• বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৩ অপরাহ্ন
Headline
আমাদের ১০টি কমন স্বভাব টাকা ছাপিয়ে ন্যাশনাল ব্যাংককে ঋণ দেবে না বাংলাদেশ ব্যাংক ঢাবিতে নেকাব পরা শিক্ষার্থীকে অপমান ইসলামবিদ্বেষী মানসিকতা: বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস পশ্চিমবঙ্গ মাদরাসা সার্ভিস কমিশন বিলুপ্ত ঘোষণা করল বিজেপি সরকার মোদির সঙ্গে ত্রিবেদীর দীর্ঘ বৈঠক, তারেক রহমানের সফর নিয়ে আলোচনা প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে বৈঠক ১২ ডিসেম্বরের আগেই নবায়ন হবে গঙ্গা চুক্তি: পানিসম্পদমন্ত্রী শিক্ষকদের দাবি পর্যায়ক্রমে মেনে নেবে সরকার: রিজভী ভিসা সহজীকরণ ও বাণিজ্য বৃদ্ধি জোরদারে ইন্দোনেশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও মাহ্দী আমিনের বৈঠক দুর্নীতি করে শিক্ষকদের ভাতা বন্ধ করেছিল ফ্যাসিবাদী সরকার: মাহদী আমিন

রাষ্ট্রের খাতায় নেই ২০ লাখ শিশু

Reporter Name / ৪ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬

পৃথিবীর আলো দেখার পর একটি শিশুর প্রথম ও প্রধান রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হলো তার জন্ম নিবন্ধন| এই সনদের মাধ্যমেই রাষ্ট্র তার একজন নতুন নাগরিকের অস্তিত্বকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নেয়| কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ানো বিপুলসংখ্যক পথশিশুর জন্মের কোনো তথ্যই সরকারের কোনো খাতায় লিপিবদ্ধ নেই| সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জরিপ ও পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এমন পরিচয়হীন ভাসমান শিশুর সংখ্যা অন্তত ২০ লাখ| জন্ম নিবন্ধন না থাকার অর্থ হলো রাষ্ট্রের চোখে এই শিশুদের কোনো অস্তিত্বই নেই| ফলে নিজেদের বয়স ও নাগরিক পরিচয়ের প্রমাণ দিতে না পারায় এই শিশুরা শিক্ষা, চিকিৎসা, সামাজিক সুরক্ষা এবং অন্যান্য মৌলিক নাগরিক অধিকার থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হচ্ছে| আর এই বঞ্চনার সুযোগ নিয়ে সমাজের অন্ধকার জগতের মানুষরা তাদের বিপথগামী করছে| পরিচয়হীনতার হতাশায় ভুগে এবং বেঁচে থাকার তাগিদে এই শিশুরা ধীরে ধীরে ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি এবং ভূমি দখলের মতো ভয়ংকর সব অপরাধী চক্রের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ছে| আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক এক গোপন প্রতিবেদনেও অত্যন্ত উদ্বেগজনকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাজধানী ঢাকার কিশোর গ্যাংগুলোর বেশিরভাগ সদস্যই ভাসমান বা পথশিশু| এদের নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই, অনেকেই ফুটপাত, পার্ক বা বস্তিতে রাত কাটায়| সুস্থ পারিবারিক পরিবেশ এবং শিক্ষাব্যবস্থার আলো থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণেই মূলত তাদের অপরাধ জগতে পা বাড়ানোর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে|

জাতিসংঘের শিশু তহবিল বা ইউনিসেফ ২০২৪ সালে একটি বিস্তৃত গবেষণা পরিচালনা করে, যেখানে পথ-সংযুক্ত শিশুদের কীভাবে সংগঠিত অপরাধী চক্র সুকৌশলে ব্যবহার করছে তার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে| ওই গবেষণায় দেখা যায়, মাদক বিক্রি থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের মতো চরম ঝুঁকিপূর্ণ অপরাধে স্বার্থান্বেষী চক্রগুলো অত্যন্ত সুকৌশলে এই পরিচয়হীন শিশুদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে| ইউনিসেফের ওই সুনির্দিষ্ট গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমানে দেশে অভিভাবকের স্নেহ-যত্ন বা সরকারি কোনো সুরক্ষার বাইরে থাকা ‘স্ট্রিট সিচুয়েশন’ বা ভাসমান অবস্থায় থাকা শিশুর মোট সংখ্যা প্রায় ৩৪ লাখের বেশি| অন্যদিকে, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কারিতাস বাংলাদেশ গত ২০২৫ সালে ভাসমান শিশুদের ওপর একটি বিস্তারিত জরিপ পরিচালনা করে| ওই জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, দেশের পথশিশুদের মধ্যে অন্তত ৫৮ দশমিক ২ শতাংশেরই কোনো জন্ম নিবন্ধন সনদ নেই| যদিও ইউনিসেফ এবং কারিতাসের এই দুটি জরিপের মধ্যে পদ্ধতিগত কোনো সরাসরি যোগসূত্র নেই, তারপরও এই দুটি জরিপের ফলাফল একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে একটি ভয়াবহ হিসাব সামনে আসে| হিসাব অনুযায়ী, দেশে অন্তত ১৯ লাখ ৭২ হাজার বা প্রায় ২০ লাখ ভাসমান শিশুর কোনো জন্ম নিবন্ধন নেই| মাঠ পর্যায়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাস্তব পরিস্থিতিতে এই পরিচয়হীন শিশুদের প্রকৃত সংখ্যা হিসাবের চেয়ে আরও অনেক বেশি হবে|

সাধারণত যাদের বাবা-মা বা বৈধ অভিভাবক রয়েছেন, তাদের সন্তানদের জন্ম নিবন্ধন করাতেই সরকারি দপ্তরগুলোতে সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হতে হয়| সাধারণ নাগরিকদের অভিযোগ রয়েছে যে, অনেক সময় উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের সুপারিশ বা তদবির থাকার পরও একটি সাধারণ জন্ম নিবন্ধন সনদ বের করতে তাদের জুতা ক্ষয় করতে হয়| সেখানে পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং অভিভাবকের পরিচয় থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকা এই ভাসমান পথশিশুদের জন্য জন্ম নিবন্ধনের বিষয়টি এক অকল্পনীয় ও জটিল প্রক্রিয়া| প্রথমত, শিশু বয়সে এই ভাসমান শিশুরা নিজেরাও জানে না যে রাষ্ট্রের কাছে নাগরিক সুবিধা চাইতে গেলে এই এক টুকরো কাগজের প্রয়োজনীয়তা ঠিক কতটা| তবে আশার কথা হলো, সম্প্রতি কয়েকটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সরাসরি তত্ত্বাবধানে এবং প্রচেষ্টায় কিছু পথশিশুর জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে| সরকারি পর্যায় থেকেও এই পরিচয়হীন শিশুদের নিবন্ধনের আওতায় আনতে কিছু নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে| গত বছর কারিতাস বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ঢাকা, ময়মনসিংহ এবং রাজশাহী শহরের পথশিশুদের নিয়ে যে জরিপটি পরিচালিত হয়েছিল, সেখানে পথশিশুদের মানবেতর জীবনের আরও কিছু মর্মান্তিক তথ্য উঠে আসে| জরিপে দেখা যায়, জন্ম নিবন্ধন না থাকা এই শিশুদের মধ্যে ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ শিশুই তাদের বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর তো দূরের কথা, তাদের সুনির্দিষ্ট পরিচয়ও ঠিকমতো বলতে পারে না| এছাড়া জরিপে অংশগ্রহণকারী শিশুদের মধ্যে ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ শিশু কখনোই স্কুল বা মাদ্রাসার আঙিনায় পা রাখেনি| আর রাষ্ট্রের এত বড় বাজেটের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সুবিধা পাচ্ছে মাত্র ৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু| অর্থাৎ, এসব ভাসমান শিশুর ৯৪ দশমিক ৩ শতাংশই সরকারের সব ধরনের সুরক্ষাবলয়ের সম্পূর্ণ বাইরে অবস্থান করছে|

এমন এক হতাশা ও বঞ্চনার বাস্তবতার মাঝেই আজ মঙ্গলবার দেশব্যাপী পালিত হচ্ছে জাতীয় জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন দিবস| এ বছর রাষ্ট্রীয়ভাবে এই দিবসটির জন্য একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, আর তা হলো ‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন’| রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে বলেছেন যে, দেশের প্রতিটি নাগরিকের সঠিক ও নির্ভুল জন্ম এবং মৃত্যু নিবন্ধন কেবল তাদের নাগরিক অধিকার সুরক্ষারই মূল ভিত্তি নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, ন্যায়সংগতভাবে বাজেট বণ্টন এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে| সরকার ইতিমধ্যে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের শতভাগ নাগরিকের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ| প্রতি বছরের মতো এবারও এই দিবসটি উপলক্ষে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে| তবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্রের মাধ্যমে জানা গেছে, ওই অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এবং নির্দিষ্ট কয়েকটি টিভি চ্যানেল ছাড়া অন্যান্য প্রিন্ট বা অনলাইন গণমাধ্যমের কর্মীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, যা তথ্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এক ধরনের অস্বচ্ছতার জন্ম দিয়েছে|

কারিতাস বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাদের জরিপ প্রতিবেদনে পথশিশুদের জন্ম নিবন্ধনের জন্য বেশ কিছু বাস্তবমুখী ও সহজ সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে| এর মধ্যে পথশিশুদের জন্য সাধারণ নিয়মের বাইরে গিয়ে সহজ পদ্ধতিতে জন্ম নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা, ওয়ার্ডভিত্তিক ও ভ্রাম্যমাণ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো থেকে জন্মের পরপরই সরাসরি নিবন্ধনের ব্যবস্থা করার কথা জোরালোভাবে বলা হয়েছে| একই সঙ্গে এই চরম দরিদ্র ও পথশিশুদের অবিলম্বে সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আনার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে| সমাজকর্মীরা বলছেন, নাগরিক পরিচয় এবং বয়সের সরকারি কোনো দালিলিক প্রমাণ না থাকলে এসব শিশুর শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য নাগরিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে পদে পদে বাড়তি আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে| যেহেতু পথশিশুদের একটি বিশাল অংশ তাদের পরিবার থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন, তাই অনেকের ক্ষেত্রেই তাদের জন্মদাতা বাবা-মায়ের পরিচয়, স্থায়ী ঠিকানা কিংবা জন্মসংক্রান্ত কোনো তথ্য জানা থাকে না| এমনকি তাদের কাছে জন্মের সময়ের হাসপাতাল বা ক্লিনিকের কোনো ছাড়পত্র বা নথিও নেই| এর ফলে সাধারণ বা প্রচলিত প্রক্রিয়ায় তাদের জন্ম নিবন্ধন করানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে| বিশেষ করে যেসব শিশুর কোনো পরিচয় বা বৈধ অভিভাবকের সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই, তাদের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা আরও অনেক বেশি প্রকট|

বিদ্যমান আইনি কাঠামোতে বলা হয়েছে যে, কোনো পরিত্যক্ত শিশু বা রাস্তাঘাটে পাওয়া সাধারণ পরিচয়হীন ব্যক্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দেওয়া জন্ম বা মৃত্যুর প্রাথমিক তথ্য নিবন্ধনের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে| এছাড়া ভাসমান শিশুদের জন্ম নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করতে সরকার ২০২২ সালে একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী আইনি পরিবর্তন আনে| ওই বছরের ২৭ জুলাই থেকে অনলাইনে যেকোনো শিশুর জন্ম নিবন্ধনের আবেদনের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন সনদ দাখিল করার যে বাধ্যতামূলক নিয়ম ছিল, তা পরিপত্র জারির মাধ্যমে শিথিল করা হয়| এর ফলে বাবা-মায়ের নিজস্ব জন্ম নিবন্ধন না থাকার কারণে শিশুর নিবন্ধন আটকে যাওয়ার যে একটি বড় প্রশাসনিক বাধা ছিল, তার আইনি নিষ্পত্তি ঘটে| এই শিথিল নিয়মের বিষয়টি মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জানাতে গত জুন মাসে একটি বিশেষ কর্মশালাও অনুষ্ঠিত হয়েছিল| সেখানে বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেছিলেন| ওই কর্মশালায় খোদ রেজিস্ট্রার জেনারেল স্বয়ং পথশিশুদের জন্ম নিবন্ধন দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করার জন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেন| কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, মাঠ পর্যায়ে বাস্তব কাজের ক্ষেত্রে সেই নির্দেশনার কোনো প্রতিফলন বা বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না|

কারিতাস বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রাজধানীর পুরান ঢাকা এলাকায় পথশিশুদের নিবন্ধনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন সংস্থাটির প্রোগ্রাম অফিসার আন্তনী প্রিন্স গমেজ| সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি গণমাধ্যমকে তার হতাশার কথা জানিয়ে বলেছেন যে, আইন ও নিয়মকানুন সংশোধন করে সহজ করা হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে নিবন্ধন প্রক্রিয়া একেবারেই সহজ হয়নি| তিনি আক্ষেপ করে জানান, গত ১৮ জুন থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীন পুরান ঢাকা এলাকায় মাত্র আটজন পথশিশুর জন্ম নিবন্ধনের তথ্য অনলাইনে এন্ট্রি করাতে সক্ষম হয়েছেন| অথচ এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তিনি একজন শিশুরও চূড়ান্ত জন্ম নিবন্ধন সনদ হাতে পাননি| তার হাতে এখনো শতাধিক পরিচয়হীন শিশুর জন্ম নিবন্ধনের সব তথ্য ও আনুষঙ্গিক কাগজপত্র প্রস্তুত করা আছে, কিন্তু সরকারি কর্মকর্তাদের অসহযোগিতার কারণে তিনি সামনে এগোতে পারছেন না| তিনি অভিযোগ করে বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কোনোভাবেই পরিচয়হীন পথশিশুদের জন্ম নিবন্ধন সহজে গ্রহণ করতে চান না| তারা সবসময় ভবিষ্যৎ আইনি ঝামেলা, পুলিশ ভেরিফিকেশনসহ নানা ধরনের খোঁড়া অজুহাত দেখিয়ে কাজ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন| তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, কর্মকর্তাদের কাজের এই ধীরগতি অব্যাহত থাকলে বছরে ১০০ পথশিশুর জন্ম নিবন্ধন সম্পন্ন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে| তবে এর বিপরীতে কিছুটা আশার খবর হলো, একই সংস্থার অন্যান্য কর্মকর্তারা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকা থেকে ইতিমধ্যে অন্তত ৪০ জন পথশিশুর জন্ম নিবন্ধন সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছেন বলে জানা গেছে|

একটি জন্ম নিবন্ধন সনদ কেবল এক টুকরো কাগজ নয়, বরং এটি একটি শিশুর সম্পূর্ণ আইনগত পরিচয় প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক ভিত্তি| এই সনদে থাকা নিবন্ধিত তথ্য বয়স ও নাগরিক পরিচয়ের একমাত্র সরকারি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে কাজ করে| শিক্ষা গ্রহণ, সরকারি হাসপাতাল থেকে স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি, রাষ্ট্রীয় সামাজিক সুরক্ষা ভাতা, আইনি বা বিচারিক সহায়তা এবং বিভিন্ন নাগরিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এই সনদের কোনো বিকল্প নেই| এককথায় বলতে গেলে, একটি জন্ম নিবন্ধন সনদ না থাকলে শিশুর জন্মের পর সরকারি টিকা গ্রহণ থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পদে পদে নানা ধরনের প্রশাসনিক ঝামেলা পোহাতে হয়| বর্তমানে বেসরকারি বেশ কিছু উন্নয়ন সংস্থার নিজস্ব উদ্যোগে পথশিশুদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ ও কর্মক্ষম জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার একটি মহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে| এমন প্রশিক্ষণের পর তারা কয়েকজন পথশিশুকে উন্নত কাজ শিখিয়ে বৈধ পথে বিদেশে পাঠানোরও ব্যবস্থা করেছিলেন| কিন্তু বিদেশে যাওয়ার জন্য যখন তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট তৈরি করার প্রয়োজন পড়ে, তখন জন্ম নিবন্ধন সনদ না থাকায় এক পাহাড়সম জটিলতা তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন| এমনকি একজন ভাসমান পথশিশু যখন বড় হয়ে কর্মক্ষম হওয়ার পর দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিয়ে করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়, তখনও এই জন্ম নিবন্ধন সনদের অভাবেই কাবিননামা তৈরি করতে গিয়ে তাদের চরম সামাজিক ও আইনি জটিলতা পোহাতে হয়| জাতিসংঘের সর্বজনীন শিশু অধিকার সনদের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, জন্মের পরপরই প্রতিটি শিশুর জন্ম নিবন্ধন করতে হবে এবং জন্মের পর থেকেই তার নিজস্ব নাম ও একটি নির্দিষ্ট জাতীয়তা অর্জনের পূর্ণ অধিকার থাকবে| বাংলাদেশ সরকার ১৯৯০ সালেই আন্তর্জাতিক এই সনদে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন প্রদান করেছে| ফলে দেশের প্রতিটি শিশুর জন্ম নিবন্ধন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম একটি পবিত্র ও আইনি দায়িত্ব| বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সহসভাপতি ও বিশিষ্ট পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদি আহসান এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, যেকোনো শিশুর জন্মের পর তার রাষ্ট্রীয় নিবন্ধন পাওয়াটা তার জন্মগত ও সাংবিধানিক অধিকার| অথচ বর্তমানে যাদের বাবা-মা এবং স্থায়ী ঠিকানা আছে, তারাই এই সনদ পেতে পদে পদে হিমশিম খাচ্ছেন| আর যাদের বাবা-মা নেই বা যারা খোলা আকাশের নিচে পথে বসবাস করেন, তাদের জন্য এই অধিকার আদায় করা আরও অনেক বেশি দুরূহ ব্যাপার| তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, এই ভাসমান পথশিশুদের সার্বিক দেখভাল করার সম্পূর্ণ আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব রাষ্ট্রের বা সরকারের| তাদের জন্য নিরাপদ বাসস্থান, পুষ্টিকর খাদ্য, উন্নত চিকিৎসা ও বিনামূল্যে পড়াশোনার ব্যবস্থা সরকারিভাবেই হওয়ার কথা ছিল| কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্রের এই কল্যাণমূলক কাজগুলোতে এখনো আমাদের অনেক বড় ধরনের ঘাটতি ও সমন্বয়হীনতা রয়ে গেছে|

পথশিশুদের বাইরে দেশের সাধারণ নাগরিকদের জন্য জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ভোগান্তি ও জটিলতা কোনো অংশে কম নয়| একটি সাধারণ জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করা, সনদে থাকা বাবা-মায়ের নামের ভুল তথ্য ঠিক করা এবং মৃত্যু নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নাগরিকদের কাছে নানা ধরনের অপ্রয়োজনীয় নথি ও তথ্যের প্রমাণ চাওয়া হয়| জানা গেছে, ২০২৬ সালের শুরুর দিকে সরকারি দপ্তরের পুরনো সার্ভার থেকে নতুন সার্ভারে তথ্য স্থানান্তরের অজুহাতে দেশের সব জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন এবং সংশোধন কার্যক্রম টানা দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছিল| এই দীর্ঘ অচলাবস্থার কারণে সেসময় সাধারণ নাগরিকদের পাসপোর্ট তৈরি, ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি এবং জমি রেজিস্ট্রেশনসহ অন্যান্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কাজে চরম স্থবিরতা ও ভোগান্তির সৃষ্টি হয়| রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা আব্দুল হাকিম আক্ষেপ করে জানান, দীর্ঘ চার মাস পেরিয়ে গেছে তিনি তার ছেলের জন্ম নিবন্ধনের জন্য নিয়ম মেনে অনলাইনে আবেদন করেছেন| এই চার মাসে কয়েক দফায় স্থানীয় কার্যালয়ে সশরীরে যোগাযোগ করার পরও তিনি এখনো তার সন্তানের সনদটি হাতে পাননি| সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সংশোধনের অনলাইন ব্যবস্থায় বেশ কয়েকটি জটিল ধাপ সংযুক্ত করা হয়েছে| যেমন, সন্তানের সনদে বাবা বা মায়ের নামের বানান সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রথমে বাবা বা মায়ের নিজস্ব জন্ম নিবন্ধনের তথ্য অনলাইনে সংশোধন করে আসতে হয়, যা একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার| এছাড়া আবেদনকারীর সচল মোবাইল নম্বর সংযুক্ত থাকা এবং সংশোধনের স্বপক্ষে একাধিক প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র দাখিল করার কঠোর শর্তও আরোপ করা হয়েছে| বর্তমান অনলাইন ব্যবস্থায় একটি জন্ম নিবন্ধন সনদ জীবনদশায় সর্বোচ্চ চারবারের বেশি সংশোধনের কোনো সুযোগ নেই|

নাগরিকদের এসব সীমাহীন ভোগান্তি ও পথশিশুদের বঞ্চনার বাইরে দেশের সামগ্রিক জন্ম নিবন্ধনের সার্বিক চিত্রও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পুরোপুরি সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি| বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ইউনিসেফ পরিচালিত ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র ৫৯ শতাংশের জন্ম নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে| আর এর চেয়েও হতাশার বিষয় হলো, নিবন্ধন হওয়া এই শিশুদের মধ্যে জন্মসনদের মূল কপি হাতে আছে মাত্র ৪৭ শতাংশ শিশুর| যদিও ২০১৯ সালের জরিপে এই হার ছিল যথাক্রমে ৫৬ এবং ৩৯ শতাংশ, অর্থাৎ গত কয়েক বছরে সামান্য অগ্রগতি হলেও তা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে| জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের অসচেতনতার পাশাপাশি চরম দারিদ্র্য, যাতায়াত খরচ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ইউনিয়ন পরিষদে পৌঁছানোর দুর্গম সুযোগও একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে| একই সঙ্গে দেশের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং জন্ম নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের ডাটাবেজের মধ্যে এখনো পর্যাপ্ত কোনো ডিজিটাল সংযোগ তৈরি করা সম্ভব হয়নি| এর ফলেই মূলত সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে জন্ম নেওয়া লাখ লাখ শিশুর জন্মের সময়ই তাৎক্ষণিকভাবে নিবন্ধন সম্পন্ন হচ্ছে না| নাগরিকদের এসব সীমাহীন ভোগান্তি ও পথশিশুদের নিবন্ধনের বিষয়ে সরকারি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নেওয়ার জন্য গতকাল সোমবার দুপুরে খোদ রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে গিয়েও কারও কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি| দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার জেনারেল তখন অন্য একটি সরকারি দায়িত্ব পালনে বাইরে থাকায় তিনি অফিসে উপস্থিত ছিলেন না| সেসময় দপ্তরে উপস্থিত অন্য কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও গণমাধ্যমের সঙ্গে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে রাজি হননি| পরবর্তীতে তথ্য জানার জন্য দপ্তরের অন্তত পাঁচজন কর্মকর্তাকে মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তাদের কেউই ফোন রিসিভ করার প্রয়োজনবোধ করেননি, যা সরকারি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর চরম জবাবদিহিহীনতাকেই সাধারণ মানুষের সামনে আবারও উন্মোচিত করেছে|

তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category