• বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:০২ অপরাহ্ন

শিক্ষক ও পরিকাঠামো সংকটে ধুঁকছে কারিগরি শিক্ষা

Reporter Name / ২ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও বাংলাদেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা খাত এখনো নানা সংকটের আবর্তে হাবুডুবু খাচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন সরকারের পক্ষ থেকে এই খাতের আমূল সংস্কার ও উন্নয়নের বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করার যে সম্ভাবনা ছিল, তা সম্পূর্ণ ভেস্তে যেতে বসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, দেশের অধিকাংশ কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বর্তমানে তীব্র শিক্ষার্থী খরা, শিক্ষক সংকট, ভঙ্গুর পরিকাঠামো এবং চরম প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে চলছে। এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মাঝে কারিগরি শিক্ষার প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, যুগোপযোগী পাঠ্যক্রমের অভাব এবং বিভিন্ন শিল্প-কারখানার সাথে দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগের কারণে এই খাতের সাথে বর্তমান শ্রমবাজারের চাহিদার এক বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের (বিটিইবি) সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর তথ্যে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ২ হাজার কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিগত ৩ থেকে ৭ বছর ধরে কোনো নতুন শিক্ষার্থী ভর্তিই হয়নি। এই নজিরবিহীন ভর্তি সংকট চরম আকার ধারণ করায় বোর্ড এখন এসব নিস্ক্রিয় প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমতি বা লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিলের তীব্র চিন্তাভাবনা করছে। গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী এ প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক সরকারই তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে কারিগরি শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা মুখে বললেও বাস্তবে এর উন্নয়নে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড। আহসান হাবিবও এই মতকে সমর্থন করে বলেন, সামাজিক আস্থার চরম অভাব, বাজারের চাহিদার সাথে পাঠ্যক্রমের অমিল এবং দক্ষ শিক্ষকের তীব্র ঘাটতির কারণেই আজ পুরো কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছে, যা মূলত দুর্বল পরিকল্পনা ও সমন্বয়হীনতারই বহিঃপ্রকাশ।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৫৪ সালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরীক্ষা ও সনদ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রথম একটি বোর্ড গঠন করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে ‘পূর্ব পাকিস্তান কারিগরি শিক্ষা বোর্ড’ নামে পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এর নাম পরিবর্তন করে বর্তমানের ‘বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড’ রাখা হয়। বিটিইবির বর্তমান চেয়ারম্যান মো। রুহুল আমিন আসন ও শিক্ষার্থীর সংখ্যার মধ্যকার এক বিশাল পার্থক্যের কথা উল্লেখ করে জানান, বর্তমানে মাধ্যমিক স্তরের সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা মিলিয়ে দেশে মোট আসন সক্ষমতা রয়েছে প্রায় ৩২ লাখ, অথচ এই স্তরের মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ১৭ লাখের কাছাকাছি। এর মধ্যে কারিগরি বোর্ডের অধীনে বর্তমানে মোট ১০ হাজার ৮৮৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চলে মাত্র ২১৯টি। মাধ্যমিক স্তর থেকে শুরু করে ৪ বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংসহ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট আসন সক্ষমতা প্রায় ১৯ লাখ।

চেয়ারম্যান আরও জানান যে, বিগত পাঁচ বছরে দেশে প্রতিবছর গড়ে ১৬ থেকে ১৮ লাখ শিক্ষার্থী মাধ্যমিক বা এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও কারিগরি শাখায় ভর্তির হার অত্যন্ত হতাশাজনক। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালে দেশে একাদশ শ্রেণিতে মোট ১৬ লাখ ৫৩ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও কারিগরি শিক্ষায় নাম লিখিয়েছে মাত্র ৩ লাখ ১৭ হাজার জন। ঠিক একইভাবে ২০২৩ সালেও ১৭ লাখ ২২ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে কারিগরি শাখায় ভর্তি হয়েছিল মাত্র ৩ লাখ ১৬ হাজার জন। এর অর্থ হলো, ২০২৪ সালেও কারিগরি শিক্ষার মোট আসনের প্রায় ৮১ শতাংশই সম্পূর্ণ শূন্য বা খালি রয়ে গেছে। অবশ্য রুহুল আমিন মনে করেন, ডেটাবেজে নাম থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান বাস্তবে পুরোপুরি নিস্ক্রিয় থাকায় দেশের প্রকৃত আসন সক্ষমতা ১২ থেকে ১৪ লাখের বেশি হবে না।

ভর্তি সংকটের চেয়েও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক সংকট। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৬১টি সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজে শিক্ষকের মোট অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১৫ হাজার ৩৬০টি। কিন্তু এর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৩ হাজার ৯১৬ জন শিক্ষক। অর্থাৎ এই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ৭৫ শতাংশ শিক্ষকের পদই সম্পূর্ণ শূন্য পড়ে রয়েছে। এছাড়া অধিদপ্তর ও এর আটটি আঞ্চলিক কার্যালয়, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং ভোকেশনাল টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন স্তরের ষষ্ঠ থেকে দশম গ্রেডের (চিফ ইনস্ট্রাক্টর, ইনস্ট্রাক্টর ও জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর) ১০ হাজার ৩১৯টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে মাত্র ৫ হাজার ৫০৭ জন কর্মচারী কর্মরত আছেন।

এই দীর্ঘমেয়াদী নিস্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে অবশেষে কড়া পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড। গত ৬ জুলাই বোর্ডের পক্ষ থেকে এইচএসসি-বিএমটি পাঠ্যক্রম পরিচালনা করা ১১২টি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে, যারা বিগত পাঁচ বছর ধরে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারেনি। তাদের আগামী ১৬ জুলাইয়ের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে যে কেন ২০২৭-২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে তাদের পাঠদানের অনুমতি বাতিল করা হবে না। এর আগে ১ জুলাই একই অভিযোগে ১ হাজার ৮৫টি বেসিক কোর্স পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, ১২০টি ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং, ১৫টি টেক্সটাইল এবং ১২টি কৃষি ডিপ্লোমা প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া ২৪ জুন এসএসসির ৪৪৩টি এবং দাখিলের ১৭৮টি ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠানকেও একই ধরণের নোটিশ পাঠিয়ে ২২ জুলাইয়ের মধ্যে কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে।

দিনাজপুরের মনশাপুর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো। মাহফুজ্জামান এবং নাটোরের জোনাইল মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ শিমলা আক্তার বানু জানান, প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকার সাধারণ মানুষ কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে একেবারেই সচেতন নন। এছাড়া স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও তদবিরের কারণেও অনেক সময় সঠিক মূল্যায়ন করা সম্ভব হয় না, যার ফলে তাদের প্রতিষ্ঠানে গত তিন বছর ধরে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। কারিগরি বোর্ডের চেয়ারম্যান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব না দিলে এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করা হবে। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, দেশের কিছু সাধারণ সাধারণ স্কুলে বিশাল অবকাঠামো বা ল্যাপটপ থাকলেও বিদ্যুৎ নেই, অন্যদিকে ৯০-এর দশকের পর গড়ে ওঠা বেসরকারি কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব কোনো ভবন, আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা শিক্ষক প্রশিক্ষণের ন্যূনতম বালাই নেই। অনেক ক্ষেত্রে মাত্র একজন শিক্ষককে দিয়ে জোর করে চারটি ভিন্ন বিষয় পড়ানো হচ্ছে।

রাশেদা কে চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কোন জেলায় বা এলাকায় কোন ধরণের কারিগরি শিক্ষার চাহিদা রয়েছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ম্যাপিং বা জরিপ ছাড়াই রাজনৈতিক প্রভাবে শুধু ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যা এখন দক্ষ ইনস্ট্রাক্টর ও ল্যাবের অভাবে ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে পর্যাপ্ত আবাসিক সুবিধা এবং নারী শিক্ষকের অভাবে ছাত্রীদের জন্য এই ধারায় পড়াশোনা করা আরও বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আহসান হাবিব বলেন, উন্নত দেশ যেমন অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছায় কারিগরি পথ বেছে নেয় এবং সেখানকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে বিভিন্ন শিল্প-কারখানার সরাসরি চুক্তি থাকে, যা আমাদের দেশে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। আমাদের দেশের মানুষ এখনো মনে করে কারিগরি শিক্ষা কেবল দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য, যা একটি ভুল সামাজিক ধারণা। অনেকে কেবল সরকারি এমপিও সুবিধা পেতে বা আত্মীয়স্বজনকে চাকরি দিতে নিজেদের জমিতে নামসর্বস্ব এসব প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছেন।

অবশ্য দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই খাতের সংস্কার নিয়ে নতুন আশার আলো দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে মাধ্যমিক স্তরে কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং ইতিমধ্যে ২০২৮ সালের নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা’ নামের একটি নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর আগে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকেও কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, শুধু নতুন পাঠ্যক্রম বা সদিচ্ছা প্রকাশই নয়, বরং শিক্ষক সংকট দূর করে ও পরিকাঠামো সচল করার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি কারিগরি প্রতিষ্ঠানকে বাস্তবমুখী করে গড়ে তোলা হবে।

তথ্যসূত্র: নিউএজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category