• শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১৭ অপরাহ্ন

রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া ৭০ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অস্তিত্ব সংকটে

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিগত ১৭ বছরে কোনো ধরনের প্রয়োজনীয়তা বা সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই কেবল রাজনৈতিক বিবেচনায় যত্রতত্র বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেকটা কিন্ডারগার্টেন বা ব্যবসায়িক দোকানের আদলে গড়ে ওঠা এসব বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে চরম শিক্ষার্থী সংকটে পড়ে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডে পরিবর্তন আনা হলেও এই গভীর সংকট থেকে কোনোভাবেই উত্তরণ মিলছে না। সারা দেশে বর্তমানে অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১৭টি। এর মধ্যে সার্বিক নিয়মকানুন মেনে সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে মাত্র ২০ থেকে ২৫টি প্রতিষ্ঠান। আরও প্রায় ২০টির মতো বিশ্ববিদ্যালয় কোনো রকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বাকি প্রায় ৭০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে মহাসংকটে নিপতিত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান, অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংকটে থাকা এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অন্তত অর্ধশত প্রতিষ্ঠানে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য এবং ট্রেজারারের মতো শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে।
আইন অনুযায়ী একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১২ বছরের মধ্যে নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনুমোদিত ১১৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৫৩টি প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে সক্ষম হয়েছে। আর সব শর্ত পূরণ করে স্থায়ী সনদ অর্জন করতে পেরেছে মাত্র ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়। এর বাইরে কিছু প্রতিষ্ঠান স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার কথা বললেও বাস্তবে আর্থিক সংকটের কারণে তারা জমি কিনে ফেলে রেখেছে অথবা ভাড়া করা ভবনেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অবকাঠামোগত এই দৈন্যের পাশাপাশি শিক্ষক সংকট এসব প্রতিষ্ঠানকে আরও পঙ্গু করে দিয়েছে। মহাসংকটে থাকা এই নামসর্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী না থাকায় তাদের নিজস্ব কোনো আয়ের উৎস নেই, ফলে তারা মানসম্পন্ন শিক্ষকও নিয়োগ দিতে পারছে না। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বা দুজন অধ্যাপকের বেশি কোনো জ্যেষ্ঠ শিক্ষক নেই। এমনকি শিক্ষকদের বেতনও অত্যন্ত অমানবিক, যা অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। একটি বা দুটি ফ্লোর ভাড়া করে ল্যাবরেটরি, সমৃদ্ধ পাঠাগার এবং নিয়মিত ক্লাস ছাড়াই এসব প্রতিষ্ঠানে মূলত টাকার বিনিময়ে সনদ বিক্রির মহোৎসব চলছে।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনেও এসব মানহীন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। উদাহরণস্বরূপ, চুয়াডাঙ্গার ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে পরিদর্শনে গিয়ে ইউজিসির তদন্ত কমিটি শিক্ষার ন্যূনতম পরিবেশটুকুও দেখতে পায়নি। ২০১০ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপক্ষে ২৫ হাজার বর্গফুট আয়তনের নিজস্ব বা ভাড়া করা ভবন থাকার কথা থাকলেও, প্রতিষ্ঠানটি এর অর্ধেক জায়গায় তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ১৪টি প্রোগ্রামের বিপরীতে কমপক্ষে ৭০ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও সেখানে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৩৩ জন, যার মধ্যে ২৪ জনই কেবল প্রভাষক। অধ্যাপকের সংখ্যা মাত্র এক এবং এই প্রভাষকদের মাসিক বেতন দেওয়া হয় মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা।
এই চরম অব্যবস্থাপনার বিষয়ে ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মালিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সহসভাপতি আবুল কাসেম হায়দার জানান, গত ১৭ বছর ধরে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই এসব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একটি পূর্ণাঙ্গ ও মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে বর্তমানে চার থেকে পাঁচ শ কোটি টাকার প্রয়োজন হলেও, অনেকেই মাত্র ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে মূলত দোকান খুলে বসেছেন। তিনি ২০১০ সালের আইনের সংশোধনের প্রস্তাব করে বলেন, শুধু জমির দলিল দেখালেই অনুমোদন দেওয়া উচিত নয়, বরং বিনিয়োগকারীদের জন্য বৈধভাবে লভ্যাংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে এই খাতে প্রকৃত ও বড় বিনিয়োগ আসে। অন্যথায় মানহীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না। অন্যদিকে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাদের গুণগত মান দিয়েই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে। মানহীন প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে পড়বে। তিনি পরামর্শ দেন যে, দেশীয় শিক্ষার্থীর পাশাপাশি মালদ্বীপ, ভুটান, নেপাল ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করতে পারে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই শিক্ষার্থী সংকটের পেছনে উচ্চশিক্ষায় আসন সংখ্যার সঙ্গে পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যার বিশাল ব্যবধানও একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে। দেশে বর্তমানে উচ্চশিক্ষায় মোট আসন রয়েছে প্রায় ১৩ লাখ। এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোতে আসন রয়েছে প্রায় ৬০ হাজার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক ও পাস কোর্স মিলিয়ে আসন রয়েছে সাড়ে আট লাখের বেশি। উন্মুক্ত ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়েও রয়েছে লক্ষাধিক আসন। অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বছরে তিন সেমিস্টার হিসাব করলে প্রায় পাঁচ লাখেরও বেশি আসন দাঁড়ায়। কিন্তু এর বিপরীতে ২০২৫ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৫৮.৮৩ শতাংশে। গত বছর পাস করেছে মাত্র সাত লাখ ২৬ হাজার ৯৬০ জন শিক্ষার্থী। ফলে সরকারি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আসনই যেখানে পুরোপুরি পূর্ণ হয় না, সেখানে নিম্নমানের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী শূন্যতায় ভুগবে, সেটাই স্বাভাবিক।
অবশ্য এই সংকটের মধ্যেও নর্থ সাউথ, ব্র্যাক, এআইইউবি, আইইউবি, ড্যাফোডিল, ইস্ট ওয়েস্ট, ইউল্যাব, আইইউবিএটির মতো প্রথম সারির ১০ থেকে ১৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের তুমুল প্রতিযোগিতা দেখা যায়। এসব প্রতিষ্ঠানে কঠোর ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থীদের সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু এর বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চিত্র একেবারেই ভিন্ন। রাজধানীর সেন্ট্রাল ওমেনস, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল, স্টামফোর্ড, সিটি ইউনিভার্সিটি, প্রাইম এশিয়া, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ থেকে শুরু করে ঢাকার বাইরের পুন্ড্র ইউনিভার্সিটি, বরেন্দ্র ইউনিভার্সিটি, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ও বান্দরবান ইউনিভার্সিটির মতো অসংখ্য প্রতিষ্ঠান তীব্র শিক্ষার্থী সংকটে ধুঁকছে। ইউজিসির রেড স্টার বা তারকা চিহ্নিত বিতর্কিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়। সঠিক পরিকল্পনা ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে না পারলে অচিরেই এসব নামসর্বস্ব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের অস্তিত্ব হারিয়ে বিলীন হয়ে যাবে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
তথ্যসূত্র: কালের কণ্ঠ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category