রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের ফুটফুটে শিশু রামিসাকে পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যার ঘটনায় দায়ের করা চাঞ্চল্যকর মামলার আনুষ্ঠানিক বিচারকাজ শুরু হয়েছে। সোমবার সকালে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে মামলার প্রধান দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হয়। তবে অভিযোগ গঠনের এই দিন আদালত প্রাঙ্গণে এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে সম্পূর্ণ নতুন এক দাবি উত্থাপন করে বলেন যে, এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পেছনে ‘ডলার’ নামের তৃতীয় এক ব্যক্তির সরাসরি হাত রয়েছে।
কারাগার থেকে কড়া নিরাপত্তায় আসামিদের আদালতে হাজির করার সময় সোহেল রানা নিজেকে আংশিক নির্দোষ দাবি করে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য দেন। তিনি প্রকাশ্যে বলেন যে, তিনি একা এই ঘটনার জন্য দোষী নন এবং তার স্ত্রীর এতে কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই। উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, তিনি শুধু শিশুটিকে ধর্ষণ করেছেন, কিন্তু তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে ডলার নামের ওই ব্যক্তি। নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা থেকে হোক বা অন্য কোনো কারণে, তিনি আরও অভিযোগ করেন যে ডিএনএ পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন হাতে আসার আগেই তড়িঘড়ি করে এই অভিযোগপত্র তৈরি করা হয়েছে। সোহেলের দাবি অনুযায়ী, এই ‘ডলার’ নামের রহস্যময় ব্যক্তিটি মিরপুর ১১ নম্বর এলাকার একজন বাসিন্দা এবং তিনি আর্থিকভাবে বেশ প্রভাবশালী। তবে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এই তৃতীয় ব্যক্তির বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত শেষ করে গত ২৪ মে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে পূর্ণাঙ্গ অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পল্লবী থানার উপপরিদর্শক অহিদুজ্জামান। পরবর্তীতে আদালত সেটি ‘দেখিলাম’ উল্লেখ করে বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালে পাঠান। তদন্তে শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যার দায়ে সোহেল রানা এবং এই পৈশাচিক কাজে সহযোগিতার দায়ে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। সোমবার সকালে আসামিদের কেরানীগঞ্জ ও কাশিমপুর কারাগার থেকে এনে অভিযোগ গঠনের পর আদালত মঙ্গলবার থেকেই সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেছেন। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপক্ষ মোট ১৮ জনকে সাক্ষী হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করেছে।
গত ১৯ মে সকালে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি আবাসিক ভবনে ঘটে যায় এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। নিহত রামিসা স্থানীয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। ঘটনার দিন সকালে শিশুটি বাসা থেকে বের হওয়ার পর একই ফ্ল্যাটের সাবলেট বা উপভাড়াটে সোহেল ও স্বপ্না অত্যন্ত সুকৌশলে তাকে ভবনের তৃতীয় তলায় নিজেদের রুমে ডেকে নিয়ে যায়। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শিশুটির মা আসামিদের বন্ধ রুমের সামনে মেয়ের স্যান্ডেল দেখতে পান এবং অন্যদের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে খাটের নিচে রামিসার মাথাবিহীন দেহ এবং বাথরুমের বালতির ভেতর তার কাটা মাথা পাওয়া যায়। ঘটনার পরপরই পুলিশ নির্লিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকা স্বপ্নাকে আটক করে এবং ওই দিন সন্ধ্যায়ই নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে পালিয়ে যাওয়া প্রধান ঘাতক সোহেলকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনে।