বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে প্রধানত দুটি বড় রাজনৈতিক জোটের আধিপত্য থাকলেও, জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেই প্রথাগত কাঠামোর মূলে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেওয়া নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখন বৃহত্তর ঐক্যের ডাক উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)-র একীভূত (Merge) হওয়ার বিষয়টি।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে দফায় দফায় বৈঠকের পর এখন বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে ওপেন সিক্রেট। যদিও কোনো পক্ষই এখনো ‘চূড়ান্ত’ সিলমোহর দেয়নি, তবে দুই দলের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য এবং সাম্প্রতিক দলীয় কর্মকাণ্ড একীভূত হওয়ার দিকেই স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এবি পার্টি ও এনসিপি—উভয় দলই জুলাইয়ের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সামনের কাতারে ছিল। এবি পার্টি ২০২০ সালে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার’—এই তিন মূলনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও জুলাই অভ্যুত্থানে তাদের সক্রিয়তা নতুন করে রাজনৈতিক মহলে দলটিকে আলোচনায় নিয়ে আসে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভ্যুত্থানের মূল নেতাদের হাত ধরে গঠিত এনসিপি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্র্যান্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
উভয় দলের আদর্শিক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘অধিকরভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র’ এবং ‘রাষ্ট্র সংস্কার’-এর প্রশ্নে তারা প্রায় একই সমতলে অবস্থান করছে। এনসিপির মুখপাত্র ও বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এই ঐক্যের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানান, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যারা জীবন দিয়েছে, তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে হলে সমমনা শক্তিগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়া সময়ের দাবি।
দুটি ভিন্ন কাঠামোর রাজনৈতিক দল একীভূত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সাংগঠনিক সমন্বয়। এবি পার্টি ইতোমধ্যে নিবন্ধিত একটি দল, অন্যদিকে এনসিপি অত্যন্ত দ্রুত বর্ধনশীল একটি প্ল্যাটফর্ম। দল দুটির অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, আলোচনার মূল বিষয়বস্তু এখন কয়েকটি বিন্দুতে আটকে আছে: ১. দলের নাম: এবি পার্টি কি এনসিপিতে বিলীন হয়ে যাবে, নাকি উভয় দল মিলে সম্পূর্ণ নতুন কোনো নাম গ্রহণ করবে? এনসিপির একটি বড় অংশ নাম পরিবর্তনের বিপক্ষে থাকলেও এবি পার্টির নীতিনির্ধারকরা একটি সম্মানজনক অবস্থানের কথা ভাবছেন। ২. নেতৃত্বের মূল্যায়ন: এবি পার্টির অভিজ্ঞ ও দক্ষ নেতাদের এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে বা রাজনৈতিক পরিষদে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, সেটি একটি বড় আলোচনার বিষয়। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় পদের বণ্টন এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের সমন্বয় নিয়ে কাজ চলছে। ৩. ভবিষ্যৎ রূপরেখা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে এনসিপির ছয়জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। এবি পার্টির রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং এনসিপির তারুণ্যদীপ্ত শক্তি মিলে আগামী নির্বাচনের জন্য একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু এই প্রক্রিয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, নির্বাচনের আগে থেকেই এনসিপি, এবি পার্টি ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন মিলে একটি নির্বাচনী ঐক্য ছিল। এখন সেই ঐক্যকে সাংগঠনিক রূপ দেওয়ার জন্য অনুরোধ ও আকাঙ্ক্ষা তৃণমূল পর্যায় থেকেও আসছে। তবে তিনি জোর দিয়েছেন ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া’র ওপর। তাঁর মতে, নীতিনির্ধারণী ফোরামে আলোচনা করে এবং নেতাকর্মীদের মতামত নিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও সংসদীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বর্তমানে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি বিষয়টিকে দলের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “একটা পরিমিত জায়গায় এলে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে জাতির সামনে ঘোষণা দেব।”
উল্লেখ্য যে, এনসিপিতে যোগদানের হিড়িক গত কয়েক দিনে বহুগুণ বেড়েছে। শুধু এবি পার্টিই নয়, যুবদল, আপ বাংলাদেশ এবং বিভিন্ন ছাত্র ও পেশাজীবী সংগঠনের শীর্ষ নেতারাও এনসিপির পতাকাতলে আসছেন। গত ১৯ এপ্রিল এবি পার্টির ৪৪ জন নেতাকর্মীর এনসিপিতে যোগদান মূলত একীভূত হওয়ার প্রাথমিক মহড়া হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপি ও এবি পার্টির এই মিলন কেবল দুটি দলের এক হওয়া নয়; বরং এটি বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘদিনের ‘বাই-পোলার’ বা দ্বিমুখী ধারা ভেঙে ‘থার্ড ফোর্স’ বা তৃতীয় শক্তিকে সুসংহত করার একটি বড় পদক্ষেপ। এনসিপির তারুণ্য এবং এবি পার্টির পোড় খাওয়া নেতাদের সমন্বয় যদি সঠিক হয়, তবে এটি দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানে যারা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন, তারা একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে আছেন। এনসিপি ও এবি পার্টির এই ঐক্য সেই তৃষ্ণা মেটাতে পারবে কিনা, তা এখন সময়ের অপেক্ষা।
বাংলাদেশের রাজনীতির জটিল অলিগলিতে দল ভাঙা-গড়ার খেলা নতুন কিছু নয়। তবে জুলাইয়ের রক্তের দাগ এখনো শুকোয়নি। সেই রক্তের শপথ নিয়ে একীভূত হওয়ার এই প্রচেষ্টা যদি সফল হয়, তবে তা দেশের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে হয়তো আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ঢাকঢোল পিটিয়ে নতুন এই রাজনৈতিক জোট বা একীভূত দলের ঘোষণা আসবে। আর সেই ঘোষণার মধ্য দিয়েই শুরু হবে ২০২৬ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতির এক নতুন অধ্যায়।