ইনকিলাব মঞ্চের বহুল আলোচিত মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এক অভূতপূর্ব মোড় এসেছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক একটি চাঞ্চল্যকর বক্তব্যকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে এই মামলার বর্তমান তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি গোপন অনুরোধ এবং এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল হোতাদের বিষয়ে নিজের অবগতির কথা জানিয়ে মমতার দেওয়া এই বক্তব্য বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। সিআইডি জানিয়েছে, তদন্তের স্বার্থে যেকোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যই খতিয়ে দেখা হবে এবং এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে বাংলাদেশ সরকার এই বক্তব্যকে একান্তই ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অংশ হিসেবে দেখলেও দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী বিষয়টিকে দেখছে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে দিল্লির এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক খেলা হিসেবে।
সম্প্রতি সমাপ্ত হওয়া পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির কাছে তৃণমূল কংগ্রেসের আকস্মিক পরাজয়ের প্রায় এক মাস পর কলকাতার ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেল এলাকায় এক প্রতিবাদী অবস্থানে দাঁড়িয়ে এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত তাঁর বক্তব্যের ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি দাবি করছেন যে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামিদের পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ) যখন গ্রেপ্তার করে, তখন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্বয়ং তাঁকে ফোন করে বিষয়টি গোপন রাখার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলেন:
“বাংলাদেশ থেকে একটা বড় মাপের খুনি মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছিল। বাংলায় আসার পর আমাদের এসটিএফ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তাদের গ্রেপ্তার করে। কিন্তু এরপর ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে সরাসরি ফোন করে অনুরোধ করেন, এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি যেন বাইরে না যায় বা প্রকাশ করা না হয়; কারণ এটি নাকি দেশের অভ্যন্তরীণ ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ব্যাপার। কাকে দিয়ে এই খুন করানো হয়েছিল এবং এর পেছনে কারা জড়িত ছিল, তার সব তথ্যই আমার জানা আছে। বাংলাদেশে বর্তমান সরকার পরিবর্তন হলেও আমি সব সত্যই জানি।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে তিনি এই মুহূর্তে সেই প্রভাবশালীদের নাম সর্বসমক্ষে প্রকাশ করতে চান না, কারণ সেই নাম প্রকাশ পেলে বাংলাদেশ ও সামগ্রিক আঞ্চলিক পরিস্থিতি চরম উত্তাল হয়ে উঠতে পারে।
চলতি বছরের মার্চ মাসে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এসটিএফ হাদি হত্যা মামলার প্রধান দুই আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল এবং আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে নদীয়ার শান্তিপুর এলাকা থেকে ফিলিপ সাংমা নামের আরেক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়, যার বিরুদ্ধে প্রধান আসামিদের সীমান্ত পার করে ভারতে পালিয়ে যেতে সরাসরি লজিস্টিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন মন্তব্যের পর সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধান ও পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আলী আকবর খান জানিয়েছেন, তদন্ত কর্মকর্তা সব পক্ষের বক্তব্য, সম্ভাব্য তথ্য এবং প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করছেন। ইউনিট প্রধান হিসেবে তিনি সমস্ত তথ্য আমলে নিয়ে তদন্তের পরিধি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। ভারত থেকে আসামিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তিনি জানান, আইনি প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত নথিপত্র ইতোমধ্যে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং তারা দিল্লির ইতিবাচক কূটনৈতিক সহযোগিতার প্রত্যাশা করছেন।
উল্লেখ্য, বিগত ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শরিফ ওসমান হাদি ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নামে একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলে ব্যাপক আলোচনায় আসেন। গত ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে তিনি সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১২ই ডিসেম্বর পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে রিকশায় থাকা অবস্থায় মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তরা হাদিকে লক্ষ্য করে অতর্কিত গুলি চালায়। মাথায় গুরুতর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ১৮ই ডিসেম্বর রাতে তিনি মারা যান। ডিবি পুলিশ গত ৬ই জানুয়ারি ১৭ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিলেও মামলার বাদী আবদুল্লাহ আল জাবেরের নারাজি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ১৫ই জানুয়ারি মামলাটি সিআইডিকে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বক্তব্য সামনে আসার পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্পষ্ট বিভক্তি দেখা গেছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন বা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এটিকে সম্পূর্ণভাবে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাদা-ছোড়াছুড়ি হিসেবে দেখছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, পাশের দেশে একটি বড় নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর পরাজয়ের গ্লানি থেকে তিনি (মমতা) তাঁর দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশ্যে কিছু রাজনৈতিক মন্তব্য করেছেন, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আলোচনার বিষয় নয়। তবে হাদির হত্যাকারীদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করার বিষয়ে সরকার সর্বোচ্চ কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে।
অন্যদিকে, জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকা জামায়াতে ইসলামী বিষয়টিকে ভারতের আধিপত্যবাদী চিন্তার প্রতিফলন হিসেবে দেখছে। দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গণমাধ্যমকে বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুনির্দিষ্ট কারও নাম উল্লেখ না করলেও তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভারতের গোয়েন্দা ও রাজনৈতিক মহল গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। বাংলাদেশের সরকার গঠন বা পরিবর্তনের রাজনীতিতে ভারত যে সুদূরপ্রসারী খেলা খেলে থাকে, এটি তারই একটি নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। এদিকে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব ও মামলার বাদী আবদুল্লাহ আল জাবের এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন, মমতার বক্তব্য প্রমাণ করে যে এই হত্যাকাণ্ডে ভারত এবং দেশটির রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। এই হত্যাকাণ্ডের দেশীয় খুনিদের চিহ্নিত করা এবং দ্রুত বিচারের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চ গত শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বড় ধরনের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক এই উত্তেজনার মধ্যেই সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পারিবারিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের কথা প্রকাশ করেছেন নিহত ওসমান হাদির বোন মাসুমা হাদি। গতকাল নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন যে, তাঁর ভাইয়ের মৃত্যুর পর থেকে তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে। ভাইয়ের সম্মানের কথা চিন্তা করে এত দিন নীরব থাকলেও, দুই দিন ধরে মামলার বাদী হওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলা সমালোচনার কারণে তিনি মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন।
মাসুমা হাদি সেই অভিশপ্ত দিনের স্মৃতিচারণা করে লিখেছেন, তাঁর ভাই গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পাওয়ার সাথে সাথেই তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে সরাসরি এভারকেয়ার হাসপাতালে যান এবং মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ভাইয়ের পাশেই ছিলেন। অথচ পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে সার্বক্ষণিকভাবে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও, প্রশাসনের কিছু লোক সেখানে এসে তড়িঘড়ি করে পরিবারের কাউকে না জানিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবেরের কাছ থেকে মামলার কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে নেন এবং তাকেই মামলার একক বাদী করা হয়। পরিবারের সম্মতি ছাড়া কেন একজন বহিরাগতকে এই স্পর্শকাতর মামলার প্রধান বাদী করা হলো—তা নিয়ে তিনি তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন তুলেছেন, যা এই পুরো হত্যাকাণ্ড ও তার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়াকে আরও বেশি রহস্যময় করে তুলেছে।
তথ্যসূত্র: আজকের কাগজ