• শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০৬:৪৮ অপরাহ্ন
Headline
দাগনভূঞায় মোটরসাইকেলে যুবকের রহস্যজনক লাশ: হত্যাকাণ্ডের জোরালো সন্দেহ বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তে নোম্যান্স ল্যান্ডে নেই সেই ২৮ জন টিভির পর ফোনেই সরাসরি দেখা যাবে ফুটবল বিশ্বকাপ সন্দেহ হলেই তল্লাশি ও গ্রেপ্তার ক্ষমতা পাচ্ছে গোয়েন্দারা ঈদের ছুটিতে চাকরি হারালেন ১,৮৬৮ পোশাক শ্রমিক, পাওনার দাবিতে বিক্ষোভ আমলাদের বিদেশ ভ্রমণ বিলাস বন্ধে কঠোর বার্তা সরকারপ্রধানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদের কাজ ও গুরুত্ব মোদিবিরোধী আন্দোলনের ডাক দিয়ে ভারতে ফিরলেন অভিজিত দিপকে কাগজেই আটকে আছে হার্টের রিংয়ের দাম কমানোর ঘোষণা বিদ্যুৎ খাতে অলস সক্ষমতার বিপুল বোঝা জনগণের ঘাড়ে

বিদ্যুৎ খাতে অলস সক্ষমতার বিপুল বোঝা জনগণের ঘাড়ে

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বিতর্কিত, আলোচিত ও সমালোচিত অধ্যায় হলো ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা অলস উৎপাদন সক্ষমতার মাশুল। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন হোক বা না হোক, চুক্তি অনুযায়ী কেন্দ্র মালিকদের এই নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য থাকে রাষ্ট্র। দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি विशेषज्ञोंর মতে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি তথা সামগ্রিক অর্থনীতির বর্তমান যে গভীর আর্থিক সংকট, তার সর্বনাশা বীজ লুকিয়ে আছে বিদ্যুতের এই অস্বাভাবিক ও অন্যায্য ক্যাপাসিটি পেমেন্টের মধ্যে। ২০১১-১২ অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বিগত দেড় দশকে কেবল এই ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে ব্যয় হয়ে গেছে প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই ব্যয়ের বোঝা কমার তো কোনো লক্ষণই নেই, বরং তা প্রতি বছর রেকর্ড হারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, যার চূড়ান্ত আর্থিক ভার বহন করতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে।

অবিন্যস্ত ব্যয়ের খতিয়ান ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) টেকনিক্যাল ইভ্যালুয়েশন কমিটির (টিইসি) তথ্য পর্যালোচনা করলে বিদ্যুৎ খাতের এই কাঠামোগত ধসের ভয়াবহ চিত্রটি স্পষ্ট হয়। ২০১১-১২ অর্থবছরে যেখানে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে বার্ষিক ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা, তার পরের বছরই তা বেড়ে হয় ৬ হাজার ২৭ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৫ হাজার ৭৭৪ কোটি, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৫ হাজার ৳৪৭৪ কোটি, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে hobby ৬ হাজার ৪৬১ কোটি এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা ৭ হাজার ৪৮০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে এই লুণ্ঠনের গ্রাফ আরও খাড়া হতে শুরু করে; ওই বছর ব্যয় দাঁড়ায় ৯ হাজার ২৪০ কোটি টাকা, যা পরের অর্থবছরে এক লাফে ১২ হাজার ৪১০ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৫ হাজার ১১৪ কোটি, ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৭ হাজার ২৩৮ কোটি এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৫ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়।

তবে আসল বিপর্যয়টি শুরু হয় ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে, যখন এই ব্যয় এক ধাক্কায় ২৪ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকায় পৌঁছায়। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৩৬ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা হয়। বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই খাতের পেমেন্ট পৌঁছেছে এক অবিশ্বাস্য উচ্চতায়—৪৫ হাজার ৪৫১ কোটি টাকায়, যা মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই ক্যাপাসিটি চার্জের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৪৮ হাজার ২৬০ কোটি টাকা এবং আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা ৫২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা স্পর্শ করবে। এই ক্রমবর্ধমান ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যয়ের চাপ সামলাতে সরকার এরই মধ্যে পাইকারি ও খুচরা উভয় পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বারবার বৃদ্ধি করেছে। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ স্পষ্ট জানিয়েছেন, দেশের বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার পেছনে অন্যতম মূল কারণ হলো এই ক্যাপাসিটি চার্জ।

চাহিদার চেয়ে ৫৪ শতাংশ বেশি সক্ষমতার ফাঁদ

খাতসংশ্লিষ্ট ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদার চেয়ে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫৪ শতাংশ বেশি, যা যেকোনো দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত আত্মঘাতী। বর্তমানে গ্রিডে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। অথচ দেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ একদিনে বিদ্যুৎ উৎপাদন রেকর্ড করা হয়েছে মাত্র ১৭ হাজার ۲۰۰ মেগাওয়াট। স্বাভাবিক দিনগুলোতে গড় উৎপাদন থাকে মাত্র ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট। সর্বোচ্চ উৎপাদনকে ভিত্তি ধরলেও প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা প্রতিদিন অলস বসে থাকে। আর গড় উৎপাদনের হিসাব ধরলে বলা যায়, দেশের প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎকেন্দ্রই কোনো কাজ না করে বসিয়ে বসিয়ে রাষ্ট্রের টাকা গিলছে।

আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো দেশের বিদ্যুৎ খাতের রক্ষণাবেক্ষণ ও জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য চাহিদার চেয়ে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা রাখা ভালো, যাকে ‘রিজার্ভ মার্জিন’ বলা হয়। সেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করলে বাংলাদেশে ১৯ থেকে ২০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাই যথেষ্ট ছিল। পিডিবির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মিজানুর রহমান এই বিষয়ে বলেন:

“রিজার্ভ মার্জিন ২০ শতাংশের আশেপাশে থাকা খাতের জন্য স্বাস্থ্যকর। এর চেয়ে কম হলে দেশে তীব্র লোডশেডিং দেখা দেয়, আর এর চেয়ে বেশি হলে অলস সক্ষমতার কারণে ক্যাপাসিটি চার্জের বিশাল আর্থিক বোঝা চেপে বসে।”

দায়মুক্তির আইন ও রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের লুণ্ঠন

বিদ্যুৎ খাতের এই সামগ্রিক সংকটের পেছনে রয়েছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বিশেষ আইন ও চুক্তিভিত্তিক নীতিহীনতা। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপে কোনো ধরনের উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই, বিশেষ দায়মুক্তির আইনের সুযোগ নিয়ে পছন্দের নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানিকে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ দেওয়া হয়েছিল। এমনকি প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও বারবার এই কেন্দ্রগুলোর চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিনা দরপত্রে বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমতি দিয়ে প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের বড় ধরনের কমিশন বাণিজ্য ও আর্থিক নয়ছয় করা হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কীভাবে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী ফুলেফেঁপে উঠেছেন, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের ‘এগ্রিকো ইন্টারন্যাশনাল’। তাদের ঘোড়াশাল ১৪৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি ২০১০ সালে মাত্র ৫৬০ কোটি টাকা বিনিয়োগে চালু করা হয়। তিন বছর মেয়াদি এই কেন্দ্রটির চুক্তি রাজনৈতিক তদবিরে কয়েক দফা বাড়িয়ে ২০১৮ সাল পর্যন্ত চালানো হয়। এই আট বছরে কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই কেবল ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ হাতিয়ে নিয়েছে ২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা, যা তাদের মূল বিনিয়োগের প্রায় সাড়ে চার গুণ! শ্বেতপত্র কমিটির মতে, তৎকালীন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঘনিষ্ঠ আমলাদের সাথে ব্যবসায়ীদের অনৈতিক আঁতাতের কারণেই সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থ বলি দিয়ে এই অসম চুক্তিগুলো করা সম্ভব হয়েছিল। রাজনৈতিক উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ ছাড়া এ ধরনের হরিলুট কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।

সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার না করার অशुभ চুক্তি

পিডিবির অভ্যন্তরীণ নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, গত ১৫ বছরে বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যত বেড়েছে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ক্যাপাসিটি চার্জের পরিমাণ। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে বেশির ভাগ বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র তাদের মোট সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার করেনি। কিছু কিছু কেন্দ্র বছরে তাদের মোট সক্ষমতার মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে, অথচ মাস শেষে শতভাগ ক্যাপাসিটি চার্জ পকেটস্থ করেছে। চুক্তির সময় অবাস্তবভাবে ধরে নেওয়া হয়েছিল যে কেন্দ্রগুলোর ন্যূনতম ৮০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহৃত হবে, আর সেই শর্তেই এই আকাশচুম্বী পেমেন্ট নির্ধারণ করা হয়েছিল।

বিগত সরকারের আমলে করা এই দায়মুক্তির আইনের অধীন সব অসম চুক্তি পর্যালোচনার জন্য গঠিত বিশেষ কমিটির প্রধান, বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের কমিটি তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ এই ক্যাপাসিটি চার্জ। সাধারণত ১২ বছরের মধ্যে যেকোনো প্রকল্পের ঋণের টাকা পুরোপুরি শোধ হয়ে যায়, কিন্তু এই বিতর্কিত চুক্তিগুলোর কারণে ১৩ থেকে ২২ বছর পর্যন্ত অত্যন্ত উচ্চ হারে ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়ে যেতে হচ্ছে। বর্তমান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, এই দীর্ঘমেয়াদি ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারের ওপর এখন এক বিশাল ও অসহনীয় আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। দেশের অর্থনীতিবিদদের মতে, ভোক্তারা এখন ব্যবহৃত বিদ্যুতের আসল দাম দিচ্ছেন না, বরং সরকারের ভুল নীতি ও দুর্নীতির কারণে অলস বসে থাকা অচল সক্ষমতার দায়ভার নিজেদের ঘাড়ে বহন করছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category