• রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ০৪:১৮ অপরাহ্ন

রাশিয়ায় আলেমদের ওপর নজিরবিহীন রাষ্ট্রীয় দমন

Reporter Name / ৪ Time View
Update : রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সামাজিক সমীকরণে এক গভীর ও উদ্বেগজনক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। গত মে (২০২৬) মাসজুড়ে দেশটির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একাধিক প্রভাবশালী মুসলিম আলেম, মুফতি ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিকে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী নাটকীয়ভাবে আটক করেছে। ক্রেমলিন নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোতে এই ব্যাপক গ্রেফতারের খবর অত্যন্ত সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত আকারে প্রচার করা হলেও, অনলাইন দুনিয়ায় এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মহলে এটি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। রাশিয়ার বাইরে থেকে পরিচালিত স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এবং সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই ঘটনাগুলো ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়ায় এক নতুন মাত্রার রাষ্ট্রীয় ইসলামবিদ্বেষ ও কট্টর জাতীয়তাবাদের উত্থানকে স্পষ্ট করে তুলেছে। একই সাথে এটি ক্রেমলিন-সমর্থিত স্পিরিচুয়াল বোর্ড অব মুসলিমস (ডিইউএম) নামক ঐতিহ্যবাহী শীর্ষ মুসলিম সংস্থাকে ভেঙে দেওয়ার বা কোণঠাসা করার একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্লুপ্রিন্ট হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

মে মাসের সাঁড়াশি অভিযান ও আটক আলেমদের তালিকা

২০২৬ সালের মে মাসে রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অন্তত আটজন উচ্চপর্যায়ের মুসলিম আলেম ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে আটক করে দেশটির কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সংস্থা এফএসবি (FSB)। এই গ্রেফতারের তালিকায় রয়েছেন কারেলিয়ার সাবেক প্রভাবশালী মুফতি উইসাম বার্দভিল, যাঁকে শেরেমেতিয়েভো বিমানবন্দর থেকে ‘পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার’ এক সস্তা অভিযোগে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর মাত্র দুই দিন আগে তাঁর ডেপুটি আখমাদ তাঙ্গিয়েভকেও তুলে নেয় এফএসবি।

একই ধারাবাহিকতায়, মর্দোভিয়া প্রজাতন্ত্রের মুফতি রয়াল আসেনভকে ‘ঘুষ চাওয়ার’ একটি বিতর্কিত অভিযোগে ১৯শে মে গ্রেফতার করা হয়। রাশিয়ার প্রথম সারির ব্যবসায়িক সংবাদপত্র ‘কোমেরসান্ত’-এর অনুসন্ধান অনুযায়ী, সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে ‘মুসলিম কমিউনিটি অব দ্য নর্থওয়েস্ট’-এর সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ খেনি এবং সারাতভ অঞ্চলের ডেপুটি মুফতি আল-খেইখ নিদাল আওয়াদুল্লাহ আহমদকেও যৌথ অভিযানে আটক করা হয়েছে। এছাড়া তাতারস্তান, মারমানস্ক ও পেট্রোজাভোদস্কের মতো মুসলিম প্রধান অঞ্চলের আরও চারজন প্রভাবশালী প্রতিনিধিকে তদন্তের নামে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে রুশ প্রশাসন।

‘মুসলিম ব্রাদারহুড’ ও বিদেশি চর বানানোর অপচেষ্টা

গ্রেফতারকৃত আলেমদের বিরুদ্ধে আপাতদৃষ্টিতে ‘ঘুষ’ বা ‘আইন অমান্যের’ মতো সাধারণ ফৌজদারি অপরাধের খোলস পরানো হলেও, পর্দার আড়ালের মূল অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর ও রাজনৈতিক। কোমেরসান্ত মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানিয়েছে, আটককৃতদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’-এর সঙ্গে গোপনে যুক্ত থাকার অভিযোগ আনা হচ্ছে, যা রাশিয়া ২০০৩ সালেই একটি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক হিসেবে নিষিদ্ধ করেছিল।

পাশাপাশি, ক্রেমলিনের কট্টরপন্থী প্রচারক রুসলান অস্তাশকোর মতো ব্যক্তিত্বরা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এই আলেমদের রাশিয়ার ভেতরে ওড়ার অপেক্ষায় থাকা এক নতুন “পঞ্চম স্তম্ভ” বা দেশের ভেতর লুকিয়ে থাকা শত্রু হিসেবে চিত্রায়িত করছেন। তাদের দাবি, এই আলেমরা ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হয়ে কাজ করছেন। এই গ্রেফতারের ঘটনায় রাশিয়ার উগ্র-ডানপন্থি ও কট্টর অর্থোডক্স খ্রিষ্টান উগ্রবাদীরা উল্লাস প্রকাশ করেছে। ‘সন্স অব মনার্কি’ নামক একটি অতি-জাতীয়তাবাদী চ্যানেল প্রকাশ্যেই লিখেছে যে, “সাহসী রুশ বাহিনী অবশেষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে যারা রাশিয়াকে হালালাইজেশন বা ইসলামীকরণের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।”

চিত্রকর্ম বিতর্ক ও দেশপ্রেমের পরীক্ষা

রাশিয়ার মুসলিম নেতাদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক ও আইনি চাপের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন ডিইউএম-এর প্রথম ডেপুটি দামির মুখেতদিনভ। মে মাসের শেষ সপ্তাহে মস্কোর একটি আদালত তাঁকে ‘ঘৃণা বা শত্রুতা উসকে দেওয়ার’ এক অদ্ভুত অভিযোগে দেড় লাখ রুবল জরিমানা করে। তাঁর অপরাধ ছিল, গত বছর তাঁর কার্যালয়ের দেয়ালে ১২২৩ সালের ঐতিহাসিক ‘কালকা যুদ্ধ’-এর একটি চিত্রকর্ম বা পেইন্টিং টাঙানো ছিল। ওই যুদ্ধে মঙ্গোল-তাতার বাহিনী প্রাচীন রুশ বাহিনীকে পরাজিত করেছিল।

কট্টর রুশ জাতীয়তাবাদীরা এই চিত্রকর্মকে ‘রাশিয়া-বিরোধী’ এবং ‘ইসলামী চরমপন্থার প্রতীক’ হিসেবে প্রচার করতে শুরু করে। মুখেতদিনভ প্রথমে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, মঙ্গোল সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি ‘গোল্ডেন হোর্ড’ আসলে বহু-জাতি ও বহু-ধর্মীয় আধুনিক রাশিয়ার ভিত্তি তৈরিতে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু ক্রেমলিনের নজিরবিহীন চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত তিনি মাথা নত করতে বাধ্য হন এবং সেই চিত্রকর্মটি নামিয়ে সেখানে নাজি জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘মহান দেশপ্রেমিক যুদ্ধ’-এর ছবি স্থাপন করার মুচলেকা দেন।

পুতিনের ‘স্লাভিক’ রাশিয়ার একচেটিয়া নীতি

প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বর্তমানে রাশিয়ার জাতীয় পরিচয়কে একটি সুনির্দিষ্ট ‘ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক পরিসর’-এ রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন, যা মূলত রুশ, ইউক্রেনীয় ও বেলারুশিয়ানদের নিয়ে গঠিত একটি ‘স্লাভিক এবং অর্থোডক্স খ্রিষ্টান’ ঐতিহ্য। এই উগ্র ধারণার কারণে রাশিয়ার ভেতরে অন্যান্য জাতিগত ও ধর্মীয় পরিচয়ের মানুষের স্বাভাবিক অধিকার সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এর ফলে রাশিয়ার ভেতরে ইসলামবিদ্বেষী এজেন্ডা নিয়ে কাজ করা উগ্র ডানপন্থী দলগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে এক ধরণের প্রচ্ছন্ন গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে যাচ্ছে।

আবাসিক ভবনে নামাজ নিষিদ্ধের কালো আইন ও ডিইউএম-এর অসহায়ত্ব

এই ব্যাপক সামাজিক ও আইনি দমন-পীড়নের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ২০২৪ সালে উত্থাপিত একটি বিতর্কিত বিল, যা সম্প্রতি ২০২৬ সালে পাস হওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই নতুন আইন অনুযায়ী, সাধারণ আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাট বাড়িতে কোনো ধরনের জামাতবদ্ধ নামাজ বা গণউপাসনা করা যাবে না। কেবল একটি ফ্ল্যাটের নিবন্ধিত স্থায়ী বাসিন্দারাই সেখানে ব্যক্তিগত প্রার্থনা করতে পারবেন। কোনো আত্মীয় বা বন্ধু এসে একসাথে নামাজ পড়লেও তা হবে রাষ্ট্রীয় অপরাধ।

মে মাসের শুরুতে এই কালো আইনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছে একটি খোলা চিঠি পাঠিয়েছিলেন ডিইউএম প্রধান মুফতি রাভিল গাইনুতদিন। তিনি পরিষ্কার বলেছিলেন, রাশিয়ায় পর্যাপ্ত মসজিদের তীব্র সংকট রয়েছে এবং প্রশাসন নতুন কোনো মসজিদ বা ইসলামিক সেন্টার নির্মাণের অনুমতি দিচ্ছে না। এমন অবস্থায় যদি ঘরবাড়িতেও নামাজ পড়া নিষিদ্ধ করা হয়, তবে তা মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর বড় আঘাত হবে। স্বাধীন গণমাধ্যম ‘নোভায়া গাজেতা ইউরোপা’-র মতে, মূলত এই চিঠির মাধ্যমে ক্রেমলিনের সিদ্ধান্তের প্রকাশ্যে বিরোধিতা করার কারণেই ক্ষুব্ধ হয়ে মে মাসজুড়ে আলেমদের ওপর এই প্রতিশোধমূলক গ্রেফতারের ঢেউ নামিয়েছে পুতিনের নিরাপত্তা বাহিনী।

আনুগত্যের শেষ পরীক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রভাব

রাশিয়ায় বর্তমানে প্রায় দুই কোটিরও বেশি মুসলিমের বসবাস, যা পুরো ইউরোপের মধ্যে একক বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যা। ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই রাশিয়ার সরকারি মুসলিম সংস্থাগুলো ক্রেমলিনের যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে জানমাল ও ফতোয়া দিয়ে সমর্থন করে এসেছে। বহু মুসলিম তরুণ রাশিয়ার হয়ে ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধ করছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, কট্টর অর্থোডক্স জাতীয়তাবাদের জোয়ারে রাশিয়ার মুসলিমদের এখন দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বা কেবলই ‘অভিবাসী শ্রমিক’ হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ছে। এই গণগ্রেফতার প্রমাণ করে যে, পুতিনের রাশিয়ায় টিকে থাকতে হলে কেবল রাজনৈতিক আনুগত্যই এখন আর যথেষ্ট নয়, বরং নিজের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়ে পুরোপুরি রুশ স্লাভিক ছাঁচে ঢলে পড়ার এক অলিখিত যুদ্ধ শুরু হয়েছে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category