বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছে প্রবাস আয় বা রেমিট্যান্স। চলতি মার্চের মাত্র ১১ দিনে দেশে এসেছে ১৯২ কোটি (১.৯২ বিলিয়ন) ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৪.৩% বেশি। কিন্তু এই বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ সত্ত্বেও অস্থির হয়ে উঠেছে ডলারের বাজার। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের দাম ১ টাকা বেড়ে ১২৩ টাকা ৩০ পয়সায় ঠেকেছে। খোলা বাজারে (কার্ব মার্কেট) এই দর আরও বেড়ে ১২৬ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত উঠেছে।
রেকর্ড রেমিট্যান্স আসার পরও ডলারের দাম বাড়ার পেছনে ব্যাংকার ও বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি কারণ ও রহস্য দেখছেন:
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি: ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে শুরু হওয়া অস্থিরতাকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতার ও আমিরাতের মতো রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস দেশগুলোতে অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিচ্ছে একদল মুনাফাখোর।
মনস্তাত্ত্বিক চাপ: ভবিষ্যতে ডলারের দাম আরও বাড়বে—এমন আশঙ্কায় অনেক ব্যাংক বা ব্যবসায়ী ডলার ধরে রাখছেন।
বাজারভিত্তিক বিনিময় হার: বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে বাজারে হস্তক্ষেপ না করে ‘বাজারভিত্তিক দর’ নীতি অনুসরণ করছে। ফলে চাহিদা ও জোগানের দোহাই দিয়ে দাম বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ডলারের বাজারে অস্থিরতা থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে এখন পর্যাপ্ত রসদ রয়েছে। ১১ মার্চ পর্যন্ত দেশের গ্রস রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪.২৯ বিলিয়ন ডলারে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (BPM6) অনুযায়ী তা প্রায় ২৯.৫৭ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করলেও চলতি অর্থবছরে বাজার থেকে ৫.৫০ বিলিয়ন ডলার কিনে রিজার্ভ শক্তিশালী করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদসহ সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ডলারের এই দাম বৃদ্ধি অযৌক্তিক। যেহেতু আমদানি চাপ কম এবং রেমিট্যান্স রেকর্ড পর্যায়ে, তাই দাম বাড়ার কথা নয়। ডলারের দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর এই দেশে প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়ে যাবে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আশাবাদী যে এই অস্থিরতা সাময়িক। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং সুযোগসন্ধানীরা ডলার মজুত অব্যাহত রাখলে, রেকর্ড রেমিট্যান্স সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো কঠিন হয়ে পড়বে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘সজাগ দৃষ্টি’ এখন কতটা কার্যকর হয়, সেটিই দেখার বিষয়।