• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৯ অপরাহ্ন
Headline
এনসিটিবির উপসচিব-সদস্যসহ আরও ৪ কর্মকর্তাকে বদলি তাহসিফের মৃত্যুতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতি রয়েছে: জামায়াত সশস্ত্র বাহিনী বোর্ডের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন ফি ১৬৮ টাকা রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ শুরু খাদ্যশস্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতে টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে: খাদ্যমন্ত্রী মানবতাবিরোধী অপরাধে হানিফের মৃত্যুদণ্ড, অপর তিন আসামির আমৃত্যু কারাদণ্ড চার বছরে ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষক কার্ড দেবে সরকার জাপানে টয়োটার মোতোমাচি কারখানা পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী কারিগরি ত্রুটিতে টোকিও থেকে ঢাকাগামী প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে বিলম্ব বিচার ব্যবস্থাকে মানুষের আস্থার জায়গায় আরও সুদৃঢ় করতে চাই: আইনমন্ত্রী

রপ্তানি হিস্যা বেড়েছে ২০.৬% : পোশাকের একক মূল্যে ৬ দেশের মধ্যে সবার নিচে বাংলাদেশ

Reporter Name / ৩ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬

বিশ্বের পোশাক রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখলেও পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি এবং মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে প্রতিযোগীদের চেয়ে এখনো অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইইউর দীর্ঘ দশ বছরের বাণিজ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কারভাবে দেখা যায় যে, বিগত ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের একক প্রতি মূল্য বৃদ্ধির হার প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বেশ মন্থর ছিল | মূলত তুলানির্ভর পোশাকের ওপর অতিরিক্ত মাত্রিক নির্ভরতা এবং কম মূল্যের সাধারণ বা বেসিক পণ্যের ওপর অতিনির্ভরতার কারণেই এই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে | আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে কম মূল্যের বিশাল পরিমাণের পোশাক সরবরাহকারী দেশ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার ফলে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ বাড়লেও পণ্যের উচ্চমূল্য বা ন্যায্য দাম পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে |

যুক্তরাষ্ট্রের কমার্স ডিপার্টমেন্টের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউরোস্ট্যাটের দীর্ঘ দশ বছরের তথ্য খতিয়ে দেখলে এই বৈপরীত্য স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে | মার্কিন বাজারে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বিগত দশ বছরে বাংলাদেশি পোশাকের একক প্রতি মূল্য বা ইউনিট প্রাইস মাত্র আট দশমিক এক শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে | অথচ এই একই সময়ে ভিয়েতনামের পোশাকের দাম বেড়েছে দশ দশমিক পাঁচ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার আট দশমিক ছয় শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার ছিল চোখ কপালে তোলার মতো, প্রায় আঠারো দশমিক নয় শতাংশ | এর বিপরীতে চীনের একক প্রতি মূল্য হ্রাসের হার ছিল উল্লেখযোগ্য, যা মূলত তাদের উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর ও বহুমুখী পণ্যের বাজারে কৌশলগত পরিবর্তনের ফল | একই চিত্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারেও পরিলক্ষিত হয়, যেখানে বাংলাদেশের পোশাকের ইউনিট মূল্য মাত্র পাঁচ দশমিক নয় শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, অথচ ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে তা বারো দশমিক দুই শতাংশ এবং তুরস্কের ক্ষেত্রে প্রায় উনিশ দশমিক চার শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে |

পোশাক ব্যবসার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের বাণিজ্যিক যাত্রার শুরুটা ভিন্ন সময়ে হলেও ভিয়েতনামের দ্রুত অগ্রগতি সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে | বাংলাদেশ আশির দশকের গোড়ার দিকে পশ্চিমা বিশ্বে পোশাক রপ্তানি শুরু করলেও ভিয়েতনাম বিশ্ববাজারে বড় আকারে প্রবেশ করে নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে এবং ২০০১ সালের যুক্তরাষ্ট্র-ভিয়েতনাম বাণিজ্য চুক্তির পর তাদের রপ্তানি খাত অবিশ্বাস্য গতিতে বিকশিত হয় | যদিও প্রতিযোগিতায় অনেক পরে মাঠে নেমেছে, তবুও ভিয়েতনাম মার্কিন বাজারে রপ্তানি আয়ে বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে দিয়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারেও একক প্রতি মূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছে | এটি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বিশ্ববাজারে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং উচ্চ মূল্য সংযোজন বা ভ্যালু এডিশন করা কতটা অপরিহার্য |

দশ বছরের এই সামগ্রিক পরিসংখ্যানে রপ্তানি আয়ের পরিমাণগত বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ অবশ্য বেশ ভালো সাফল্য দেখিয়েছে | ইউএস মার্কেটে বিগত ২০১৬ সালে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল পাঁচ দশমিক তিন বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালে এসে আট দশমিক এক আট বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে এবং এর ফলে রপ্তানি মূল্য বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে বাহান্ন দশমিক দুই শতাংশে | একই সময়ে মার্কিন বাজারে শিপমেন্টের পরিমাণ বা ভলিউম দেড় বিলিয়ন থেকে বেড়ে আড়াই বিলিয়ন স্কয়ার মিটার সমতুল্যে পৌঁছেছে এবং প্রতি বর্গমিটারের গড় মূল্য দুই দশমিক ৮৫ ডলার থেকে সামান্য বেড়ে তিন দশমিক শূন্য আট ডলারে উন্নীত হয়েছে | ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারেও একই ধরনের ইতিবাচক ধারা দেখা গেছে, যেখানে রপ্তানি মূল্য ৫৪ দশমিক ছয় শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় পৌনে কুড়ি বিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে এবং একই সঙ্গে রপ্তানির পরিমাণ ও ওজন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে |

তবে এই বিশাল পরিমাণ বা ভলিউম-ভিত্তিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা | সেন্টার ফর পলিসি ডায়াগনস্টিক বা সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি মূলত ভলিউম বা পরিমাণের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, কারণ দেশের পুরো পণ্য ভাণ্ডার নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে | দেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় সত্তর শতাংশই মাত্র পাঁচটি প্রধান পণ্যের মধ্যে আটকে আছে, যার মধ্যে মূলত সাধারণ মানের টি-শার্ট ও ট্রাউজার্স প্রধানত অন্তর্ভুক্ত | এর বিপরীতে প্রতিযোগী দেশগুলো অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় মধ্যম ও উচ্চমূল্যের পোশাক বিশ্ববাজারে সরবরাহ করে থাকে, যার ফলে তারা ক্রেতাদের কাছ থেকে অনেক বেশি ইউনিট প্রাইস বা ন্যায্য মূল্য আদায় করতে সক্ষম হয় |

বাংলাদেশের ‘মাস-স্কেল’ বা বিপুল পরিমাণে কম মূল্যের পণ্য সরবরাহকারী হিসেবে বিশ্ববাজারে যে পরিচিতি তৈরি হয়েছে, তা মূলত এমন সব আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আকর্ষণ করে যারা সাশ্রয়ী মূল্যে পাইকারি অর্ডারে বেশি আগ্রহী | এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার জন্য দেশীয় উদ্যোক্তাদের দ্রুত পণ্য বহুমুখীকরণ, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক মানের ব্র্যান্ডিং গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে | একই সঙ্গে পরিবেশগত ও সামাজিক কমপ্লায়েন্স বা মানদণ্ড আরও কঠোরভাবে মেনে না চললে দীর্ঘমেয়াদে উচ্চমূল্যের ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে না | অন্যদিকে, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের বা বিকেএমইএ-র নির্বাহী সভাপতি ফজল শামীম এহসান মনে করেন যে, কৃত্রিম তন্তু বা ম্যান-মেড ফাইবারের ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভিয়েতনামের চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে |

ফজল শামীম এহসান আরও উল্লেখ করেন যে, প্রাকৃতিক তুলানির্ভর পণ্যের ওপর অতিরিক্ত আস্থার কারণে বাংলাদেশ উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে পিছিয়ে পড়ছে, অথচ ভিয়েতনাম কৃত্রিম তন্তুর বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক বেশি দামি পোশাক তৈরি করছে | এর পাশাপাশি ভিয়েতনাম কাঠামোগত ও লজিস্টিক সুবিধার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে, যার ফলে তাদের পণ্য ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে বাংলাদেশের তুলনায় অন্তত কুড়ি দিন কম সময় লাগে | এই লজিস্টিক বা পরিবহন সুবিধা ভিয়েতনামী প্রস্তুতকারকদের আরও বেশি মূল্য সংযোজনমূলক কাজ করার সুযোগ করে দেয় এবং তারা আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো দাম নিশ্চিত করতে পারে |

ইইউ এবং মার্কিন বাজারের তুলনামূলক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে রপ্তানি মূল্যের দিক থেকে চীনের পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম অবস্থান ধরে রেখেছে এবং ইইউর মোট আমদানিতে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে | ২০২০ সালের ১৭ দশমিক চার শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে তা বিশ দশমিক ছয় শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা আলোচিত ছয়টি দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ শতাংশ পয়েন্ট অর্জনের রেকর্ড | তবে এত কিছুর পরেও ইইউ বাজারে বাংলাদেশের একক প্রতি মূল্য ছয়টি দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়ে গেছে | অন্যদিকে মার্কিন বাজারেও বাংলাদেশ তৃতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী হিসেবে তার হিস্যা ৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করেছে এবং মার্কিন বাজারের সঙ্গে দামের ব্যবধানও কিছুটা কমিয়ে এনেছে |

পরিশেষে বলা যায়, দেশের পোশাক খাত আজ পরিমাণগত সাফল্যের এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছালেও ইউনিট প্রাইস বা পণ্যের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তোলা উচিত | সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে শুধু পরিমাণের দিক দিয়ে বড় হওয়াটাই টেকসই অর্থনীতির প্রধান শর্ত হতে পারে না | সময় এসেছে প্রথাগত বেসিক পণ্যের উৎপাদন সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে উচ্চমূল্যের ফ্যাশনেবল ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত পোশাক উৎপাদনের দিকে মনোনিবেশ করার | সরকারের নীতিগত সহায়তা, উদ্যোক্তাদের বহুমুখী উদ্যোগ এবং সঠিক ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে যদি এই রূপান্তর সফলভাবে সম্পন্ন করা যায়, তবেই বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি সত্যিকারের অর্থে একটি লাভজনক ও টেকসই অবস্থানে উন্নীত হতে পারবে |

তথ্যসূত্র: নিউএজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category