• সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ০৪:৪১ অপরাহ্ন
Headline
যারা শাশুড়ি হতে যাচ্ছেন তাঁদের জন্য ১০টি পরামর্শ চিকিৎসার পর ফের কারাগারে দীপু মনি সংসদে ট্যাক্সের টাকায় যেন চরিত্র হনন না হয় বিরোধী দলের নির্বাচনি এলাকায় ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে: মির্জা ফখরুল যে কোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারাজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা হবে: প্রধানমন্ত্রী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী গ্রাহকদের জন্যে স্মার্টফোন সাশ্রয়ী করতে বাংলালিংকের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান চাকরির জন্য তরুণদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না: প্রধানমন্ত্রী কালো টাকা সাদা করার বিধান প্রত্যাহারসহ কর সংস্কারের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর বন্ধ হচ্ছে আবাসিক গ্যাস সংযোগ

রামমন্দিরের দানের টাকা ও ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ

Reporter Name / ১ Time View
Update : সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬

ভারতের উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় অবস্থিত রামমন্দির বর্তমানে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তবে এবারের আলোচনার বিষয়বস্তু মন্দিরটির ধর্মীয় মহিমা কিংবা স্থাপত্যশৈলী নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ভয়াবহ আর্থিক কেলেঙ্কারি। ভক্তদের দান করা কোটি কোটি টাকা এবং মূল্যবান সামগ্রী চুরির ঘটনা নিয়ে এখন দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে। অভিযোগ উঠেছে, রামমন্দির নির্মাণের সূচনালগ্ন থেকেই এই ‘হরিলুট’ বা তছরুপের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। যদিও মন্দির ট্রাস্টের পক্ষ থেকে শুরুতে সব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে, কিন্তু স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই দুর্নীতির যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা ভারতের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে ব্যাপক অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত কয়েক সপ্তাহ আগে, যখন রামমন্দির ট্রাস্টের হিসাবরক্ষণ বিভাগের সাবেক সুপারভাইজার মহীপাল সিং মন্দিরের দানের হিসাবে অনিয়মের কথা প্রকাশ্যে আনেন। তার অভিযোগ ছিল, ভক্তদের দেওয়া নগদ অর্থ, সোনা-রুপার গয়না এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীর হিসাবে গরমিল রয়েছে। এমনকি অর্থ তছরুপের প্রতিবাদ করায় তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেছেন। তার এই সাহসী মুখ খোলার পরই যেন কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে কেউটে। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ তড়িঘড়ি তিন সদস্যের একটি বিশেষ তদন্ত দল (SIT) গঠন করতে বাধ্য হয়েছেন।

ভারতের দৈনিক আনন্দবাজার ও বিবিসি-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিক তদন্তে অন্তত ১৭ ব্যক্তিকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, মন্দিরের দায়িত্বে থাকা প্রায় ১৫০ জন সেবাদারের সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির বিষয়টিও এখন তদন্তকারীদের নজরে এসেছে। অনেকের অভিযোগ, মন্দির প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ওই সেবাদারদের ব্যক্তিগত সম্পদ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে, যা তাদের আয়ের উৎসের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পৎ রায়ের ব্যক্তিগত গাড়িচালক রামশঙ্কর যাদব এবং দানের হিসাব নথিবদ্ধ করার কাজে যুক্ত থাকা লবকুশ ও অনুকল্প মিশ্রর মতো ব্যক্তিরা রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে চুরি, বিশ্বাসভঙ্গ এবং দুর্নীতি দমন আইনে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে।

অযোধ্যার এই রামমন্দির কেবল একটি উপাসনালয় নয়, এটি ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আদর্শ ও প্রতীকের বহিঃপ্রকাশ। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর উগ্র হিন্দুত্ববাদী করসেবকদের হাতে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর থেকে রামমন্দির ইস্যুটিকে ঘিরে ভারতে ব্যাপক ধর্মীয় মেরুকরণ ও রাজনৈতিক উত্থান-পতন ঘটেছে। ২০১৯ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বিতর্কিত জমিটি হিন্দুদের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত হওয়ার পর ২০২০ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’ গঠনের ঘোষণা দেন। ২০২৪ সালের ২২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী মোদি আনুষ্ঠানিকভাবে এই মন্দিরের উদ্বোধন করেন। এখন সেই মন্দিরের দেয়ালেই আর্থিক দুর্নীতির কলঙ্ক লেগে যাওয়ায় বিজেপি নেতৃত্ব বড় ধরনের রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে।

তদন্তকারী সংস্থার প্রাথমিক প্রতিবেদন ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, গত দেড় বছরে মন্দিরে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি নগদ প্রণামী জমা পড়েছে। এর পাশাপাশি অগণিত সোনা ও রুপার গহনা দান হিসেবে এসেছে। কিন্তু তদন্তে দেখা গেছে, এই বিপুল সম্পদের একটি বড় অংশের কোনো হদিশ নেই। এমনকী দানে পাওয়া রুপার তৈরি অত্যন্ত মূল্যবান ‘ভূষুণ্ডির কাক’ পর্যন্ত গায়েব হয়ে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে সিসিটিভি ক্যামেরা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে নগদ টাকা ও সোনাদানা সরানোর এক বিশাল চক্র গড়ে উঠেছিল। এই চুরি করা টাকার একাংশ দিয়ে অভিযুক্তরা অযোধ্যার আশপাশে রিসোর্ট, শপিংমল ও বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে বলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।

এই কেলেঙ্কারি ঘিরে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এবং সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। অখিলেশ যাদব অভিযোগ করেছেন, ছোটখাটো কর্মচারী বা গাড়িচালকদের ফাঁসিয়ে দিয়ে রাঘব বোয়ালদের আড়াল করার অপচেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বলেছেন, “হিন্দুরা চাঁদাচোর পার্টিদের বিশ্বাস করেছিল, কিন্তু তারা বিশ্বাসের অমর্যাদা করেছে।” বিজেপির রাজনৈতিক মিত্র ও সমর্থক গোষ্ঠীর একাংশও এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ। তারা মনে করছেন, ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে এই ধরনের জালিয়াতি কেবল মানুষের আস্থায় আঘাত নয়, বরং হিন্দু ধর্মের পবিত্রতার পরিপন্থী।

মন্দির চুরির এই সংবাদ এখন আর ভারতের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এটি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হচ্ছে। অযোধ্যার স্থানীয় বাসিন্দারা চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন। ভক্তদের দান করা টাকা তীর্থযাত্রীদের সেবার জন্য হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা গুটিকয়েক মানুষের ব্যক্তিগত ভোগবিলাসে ব্যয় হয়েছে—এই অনুভূতি সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। মন্দির ট্রাস্টের প্রধান সাধারণ সম্পাদক চম্পৎ রায় পদত্যাগ করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতির গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও ট্রাস্টের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অর্থ আত্মসাতের সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, তবুও জনগণের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের মুখে উত্তরপ্রদেশ সরকার বিষয়টি নিয়ে কোনো লুকোচুরি করার সুযোগ পাচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, রামমন্দিরের এই দুর্নীতি কেবল আর্থিক নয়, বরং এটি বিজেপির রাজনৈতিক ভাবমূর্তির ওপর একটি বড় আঘাত। সাংবাদিক সুব্রত বসু তার পডকাস্টে যথার্থই বলেছেন, রামমন্দির বিজেপির কাছে কেবল একটি ধর্মীয় প্রকল্প নয়, এটি তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতীক। এখন সেই প্রতীক যদি দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়, তবে তার প্রভাব ভারতের আগামী নির্বাচনগুলোতে পড়তে বাধ্য। ভোটাররা, বিশেষ করে ধর্মপ্রাণ হিন্দু ভোটাররা, যারা রামমন্দির নির্মাণকে একটি পবিত্র কাজ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন, তারা এখন এক ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে মনে করছেন।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের প্রধান বিচারপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আইনজীবী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সিবিআই (CBI) তদন্তের আবেদন জানানো হয়েছে। তাদের দাবি, রামমন্দিরের মতো একটি পবিত্র স্থানের সঙ্গে জড়িত দুর্নীতি সাধারণ কোনো অপরাধ নয়, এটি কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ অবশ্য সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ভক্তদের বিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বরদাস্ত করা হবে না। তবে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছেন, এত বড় দুর্নীতির ঘটনা ট্রাস্টের কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদত ছাড়া বছরের পর বছর চলা কি আদৌ সম্ভব ছিল?

পুরো ঘটনাটি একটি বিষচক্রের মতো। বাবরির ধ্বংসস্তূপের ওপর গড়ে ওঠা এই মন্দিরটি গত কয়েক দশকে ভারতের রাজনীতিতে বিভাজনের রেখা তৈরি করেছিল। এখন সেই মন্দিরেই যখন দুর্নীতির ছায়া পড়েছে, তখন তা একটি নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনার পথ তৈরি করেছে। এটি কি বিজেপির পতন বা জনসমর্থন হ্রাসের কোনো প্রাথমিক ইঙ্গিত? নাকি সরকার এই কেলেঙ্কারি সামলে আবার নতুন কোনো রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করবে? সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, অযোধ্যার পবিত্র রামমন্দির আজ এক বড় প্রশ্নের মুখে—ভক্তদের ভক্তি আর শাসকের রাজনীতির মাঝে থাকা এই দানবাক্সের স্বচ্ছতা নিয়ে।

পরিশেষে বলা যায়, অযোধ্যার রামমন্দিরে চুরির এই ঘটনা ভারতের ধর্মভিত্তিক রাজনীতির এক ভয়াবহ রূপ তুলে ধরেছে। যে পবিত্রতার নামে মন্দির তৈরি করা হয়েছিল, তার অন্দরেই যে এই ধরনের জালিয়াতি লুকিয়ে ছিল, তা সাধারণ মানুষকে অবাক করেছে। এখন দেখার বিষয়, বিশেষ তদন্ত দল (SIT) কতটা নিরপেক্ষভাবে এই ঘটনার গভীরে যেতে পারে এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতে পারে। ভক্তদের বিশ্বাস কি আবার ফিরে আসবে, নাকি এই কলঙ্ক চিহ্ন হয়েই থাকবে রামমন্দিরের দেয়ালে? অযোধ্যা এখন কেবল রামের জন্মভূমি নয়, বরং এটি এখন রাজনৈতিক সততা ও ধর্মীয় ভণ্ডামির এক বড় পরীক্ষার মাঠ। ভারতের জনগণ এখন কেবল বিচারের দিকে তাকিয়ে আছে, কারণ তারা বিশ্বাস করে যে, অর্থের হিসাব হয়তো গাণিতিকভাবে মেলানো সম্ভব, কিন্তু বিশ্বাসের হিসাব একবার হারিয়ে ফেললে তা আর কোনো বিচারেই ফিরে পাওয়া সহজ নয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category