রিংবকের মতো একটি মধ্যস্বত্বভোগী বা ব্রোকার প্রতিষ্ঠান মাঝখান থেকে সরে যাওয়ায় এখন বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোর জন্য সরাসরি ফিফার সঙ্গে অনেক কম দামে আলোচনা করার এক দারুণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। জানা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশের জনপ্রিয় বেসরকারি স্পোর্টস চ্যানেল টি স্পোর্টস ও স্টার নিউজের একটি যৌথ উদ্যোগ এবং দুবাই ভিত্তিক একটি স্পোর্টস মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান সরাসরি ফিফার সঙ্গে এই সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে জোরালো দরকষাকষি চালিয়ে যাচ্ছে। ফিফা শুরুতে বাংলাদেশের বাজারের জন্য ৭ মিলিয়ন ডলার দাবি করলেও, বর্তমানে পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা ৫ মিলিয়নের কিছু বেশি আশা করছে। তবে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট ব্রডকাস্টিং কর্মকর্তাদের মতে, যেহেতু প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও চীনে বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্বের দাম তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কমে গেছে, সেহেতু বাংলাদেশের বাজার ও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করে এই চুক্তির মূল্য দুই থেকে তিন মিলিয়ন ডলারের মধ্যেই হওয়া উচিত।

যদি এই দুই-একদিনের মধ্যে চলমান এই দরকষাকষি ও চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তবেই কেবল বাংলাদেশের দর্শকরা টেলিভিশনের পর্দায় বিশ্বকাপের খেলাগুলো উপভোগ করতে পারবেন। তবে এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার যে, এবারের বিশ্বকাপে রাষ্ট্রীয় চ্যানেল বিটিভি কোনোভাবেই ফ্রিতে সম্প্রচারের ফিড পাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত যে বেসরকারি চ্যানেল বা প্রতিষ্ঠানই ফিফার কাছ থেকে এই সম্প্রচার স্বত্ব কিনুক না কেন, বিটিভিকে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের সাব-লাইসেন্সিং ফি বা টাকা দিয়েই তাদের কাছ থেকে সম্প্রচারের ফিড নিতে হবে। আগামী ১২ জুন থেকে শুরু হয়ে ২০ জুলাই পর্যন্ত চলবে ১০৪টি শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচের এই মহাযজ্ঞ। এখন পুরো দেশের মানুষের দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে এই সম্প্রচার জট খোলার দিকে। আগামী এক বা দুই দিনের মধ্যেই হয়তো চূড়ান্তভাবে জানা যাবে, বাংলাদেশের কোটি দর্শক শেষ পর্যন্ত টেলিভিশনের পর্দায় মেসি, এমবাপে বা ভিনিসিউসদের পায়ের জাদুকরী ফুটবল শৈলী দেখতে পারবেন কি না। ফুটবলের এই চরম অনিশ্চিত সময়ে দর্শকদের এখন কেবল অপেক্ষার প্রহর গোনা ছাড়া আর কোনো উপায় অবশিষ্ট নেই।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category