-রিন্টু আনোয়ার
পিঠ দেখানো নয়, দিল্লির চোখে চোখ রেখে কথা বলছে এখন ঢাকা। কখনো ঘৃণায়, কখনো কৌশলী কূটনীতিতে ভারতেকে অবিরাম চপেটাঘাত করেই চলছে বাংলাদেশ। ভারতের খাস পছন্দের এবং নিয়োগকৃত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের লজ্জাজনক পরিণতি সইতে পারছে না ভারত। তারওপর একের পর এক বাংলাদেশের ডেমকেয়ার ভাব সহ্য করা বিষ খেয়ে বিষ হজমের মতো দেশটির জন্য। কিন্তু, পাল্টা ব্যবস্থা বা প্রতিশোধের কোনো উপায় পাচ্ছে না।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর দিল্লিতে বসে হাসিনা নানা ধরনের ষড়যন্ত্রের তীর ছুড়েছে বাংলাদেশের দিকে। প্রতিটি ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে। পাচার করা টাকা খরচ করে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের চেষ্টা করছে। সজিব ওয়াজেদ জয় কোটি কোটি টাকা খরচ করে যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট নিয়োগ করেছে। সেটিও কার্যত ব্যর্থ হয়ে গেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের মাধ্যমে। হাসিনার রাজনীতিতে জাতিসংঘ কার্যত শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসসহ তার সরকারের ভারত জুজু এরইমধ্যে বকটে গেছে। ট্রাম্প-মোদীর বৈঠকের চব্বিশ ঘন্টা না পেরুতেই দ্বিতীয় দফায় ভারতীয় অভিবাসীদের সামরিক বিমানে হাতকড়া ও শিকলে পা বেঁধে ফেরত পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রও সেই জুজু আরো কাটিয়ে দিয়েছে। ভারতের এখন অপেক্ষা কবে সরবেন ইউনূস? তার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার ধারেকাছে নয় মোদির গ্রহণযোগ্যতা। চব্বিশের বিপ্লব ও ইউনূসের গ্রহণযোগ্যতা ভারতকে কাবু করে দিয়েছে কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতে নয়। বিশ্ব রাজনীতিতেও। তাই বাংলাদেশে অণ্তর্বতী সরকারকে নাকানানিচুবানিতে রাখা এবং বাজে অবস্থা করে বিদায় করে রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ভারতের। ড. ইউনুস নির্বাচন দিয়ে সরে গেলে যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসুক, তখন অনেক কিছু করার থাকবে বলে অপেক্ষমান ভারত।
নানা ঘটনার পরিক্রমায় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক একটি কঠিন পর্যায়ে। শেখ হাসিনাকে আশ্রয়ে রেখে ঢাকার সঙ্গে শীতল সম্পর্ক করা অসম্ভব তাও বুঝতে বাকি নেই ভারতের। তারপরও হাল ছাড়ছে না। আবার শেখ হাসিনাকেও স্টেটলেস করতে চায় না। তাকে আশ্রয়ে রেখেই জোড়াতালিতে হলেও খাতির জমাতে নানা পর্যায়ে কথা হচ্ছে। সম্পর্ক নিবীড় করার ডিপ্লোমেটিক বয়ান দিচ্ছে। দিল্লির পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিসরি ঢাকা সফর করে গেছেন। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপর ঘনিয়ে আসা ‘কালো মেঘ’ দূর করার কথা শুনিয়েছেন। জানিয়ে গেছেন ‘একটি ইতিবাচক, গঠনমূলক ও পারস্পরিক লাভজনক অংশীদারিত্ব’ গড়ে তোলার আহ্বান। দেশে-বিদেশে আরো নানা পর্যায়ে দূতিয়ালিও হচ্ছে। আবার ভারত দুষ্টামিও ক্ষ্যান্ত দিচ্ছে না। নানা ছুতায় ও গুজবে বাংলাদেশকে অস্থির রাখার টোকা দিচ্ছে। সেই আলোকে সাফল্য পাচ্ছে না। বরং বাংলাদেশে ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট আরো দৃঢ় হচ্ছে। তারপরও ভারত হাল ছাড়ে না।
হালনাগাদে ভারত মাথা ঢুকিয়েছে নির্বাচনী রাজনীতির নতুন বাঁকে। সংস্কার, নির্বাচন, আগে স্থানীয় সরকার না জাতীয় নির্বাচন-এসব প্রশ্নে তেল ঢালছে আচ্ছা রকমে। নির্বাচনী ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত অনুযায়ী জাতীয় সংসদে আসন বণ্ঠন, সংস্কারের অজুহাতে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ দীর্ঘায়িত করে নতুন করে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করা এবং জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচনের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টির মাস্টারপ্ল্যাস নিয়ে এগোচ্ছে। দিল্লির এ নীলনকশা ধরে ফেলেছেন রাজনীতি সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান রাখা মহলও। কয়েকটি রাজনৈতিক দল এ ঘোরাটোপে পড়েছে। তারা কথামালার রাজনীতিতে ‘আগে সংস্কার পরে নির্বাচন’, ‘সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থা’, ‘জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন’সহ নানা দাবির ঢোলে তাল দিচ্ছে। আসলে নির্বাচন, সংস্কার, ফ্যাসিস্টের বিচার একটাও তাদের মূল উদ্দেশ্য নয়। মূল উদ্দেশ্য গণ্ডগোল পাকানো। বিস্ময়করভাবে দক্ষিণপন্থী কয়েকটি দলও বাম ঘরানার সঙ্গে সুর মেলাচ্ছে।
আওয়ামী লীগ যেন সামনের নির্বাচনে আসতে পারে , সংসদে প্রতিনিধিত্বও করতে পারে তা নিশ্চিত করাই এ ঢোল-তবলার বেসুরা গীতের টার্গেট। সেই টর্গেট মতো আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন, জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ আরো নানা ইস্যু তাজা রাখা হচ্ছে। সরকারের দিক থেকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে- সংস্কার, ফ্যাসিস্টের বিচার ও নির্বাচন একসঙ্গে চলবে। এ গুলোর কোনোটি কোনোটির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। প্রধান উপদেষ্টা সংস্কারকেও প্ল্যাক্সিবল করে দিয়েছেন। তার ভাষায়- রাজনৈতিক দলগুলো যতটুকু সংস্কার চাইবে ততটুকু সংস্কারের পর নির্বাচন। রাজনৈতিক দলগুলোই করবেমূল সংস্কার। ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে তিনি বলেছেন, তার সরকার সেকেন্ড ইসিংস শুরু করেছে। নতুন বাংলাদেশ মানে নতুন জাতীয় সংসদ নির্বাচন।’
বলার তো আর কিছু বাকি রাখেননি। প্রায় সবই পরিস্কার। এরপরও নানা গীত-বাজনা। কে না বোঝে, সংস্কার মূলত চলমান প্রক্রিয়া। শুধু রাজনীতি নয়, প্রতিটি ক্ষেত্রে সংস্কার অপরিহার্য। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ১০টি সেক্টরে সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। সংস্কার কমিশনগুলো তাদের রিপোর্ট জমাও দিয়েছে। সংস্কার ইস্যুতে প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়েছে। কমিশন এরইমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। একটি ফলপ্রসু বৈঠকের পরও নানা ভেজাল পাকানো হচ্ছে। যেখানে টানা ১৫ বছর ভোট দিতে না পারায় দেশের সাধারণ ভোটাররা ভোট দেয়ার জন্য মুখিয়ে রয়েছেন। তারা নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে উদগ্রীব। সেখানে ভেজাল-মতবিরোধ এমন কি শিক্ষাঙ্গনে সংঘাতের মতো ঘটনা ঘটছে অহরহ।
এদিকে দৃশ্যত অগ্রাহ্য-তাচ্ছিল্য করলেও, নানা অভিযোগ রটলে-রটালেও জুলাই-আগস্ট বিপ্লবী ছাত্রদের গড়তে যাওয়া দল নিয়ে উদ্বিগ্ন মূলধারাসহ সহযাত্রী আশপাশের রাজনীতিকরা। ছাত্ররা নতুন রাজনৈতিক দলই নয়, একটি ছাত্র সংগঠনও রাখবে। এর দিকে তীক্ষ নজর রাজনীতিকদের। আবার তাদের প্রতি প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের আশীর্বাদ নিয়ে রাখঢাক নেই। তা একেবারে প্রকাশ্যে। জুলাই-আগস্ট আন্দোলন নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর তখন কোনো প্রশ্ন ছিল না। ছাত্ররা বিজয়ী হতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ-সংশয় ছিল। কারন ফ্যাসিস্ট পতনের আন্দোলন অতীতে বারবার রাজনৈতিক দলগুলো ব্যর্থ হয়েছে। গুলির সামনে দাঁড়ানোই নয়, অকাতরে প্রাণ দেয়ার দৃষ্টান্ত তারা ছাত্রদের মতো দেখাতে পারেনি। যার জেরে অবিশ্বাস্য এবং মিরাকল সাফল্য ছাত্রদের। এখন তাদের নতুন সংগঠনের ভবিষ্যত নিয়েও সন্দেহ। সঙ্গে বিরোধীতা-সমালোচনা মশকরাও। ছাত্রদের সেই সময়ের ক্রেজ ও জনসমর্থন এখন নেই বলে মূল্যায়ন রাজনীতিকদের। এক সময় তাদের সক্ষমতা নিয়ে যে পরিমাপ ছিল তখনকার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের।
দীর্ঘ ১৫-১৬ বছর আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে পরীক্ষায় অনেকের অকৃতকার্যতার মাঝে ছাত্রদের ওই সাফল্যের পেছনে রাজনীতির বাইরের সুপার পাওয়ার ছাড়াও যোগ হয়েছিল কিছু বিদেশি শক্তি। যার অনেক কিছু এখনো রাজনীতিকদের অজানা। তাদের জেনারেশন গ্যাপ এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঘটে যাওয়া আমূল পরিবর্তনের সাথে ধাতস্থ হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের অবদানের কথা ড. ইউনূস নিয়মিত কেবল স্বীকারই করছেন না, তাদেরকে একটি দল করার পরামর্শও রয়েছে তার। এর ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, বড়রা ( রাজনৈতিক দলগুলো) চব্বিশের রক্তের অঙ্গীকার রাখবে না। সেই অঙ্গীকার ছাত্রদেরই ধরে রাখতে হবে। নতুন দল করতে হবে। আর সেই দলটি হতে যাচ্ছে মধ্যপন্থার। না ডান, না বাম। তবে, প্রচণ্ড ভারতবিরোধী। ভারত যা চাইবে তার বিপরীতটা করার মানসিকতা। কারো লেজুড়বৃত্তি না করে স্বতন্ত্র-স্বাধীন থাকবে বলে অঙ্গীকার তাদের।
এ অভিযাত্রায় পুরানো টিকেটের আর ভ্যালু থাকছে না। নতুন দল করতে যাওয়া নেতৃত্ব ফ্যাসিস্ট হটানোর অভিজ্ঞ। তবে, কখনো জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেনি, ক্ষমতায় যায়নি। এরইমধ্যে তাদের নিয়ে সমালোচনামুখর রাজনীতিকরা। এছাড়া যে নতুন দল হতে যাচ্ছে তাদের মধ্যে তিন-চার বিভক্তির কথা গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারিত। কিন্তু, ছাত্ররা এর কোনো জবাব দেয় না। বিভক্তি অস্বীকার করে না। স্বীকারও করে না। কথার অনেক মারপ্যাঁচ তাদের মধ্যে। যা তাদের ম্যান্টর প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের মধ্যেও। সাদামাটা ভাষায় রাজনীতিবিদদের বলেছেন, আপনারা যা কিছু বলবেন বা লিখিত দেবেন সব ওয়েবসাইটে দেয়া হবে। সংস্কার বাধ্যতামূলক নয় মন্তব্য করে বলেছেন, কেউ সংস্কার না চাইলেও চার্টারে তা লিখে সাইন করতে হবে। জনগণ তা দেখবে এবং বিচার করবে। ড. ইউনুসের এ ভাষার মাঝে সুক্ষ রাজনীতি দেখছেন ঝানু রাজনীতিকরা। এটি প্রায় পরিস্কার যে, শেখ হাসিনার রেখে যাওয়া বিধ্বস্ত প্রশাসনের উপর গো-স্লোতে নিয়ন্ত্রণ আনছেন ড. ইউনুস।সংস্কার এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের যা অপরিহার্য। যার সূত্রপাত হয়েছে জেলা প্রশাসক সম্মেলনের মাধ্যমে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, জনসেবা, জনদুর্ভোগ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, আইনকানুন ও বিধিমালা সংশোধন এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সম্প্রতি শেষ হলো ডিসি সম্মেলন।সেখানেও আগে স্থানীয় নির্বাচনের তাগিদ এসেছে।
সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত অনুযায়ী জাতীয় সংসদে আসন বণ্ঠন, সংস্কারের অজুহাতে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ দীর্ঘায়িত করে নতুন করে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করা এবং জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করে মাঠপর্যায়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে বিপাকে ফেলাসহ সুর-বেসুর মিলিয়ে গীতগান বেশি হয়ে যাচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবে ভারত সে সুযোগ নেবেই।
লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintu108@gmail.com