• মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩২ অপরাহ্ন
Headline
শ্বশুরবাড়ির সাথে সম্পর্ক: অভিজ্ঞতা থেকে ৬টি পরামর্শ বিপিএলে ফিক্সিং : সাবেক পরিচালকসহ তিনজন নিষিদ্ধ থার্ড টার্মিনালের র‌্যাম্প থেকে পিকআপ পড়ে বিমানবাহিনীর ৩ সদস্য নিহত সরকারি অর্থের অপচয় মেনে নেয়া হবে না: অর্থমন্ত্রী স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে: স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী সীমান্ত নজরদারিতে যুক্ত হচ্ছে থার্মাল ও নাইট ভিশন ড্রোন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া শিক্ষক বরখাস্ত বেআইনি: হাইকোর্ট যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে ফিরলে ইরানও প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে আইপিইউ: শামা ওবায়েদ সাংবাদিকদের জীবিকার নিশ্চয়তায় ওয়েজ বোর্ড নিয়ে দ্রুত কাজ করবে সরকার : ডা. জাহেদ

সরকারি বেতন বৃদ্ধি: চাপে বেসরকারি খাত, উসকে দিচ্ছে মূল্যস্ফীতি

Reporter Name / ১ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য সদ্য অনুমোদিত নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে নানামুখী আলোচনা ও বিস্তর বিশ্লেষণ| একদিকে এই বিশাল অঙ্কের বেতন বৃদ্ধি সরকারি চাকুরেদের মাঝে স্বস্তি ও আনন্দের বন্যা বইয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে দেশের বৃহত্তর অর্থনীতিতে এটি এক অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিচ্ছে| অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারি খাতের এই আকাশচুম্বী বেতন বৃদ্ধির বিশাল ঢেউ খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে| এর ফলে সবচেয়ে বড় ও ধ্বংসাত্মক ধাক্কাটি এসে লাগবে বর্তমানে ধুঁকতে থাকা ভঙ্গুর বেসরকারি খাতের ওপর| বাজারে বিপুল অর্থের সরবরাহ বাড়ার কারণে রাতারাতি জীবনযাত্রার ব্যয় হুহু করে বেড়ে যাবে, যার প্রত্যক্ষ ও নির্মম শিকার হবে দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ| এমনিতেই দেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাত ভয়াবহ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং বৈশ্বিক নানামুখী অস্থিরতার কারণে চরম চাপের মুখে নিপতিত রয়েছে| এই অবস্থায় সরকারি বেতন বৃদ্ধির বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব সামাল দেওয়া দেশের অর্থনীতির জন্য এখন সবচেয়ে বড় ও কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে| সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি এখন সাধারণ মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো, বেতন বাড়লেই কি আসলেই সরকারি দপ্তরগুলোতে হয়রানি ও দুর্নীতি কমবে, নাকি জনগণের ঘাড়ে কেবল বিশাল কর ও ব্যয়ের বোঝাই বাড়বে|
সার্বিক এই সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ডক্টর এম কে মুজেরী| গণমাধ্যমের কাছে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তিনি জানান, নতুন এই পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো আগামী কয়েক বছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে| ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের হাতে পর্যায়ক্রমে বাড়তি অর্থ আসবে এবং বাজারে তাদের ব্যক্তিগত ক্রয়ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে| কিন্তু এর অবধারিত ও ভয়ংকর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের বিশাল বেসরকারি খাতের ওপর| সরকারি চাকুরেদের বেতন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাজারে বাড়িভাড়া থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম এবং সার্বিক জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত প্রবণতা তৈরি হবে| এই মূল্যস্ফীতির প্রবল ঢেউ অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে আছড়ে পড়বে| ডক্টর মুজেরী সবচেয়ে বড় যে সংকটের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তা হলো, দেশের মোট কর্মজীবীদের মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের সংখ্যা খুবই নগণ্য| এর বাইরে বিশাল যে জনগোষ্ঠী বেসরকারি বা সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিক খাতে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন, তাদের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পে-স্কেল বা নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো নির্ধারিত নেই| তারা সম্পূর্ণভাবে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের মর্জিমতো এবং নির্দিষ্ট শর্ত বা চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করে থাকেন| ফলে বাজারে যখন জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়বে, তখন স্বাভাবিকভাবেই জীবন বাঁচাতে বেসরকারি খাতের কর্মীদের মধ্যেও নিজেদের বেতন বাড়ানোর জন্য একটি যৌক্তিক দাবি ও চরম অসন্তোষ তৈরি হবে|
কিন্তু বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে চাইলেই যে সরকারি স্টাইলে রাতারাতি কর্মীদের বেতন বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়, সেই রূঢ় বাস্তবতার কথাও তুলে ধরেছেন এই প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ| ডক্টর মুজেরীর মতে, বর্তমানে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নানামুখী সংকটের কারণে দেশের শিল্পকারখানাগুলোর স্বাভাবিক উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে| কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, ডলার সংকট ও অন্যান্য লজিস্টিক সমস্যায় জর্জরিত বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়-ব্যয়ের পরিস্থিতি এখন মোটেও অনুকূলে নেই| ফলে পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক না কেন, তাদের কর্মীদের বেতন বাড়ানোর সুযোগ বা আর্থিক সক্ষমতা এখন অত্যন্ত সীমিত| যাদের কোনো নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো নেই, সেই বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের ওপর এই মূল্যস্ফীতি এক অমানবিক ও অসহনীয় চাপ তৈরি করবে| অন্যদিকে, সরকারের বর্তমান নাজুক আর্থিক সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি কোষাগারের অবস্থা খুব একটা ভালো না থাকলেও এই মুহূর্তে বেতন বাড়ানো ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সামনে আর কোনো খোলা পথ ছিল না| রাজনৈতিক ও কাঠামোগতভাবে সরকারের ওপর আমলাতন্ত্রের এক বড় ধরনের চাপ ছিল, যার কারণে বাধ্য হয়েই তাদের এই বিশাল আর্থিক দায় কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে|
দেশের শিল্প খাতের বর্তমান চরম দুর্দশা এবং নতুন বেতন কাঠামোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে চরম হতাশা ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ নিটপণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম| তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, সরকারি খাতের এই বিশাল বেতন বৃদ্ধি নিশ্চিতভাবেই বেসরকারি খাতে কর্মরত লাখ লাখ শ্রমিকের বেতন বাড়ানোর জন্য একটি তীব্র ও অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ তৈরি করবে| কিন্তু বর্তমান বৈরী অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সামগ্রিকভাবে কর্মীদের বেতন এক লাফে বাড়িয়ে দেওয়ার মতো কোনো জাদুকরি ক্ষমতা বেসরকারি খাতের হাতে অবশিষ্ট নেই| তিনি স্বীকার করেন যে, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার কারণে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির একটি যৌক্তিক প্রয়োজন হয়তো ছিল| তবে বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত দেশের ভেতরে মূল্যস্ফীতির আগুনকে আরও বেশি উসকে দেবে এবং বাজার ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলবে| মোহাম্মদ হাতেম বাস্তবতার এক করুণ চিত্র তুলে ধরে বলেন, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় ফ্রন্টেই দেশের বেসরকারি খাত এখন এক কঠিন অস্তিত্বের সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে| একদিকে দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র হাহাকারের কারণে কারখানার চাকা ঠিকমতো ঘুরছে না এবং উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে| অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুদ্ধাবস্থা ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি আদেশ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে| এমন ত্রাহি অবস্থায় বেসরকারি খাতের ঘাড়ে নতুন করে কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির চাপ চাপিয়ে দেওয়া হলে দেশের বহু ছোট-বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে|
অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি এই বেতন বৃদ্ধির ফলে সুশাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধের বিষয়টিও সমাজে নতুন করে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে| সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ডক্টর বদিউল আলম মজুমদার এই বেতন কাঠামোর নৈতিক ও প্রায়োগিক দিক নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন| তিনি বলেন, জনগণের কষ্টার্জিত করের টাকায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা এক লাফে এতটা বাড়ানো হলো, কিন্তু এর বিনিময়ে সাধারণ জনগণ সরকারি দপ্তরগুলোতে কাঙ্ক্ষিত ও বাধাহীন সেবা পাবে কি না, বা ঘুস-দুর্নীতি একেবারে বন্ধ হবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন| অতীতেও বহুবার সরকারি চাকুরেদের বেতন বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু সেই অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের মোটেও কোনো আশার আলো দেখায় না| ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে, কেবল বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে কোনোভাবেই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি বা আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বন্ধ করা যায় না| ডক্টর মজুমদারের মতে, দুর্নীতি নামক এই ভয়ংকর ব্যাধিটি আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ডিএনএ-এর সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে মিশে গেছে এবং এটি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে| কেবল বেতনের অঙ্ক বাড়িয়ে এই মজ্জাগত ও চারিত্রিক সমস্যার সমাধান কখনোই সম্ভব নয়| রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে দুর্নীতি সমূলে উৎপাটন করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন এবং কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা| এ জন্য সরকারকে গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে অত্যন্ত সাহসী, স্বচ্ছ ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাকে তিনি ‘রেডিকেল সার্জারি’ বা বিশেষ কাঠামোগত অপারেশন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন| কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকার কতটা কঠোর অবস্থান নিতে পারবে এবং আমলাতন্ত্রের ওপর কতটা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, তা নিয়ে তিনি গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন|
তথ্যসূত্র: যুগান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category