দেশে বর্তমানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল বা অবরোধের মতো কর্মসূচি নেই, স্বাভাবিকভাবেই চলছে সব দাপ্তরিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম। তবে রাজপথের এই স্থিতিশীলতার কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে না সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস অর্থাৎ জুলাই ও আগস্ট পেরিয়ে গেলেও উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজে চরম ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার নেমে এসেছে মাত্র ১ দশমিক ৮৫ শতাংশে। পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৭০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যা গত পাঁচ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় সর্বনিম্ন। রাজনৈতিক বাধার অনুপস্থিতি সত্ত্বেও উন্নয়ন ব্যয়ের গতি কেন বাড়ছে না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
আইএমইডির প্রকাশিত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য এডিপির মোট আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এর বিপরীতে জুলাই-আগস্ট মাসে ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৭০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। গত কয়েক বছরের তুলনামূলক চিত্রে এডিপি বাস্তবায়নের এই শ্লথগতি অত্যন্ত স্পষ্ট। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এডিপি বাস্তবায়িত হয়েছিল ৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এরপর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৫৭ শতাংশে। গত অর্থবছরের একই সময়ে বাস্তবায়নের হার ছিল ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। আর চলতি অর্থবছরে তা আরও কমে ১ দশমিক ৮৫ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে অর্থবছরের শুরুতে এডিপি বাস্তবায়নের হার প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমে গেছে।
শুধুমাত্র আগস্ট মাসের হিসাব পর্যালোচনা করলেও বাস্তবায়নের হার নিম্নমুখী দেখা যায়। চলতি বছরের আগস্ট মাসে এডিপি থেকে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৫৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা, যা মোট এডিপির মাত্র ১ দশমিক ১৬ শতাংশ। গত বছরের আগস্ট মাসে ব্যয় হয়েছিল ৪ হাজার ৭০ কোটি ১৮ লাখ টাকা বা ১ দশমিক ৭১ শতাংশ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে শুধুমাত্র আগস্ট মাসের ব্যয় কমেছে ৪৮১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এডিপি বাস্তবায়নের হার কমে যাওয়াকে কেবল সরকারি হিসাবের একটি সাধারণ সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। উন্নয়ন বাজেটের অর্থ খরচের সঙ্গে নির্মাণকাজ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, শ্রমিকের কর্মসংস্থান, সিমেন্ট-রড-পাথরসহ নির্মাণসামগ্রীর বাজার, পরিবহন খাত এবং স্থানীয় ব্যবসার সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। অর্থবছরের শুরুতে উন্নয়ন ব্যয়ের গতি থমকে গেলে তার প্রভাব অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে যখন বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রবাহ দুর্বল এবং অর্থনীতিতে চাহিদার চাপ বিদ্যমান, তখন সরকারি উন্নয়ন ব্যয় অর্থনৈতিক কার্যক্রমের একটি প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। সেই জায়গাতেই সরকারি ব্যয় আটকে থাকলে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
চলতি অর্থবছরের এডিপিতে মোট ১ হাজার ১৭২টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ৯৮৬টি বিনিয়োগ প্রকল্প, ২৩টি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, ১০৯টি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প, ৯টি উন্নয়ন সহায়তা ব্লক এবং ৪৫টি সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নের প্রকল্প রয়েছে। অর্থায়নের উৎসের দিকে নজর দিলে এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতির একটি বড় কারণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আইএমইডির তথ্যমতে, জিওবি বা সরকারি তহবিল থেকে জুলাই-আগস্ট মাসে ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ৪৯ কোটি টাকা, যা সংশ্লিষ্ট বরাদ্দের ২ দশমিক ১৩ শতাংশ। কিন্তু প্রকল্প ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা খাত থেকে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা, যা এই খাতের মোট বরাদ্দের মাত্র ১ দশমিক ২২ শতাংশ। অন্যদিকে, সংস্থাগুলোর নিজস্ব অর্থায়নে ব্যয় হয়েছে ৩২৩ কোটি টাকা বা ৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। অর্থাৎ, এডিপির সবচেয়ে বড় স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে বৈদেশিক সহায়তার অর্থ ব্যবহারে।
উন্নয়ন বাজেটের একটি বড় অংশ কয়েকটি নির্দিষ্ট মেগা প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল থাকায় কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের এডিপির প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট বরাদ্দের সাড়ে ১২ শতাংশের মতো অর্থ রাখা হয়েছে পাঁচটি বড় প্রকল্পের জন্য। এর মধ্যে রয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেলের দুটি লাইন, মাতারবাড়ী বন্দর এবং বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প। শুধুমাত্র রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পেই বরাদ্দ রয়েছে ১৫ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা। ফলে এই বড় প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন যদি কোনো কারণে ধীর হয়, তবে তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সামগ্রিক এডিপি বাস্তবায়নের ওপর। বিশেষ করে বৈদেশিক অর্থায়নের অংশের ব্যয় যেখানে মাত্র ১ দশমিক ২২ শতাংশ, সেখানে বড় প্রকল্পগুলোর ধীরগতি মোট বাস্তবায়ন হারকে নিচের দিকে টেনে রাখছে।
বড় অবকাঠামো খাতগুলোর বাস্তবায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এছাড়া সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগে ২ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ বিভাগে ২ দশমিক ১৩ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। নৌপরিবহন ও সেতু বিভাগের ক্ষেত্রেও বাস্তবায়নের চিত্র প্রায় স্থবির পর্যায়ে রয়েছে। দেশের যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, বন্দর ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের প্রধান প্রকল্পগুলো এই খাতগুলোর অধীনে পরিচালিত হয়। প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, দরপত্র প্রক্রিয়া, ঠিকাদার নির্বাচন, ভূমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রাপ্তি এবং প্রশাসনিক অনুমোদনের মতো বিভিন্ন স্তরের জটিলতায় এসব প্রকল্পের কাজ ধীরগতিতে এগোচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক সংঘাতকে উন্নয়ন বাস্তবায়নের প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, মূলত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তহীনতা, প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন, অগ্রাধিকার নির্ধারণে সময়ক্ষেপণ, অর্থছাড়ের জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতাই বর্তমান স্থবিরতার প্রধান কারণ। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আগের সরকারের আমলে নেওয়া প্রকল্পগুলোর প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা নতুন করে যাচাই করা হচ্ছে। কোন প্রকল্প চলমান থাকবে, কোনটি বাতিল করা হবে বা কোনটির অগ্রাধিকার কমানো হবে—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রেই অর্থছাড় ও বাস্তবায়নের গতি আটকে থাকছে।
বৈদেশিক অর্থায়ননির্ভর প্রকল্পগুলোতে এই সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। নতুন সরকার পূর্ববর্তী সরকারের সাথে স্বাক্ষরিত কিছু চুক্তি ও প্রকল্প পুনর্বিবেচনা করছে। কিছু ক্ষেত্রে ভারতীয় ঋণ বা লাইন অব ক্রেডিট বাতিল করা অথবা বিকল্প অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে নতুন করে অর্থায়ন নিশ্চিত করা, দাতাসংস্থার সাথে আলোচনা এবং প্রকল্পের কাঠামো পরিবর্তনের মতো দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। দাতাসংস্থাগুলোর নিজস্ব শর্ত ও ছাড়পত্রের প্রক্রিয়াও অর্থছাড়ে বিলম্ব ঘটাচ্ছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জানান, অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বাস্তবায়ন ধীর হওয়ার পেছনে সাধারণত মৌসুমি প্রভাব কাজ করে। তবে এবার এর সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ। আগের সরকারের রেখে যাওয়া অনেক প্রকল্প এডিপিতে রয়েছে, যেগুলোর অগ্রাধিকার নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। বর্তমান সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত অনেক প্রকল্পের কাজ কার্যকরভাবে এগোতে পারছে না। তার মতে, আগের সরকারের আমলাতান্ত্রিক বিবেচনায় নেওয়া অনেক প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এখন আর নেই। নতুন সংসদ সদস্যরা নিজেদের এলাকার প্রকল্পগুলোর বিষয়ে নতুন করে ভাবছেন। এর পাশাপাশি জ্বালানি খাতের ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারের আর্থিক চাপও এডিপি বাস্তবায়নে প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধাগুলো দ্রুত দূর করা না গেলে বছরের শুরুতে তৈরি হওয়া ঘাটতি পরে পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে বছরের শুরুতে ধীরগতি এবং অর্থবছর শেষে তড়িঘড়ি করে অর্থ ব্যয় করার একটি পুরনো প্রবণতা রয়েছে। এতে কাজের গুণগত মান কমে যায়, ব্যয়ের দক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং সরকারি অর্থের অপচয়ের ঝুঁকি বাড়ে। একটি প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ না হলে জনগণ তার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয় এবং প্রকল্পের ব্যয়ও বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু এডিপির আকার বড় করলেই উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না, বরং কতগুলো প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়নযোগ্য সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান স্থবিরতা কাটাতে সরকারের সামনে এখন চলমান প্রকল্পগুলোকে অত্যাবশ্যক, অগ্রাধিকারযোগ্য ও স্থগিতযোগ্য ক্যাটাগরিতে দ্রুত শ্রেণিবিন্যাস করা জরুরি। একই সঙ্গে বৈদেশিক অর্থায়ননির্ভর প্রকল্পগুলোর অর্থছাড়ের বাধা দূর করতে হবে এবং প্রকল্প অনুমোদন থেকে শুরু করে ভূমি অধিগ্রহণ ও বাস্তবায়ন পর্যন্ত সব ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে আনতে হবে। রাজনীতি স্থিতিশীল হওয়ার পর এখন উন্নয়নের প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠাই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত