• বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ০৬:৫৯ অপরাহ্ন
Headline
সত্তরে স্বাস্থ্য রক্ষা— শুরু করতে হয় ত্রিশে: সাতটি পরামর্শ টি-টোয়েন্টি র‌্যাংকিংয়ে শ্রীলঙ্কাকে পেছনে ফেলল বাংলাদেশ কমিশনের লোভে বলি ৩১১ শিশু: হামের প্রকোপে অন্তর্বর্তী সরকারের অবহেলা ও বর্তমান সরকারের দায় তৃণমূলের ‘খেলা হবে’ থেকে ‘খেলা শেষ’ রূপোলি পর্দার কমান্ডার কি তামিলনাড়ুর মসনদে? ট্রাম্পের নতুন ব্যবসা: মধ্যপ্রাচ্যের রক্তপাতে আমেরিকার অস্ত্র, তেল ও ‘জলদস্যুতা’ বিএনপি-জামায়াতের টেন্ডার-লড়াই ও ক্ষমতার নতুন সমীকরণ ‘সালমানি’ কায়দায় নাবিল গ্রুপের উত্থান ও জব্দের জালে সাম্রাজ্য ‘বিকল্প শক্তি’ হতে আটঘাট বাঁধছে এনসিপি হাম পরীক্ষার কিট অবশিষ্ট আর মাত্র ৭টি: এরপর কী?

রূপোলি পর্দার কমান্ডার কি তামিলনাড়ুর মসনদে?

Reporter Name / ৪ Time View
Update : বুধবার, ৬ মে, ২০২৬

তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে সিনেমা কোনো নিছক বিনোদনের নাম নয়; এটি একপ্রকার সামাজিক ধর্মগ্রন্থ। ভারতের উত্তরের মানুষ যেখানে জনসভার মঞ্চে নেতা খোঁজে, দক্ষিণের মানুষ সেখানে নেতা খোঁজে রূপোলি পর্দায়। তাই তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে যখনই কোনো চিত্রতারকার প্রবেশ ঘটে, তখন দিল্লির বিশ্লেষকরা কিছুটা ভ্রু কুঁচকালেও চেন্নাইয়ের চায়ের দোকানের মানুষ অবাক হন না। সেই পুরনো রাজনৈতিক নাট্যমঞ্চের নতুন সংযোজন ‘থালাপতি’ বিজয়। আসল নাম জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর হলেও, তামিল ভাষায় ‘কমান্ডার’ বা ‘নেতা’ অর্থ বহনকারী থালাপতি নামেই তিনি পরিচিত। আর এবার সেই পেশিবহুল নামের ঘোড়ায় চড়েই তিনি নেমেছেন ভোটের ময়দানে, যেখানে তার দল ‘তামিলাগা ভেট্টরি কোঝাগাম’ (টিভিকে) ইতোমধ্যে বাজিমাত করতে শুরু করেছে।

টিভিকে: রাজনৈতিক ‘দুধের শিশু’র ধারালো দাঁত

বিজয়ের দল টিভির বয়স মাত্র এক বছর; রাজনৈতিক বিচারে বলতে গেলে একেবারে ‘দুধের শিশু’। কিন্তু শিশু হলেও এর যে ধারালো দাঁত আছে, তা দুটি বড় সমাবেশেই প্রমাণিত। প্রথম দুটি জনসভাতেই তরুণদের যে ঢল নেমেছে, তা দেখে পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর কপালে ভাঁজ পড়ে গেছে। সর্বশেষ সমাবেশ থেকে বিজয় ঘোষণা করেছেন, আগামী বছরের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি নিজে লড়বেন। এই একটিমাত্র বাক্য তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক আকাশে এমন শব্দ তুলেছে, যেন বহুদিনের শান্ত পুকুরে কেউ পাথর ছুড়ে মেরেছে।

তামিল রাজনীতি মূলত গত ৫০ বছর ধরে দুটি খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে—দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাগাম (ডিএমকে) এবং অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাগাম (এআইএডিএমকে)। এই দুই দৈত্য মিলে তামিল সমাজকে ভাগ করে রেখেছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও এই দুই দল ও কংগ্রেসের জোট ৩৯টি আসনেই জয়লাভ করেছে, যেখানে দিল্লির শাসক দল বিজেপি একটি আসনও পায়নি। থালাপতি কি এই জমাট বাঁধা বরফে ফাটল ধরাতে পারবেন? এই প্রশ্নই এখন দক্ষিণ ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।

সামাজিক ন্যায়বিচার ও ‘বিজেপির প্রক্সি’ হওয়ার জল্পনা

বিজয়ের রাজনীতিতে রামস্বামী পেরিয়ারের সামাজিক ন্যায়বোধের স্পষ্ট রেখা দেখা যায়। পেরিয়ার, যাকে দক্ষিণের আম্বেদকর বলা হয়, তার আদর্শকে ধারণ করে বিজয় নারী অধিকার, প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা, অর্থনৈতিক সমতা এবং ধর্মনিরপেক্ষ সমাজনীতির কথা বলছেন। কিন্তু দর্শন যতই সুন্দর হোক, তামিল সমাজ থেকে একটি বড় অভিযোগ ভাসছে—থালাপতি কি বিজেপির প্রক্সি?

অনেকেই মনে করেন, দক্ষিণে পুরনো কৌশলে সুবিধা করতে না পেরে বিজেপি এবার বিজয়কে সামনে এনে কংগ্রেস ও ডিএমকে-বিরোধী ধারা শক্তিশালী করতে চাইছে। বিজয় বলছেন, বিজেপি তার আদর্শিক শত্রু আর ডিএমকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু হিসাবটা মজার। তামিলনাড়ুতে বিজেপি বড় ভোট ফ্যাক্টর নয়। বিজয়ের আক্রমণ যদি ডিএমকের দিকে যায়, তবে পরোক্ষভাবে লাভ বিজেপিরই। আন্নামালাই, সীমান এবং রজনীকান্তকে ঘিরে এর আগে বিজেপি এমন বহু পরীক্ষা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। স্পিকার এম আপ্পাভুও প্রকাশ্যে এমন সন্দেহ জানিয়েছেন।

তবে বিজয়ের আলাদা শক্তিও আছে। তিনি খ্রিষ্টান। তামিল খ্রিষ্টান (৬%) এবং মুসলিম (৬%) ভোটের একটি বড় অংশ তার ধর্মনিরপেক্ষ ভাষায় আশ্বস্ত হতে পারে, যা এতদিন কংগ্রেস ও ডিএমকের ভোটব্যাংক ছিল।

মাদুরাই: রাজনীতির কুরুক্ষেত্র ও বিজয়ের শক্তি

আগামী বছর বিধানসভা নির্বাচনে বিজয় মাদুরাই থেকে লড়বেন। মাদুরাই তামিলনাড়ুর সাংস্কৃতিক রাজধানী ও রাজনৈতিক পরীক্ষাগার। মহাত্মা গান্ধী তার রাজনৈতিক জীবনে পাঁচবার এখানে এসেছিলেন। এখানে বিজয়ের বড় ভক্ত সমাজ রয়েছে। তবে মাদুরাইয়ের আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে মুরুগান মন্দির এবং সিকান্দর দরগাকে ঘিরে হিন্দুত্ববাদী উত্তেজনার মাঝেও সহাবস্থানের সংস্কৃতি রয়েছে। এই বহুস্তরীয় বাস্তবতায় বিজয়ের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি বড় পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে।

বিজয়ের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি আরেকটি বড় শক্তি হলো তার অঢেল অর্থ। রাজনীতিতে আদর্শ বড় হলেও, প্রচারের জন্য যে আঠা লাগে তা বাজার থেকেই কিনতে হয়। ২০২১ সালের হিসাবে তার সম্পদ ৪০০ কোটি রুপির বেশি। ‘লিও’ সিনেমার জন্য ১৩০ কোটি এবং ‘জননায়ক’ সিনেমার জন্য রেকর্ড ২৭৫ কোটি রুপি সম্মানী নিয়েছেন তিনি। মাদুরাইয়ের স্বল্পবিত্ত বামপন্থী কর্মীদের পকেট আর থালাপতির প্রচারযন্ত্রের মধ্যকার ব্যবধান শুধু আদর্শ দিয়ে ভরাট করা শক্ত।

দরজা খোলা রেখে ক্ষমতার অঙ্ক

সবাই এখন বিজয়কে ডাকছে। কংগ্রেস তাকে ডিএমকের মিত্র হিসেবে পেতে চাইছে, অন্যদিকে অমিত শাহ বলে রেখেছেন বিজয় চাইলে বিজেপিও জোটে প্রস্তুত। কিন্তু বিজয় কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখছেন—না তিনি এনডিএকে সমর্থন করছেন, না পুরোপুরি বিরোধী শিবিরে ঝুঁকছেন।

থালাপতি বিজয় কি সত্যিই ভারতের দক্ষিণে নতুন রাজনৈতিক কমান্ডার হতে যাচ্ছেন? এর উত্তর এখনো পুরোপুরি মেলেনি। তবে তিনি আর নিছক অভিনেতা নন, তিনি এখন তামিলনাড়ুর রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য সমীকরণ। দক্ষিণ ভারতের আবেগপ্রবণ অথচ নির্মম দর্শক আজ যে নায়ককে ফুল দেয়, কাল তাকে ভোটে হারাতেও কুণ্ঠা করে না। থালাপতির পথ একদিকে যেমন আলোয় উদ্ভাসিত, অন্যদিকে তেমনি কাঁটায় মোড়ানো। তিনি যদি দ্বিদলীয় রাজনীতিতে ফাটল ধরাতে পারেন, তবে ইতিহাস হবেন; আর না পারলে দক্ষিণের মানুষ হয়তো বলবে—পর্দার কমান্ডার ছিলেন, ভোটে কেবল চরিত্রাভিনেতা!

সূত্র: দ্যা প্রেস


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category