গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিনের তীব্র সংকটের কারণে গত ৭২ ঘণ্টায় কুকুরের কামড়ে তিনজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে ভ্যাকসিন না পেয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে গিয়েই পেরিয়ে যাচ্ছে চিকিৎসার অমূল্য সময়। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে চড়া দামে ভ্যাকসিন কিনেও শেষ রক্ষা হচ্ছে না আক্রান্তদের। এই ঘটনায় সুন্দরগঞ্জের কঞ্চিবাড়ী ও ছাপরহাটী ইউনিয়নে সাধারণ মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
গত ২২ এপ্রিল সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ী ও ছাপরহাটী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে একটি বেওয়ারিশ কুকুর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে দুই শিশু ও দুই নারীসহ অন্তত ১৩ জন গুরুতর আহত হন। আক্রান্তদের হাসপাতালে নেওয়া হলেও যথাসময়ে ভ্যাকসিন না পাওয়ায় র্যাবিস ভাইরাসে (জলাতঙ্ক) আক্রান্ত হয়ে গত ৬ মে মারা যান কঞ্চিবাড়ী গ্রামের ফুলু মিয়া এবং বজরা কঞ্চিবাড়ী গ্রামের খোকা রামের স্ত্রী নন্দ রানী (৫৫)। সর্বশেষ ৮ মে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রতনেশ্বর কুমার নামের এক রাজমিস্ত্রি। এছাড়া আশঙ্কাজনক অবস্থায় আফরোজা বেগম নামের এক নারীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে এবং বাকিরা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছেন।
নিহত রতনেশ্বর কুমারের পরিবারের ভয়াবহ অভিজ্ঞতায় সরকারি হাসপাতালগুলোর অব্যবস্থাপনার চিত্র ফুটে উঠেছে। রতনেশ্বরের ভাই রবিন্দ্র কুমার জানান, আহত হওয়ার পরপরই তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে ক্ষতস্থান ড্রেসিং করার পর জানানো হয় যে কোনো ভ্যাকসিন নেই। এরপর প্রাণ বাঁচাতে তাকে গাইবান্ধা জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখানেও একই উত্তর মেলে। পরবর্তীতে ফার্মেসি ও বেসরকারি ক্লিনিকে হন্যে হয়ে খুঁজে ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পর চড়া দামে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যাওয়ায় ভ্যাকসিন নেওয়ার ১৪ দিনের মাথায় জলাতঙ্কে তার মৃত্যু হয়। স্থানীয় ইউপি সদস্য তাজরুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন থাকলে এই অকাল মৃত্যুগুলো এড়ানো যেত।
ভ্যাকসিন সংকটের কথা স্বীকার করে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা দিবাকর বসাক জানান, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভ্যাকসিনের কোনো সরবরাহ ছিল না। তবে চলতি মাসে ৩০টি ভ্যাকসিন কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেছে। তিনি কুকুরের কামড়ে আহতদের দ্রুত ক্ষতস্থান সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন।
এদিকে, গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের চিত্রও হতাশাজনক। মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালেও জলাতঙ্ক রোগের কোনো ভ্যাকসিন অবশিষ্ট নেই। সেবা নিতে আসা পলাশবাড়ী উপজেলার বিশাল তালুকদার এবং সুন্দরগঞ্জের তাসপিয়া ও ববিতার মতো অনেককেই বাধ্য হয়ে বাইরের ফার্মেসি থেকে চড়া দামে ভ্যাকসিন কিনতে হচ্ছে। হাসপাতালের ডগবাইট ইনচার্জ শফিকুল ইসলাম জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ১৫১৭ জনকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে এবং আজই হাসপাতালের মজুদ শেষ হয়ে গেছে। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে নতুন ভ্যাকসিন আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি জানান।