• শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৪ অপরাহ্ন
Headline
পদত্যাগ করেছেন রাষ্ট্রপতি, দায়িত্ব পালন করবেন স্পিকার রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর স্পিকারের জন্য বিশেষ প্রটোকল গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণ ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে কাজ করছে সরকার: মির্জা ফখরুল লন্ডনের হোটেলে অতিরিক্ত মদ্যপানে সৌদি রাজপুত্রের মৃত্যু ২৪ ঘণ্টার কম সময়ে ট্রাম্প যেভাবে উল্টে দিলেন সৌদি পরমাণু চুক্তি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো নয়, অপরাধ বেড়েছে: জামায়াত আমির ৫ আগস্ট জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী দেশে অস্ত্রোপচারে শিশু জন্ম আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধির তথ্য তীব্র গ্যাস সংকটে বন্ধের মুখে দেশের শত শত কারখানা ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণে ৪২ শতাংশ খেলাপি

দেশে অস্ত্রোপচারে শিশু জন্ম আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধির তথ্য

Reporter Name / ০ Time View
Update : শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশে সন্তান জন্মের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার বা সিজারিয়ান প্রসবের অনিয়ন্ত্রিত প্রবণতা অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের বর্তমান জনস্বাস্থ্য খাতের জন্য এক মারাত্মক সতর্কসংকেত হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শিশু জরুরি তহবিল (ইউনিসেফ)-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর প্রকাশিত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই আশঙ্কাজনক তথ্য উঠে এসেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতি দুজন জন্ম নেওয়া শিশুর মধ্যে একজনেরই জন্ম হচ্ছে সিজারের মাধ্যমে। ২০১৯ সালে যেখানে অস্ত্রোপচারে প্রসবের হার ছিল মোট প্রসবে ৩৬ শতাংশ, সেখানে মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালে এই হার একলাফে বেড়ে ৫১ দশমিক ০৮ শতাংশে গিয়ে পৌঁছেছে। অর্থাৎ বিগত ৫ বছরে সিজারের হার বৃদ্ধি পেয়েছে পুরো ১৫ শতাংশ, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্বাভাবিক নির্দেশিকার তুলনায় অত্যন্ত উচ্চ ও আশঙ্কাজনক।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা বলছেন যে, প্রাতিষ্ঠানিক মাতৃস্বাস্থ্যসেবা বা হাসপাতালে প্রসবের হার বৃদ্ধি পাওয়া নিঃসন্দেহে দেশের একটি বড় অর্জন। তবে চিকিৎসাগত কোনো সুনির্দিষ্ট শারীরিক জটিলতা না থাকা সত্ত্বেও কেবল বাণিজ্যিক স্বার্থ বা সচেতনতার অভাবে অনাবশ্যক সিজারিয়ান অপারেশনের দিকে ঝুঁকছেন প্রসূতি ও চিকিৎসকরা। এটি যদি কঠোর প্রশাসনিক নজরদারির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে না আনা হয়, তবে ভবিষ্যতের জাতীয় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বিরাট বোঝা ও ঝুঁকি তৈরি করবে। অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের ফলে প্রসূতি মায়ের শরীরে মারাত্মক সংক্রমণ, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং পরবর্তী গর্ভধারণে স্থায়ী জটিলতা দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি, অস্ত্রোপচারে জন্ম নেওয়া নবজাতকদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাসের আশঙ্কা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি এই ব্যবস্থার উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে সাধারণ পরিবারগুলোর ওপর অতিরিক্ত অনাকাঙ্ক্ষিত আর্থিক মানসিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

সারা দেশের ৬৪টি জেলা ও তিনটি প্রধান সিটি করপোরেশনের মোট ৬১ হাজার ২০৭টি খানা বা পরিবারের বিস্তৃত তথ্য বিশ্লেষণ করে এই দীর্ঘমেয়াদী জরিপটি সম্পন্ন করা হয়েছে। বিবিএসের তথ্য সংগ্রহে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী ৬৪ হাজার ৪০৫ জন নারী এবং প্রায় ৬০ হাজার শিশুর সার্বিক স্বাস্থ্য ও জীবনের মান পরীক্ষা করা হয়েছে। জরিপে ১৭৩টি ভিন্ন সূচকের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৭টি সরাসরি বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৯ সালে যেখানে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে প্রসবের হার ছিল ৫৩.৪ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ৭১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে প্রশিক্ষিত বা দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় প্রসব করানোর হার ৫৯ শতাংশ থেকে একলাফে ৭৭.৭ শতাংশে পৌঁছানো একটি বড় ইতিবাচক সাফল্য। কিন্তু এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব বৃদ্ধির সুবিধার সাথেই অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে হাসপাতালের সিজারিয়ান প্রবণতা।

এমআইসিএস ২০২৫-এর জাতীয় জরিপে প্রসূতি স্বাস্থ্যের এই একটি মাত্র বিতর্কিত বিষয় ছাড়া শিশু ও মাতৃ স্বাস্থ্যের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোতে বেশ কিছু সন্তোষজনক ও আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। ২০১৯ সালের তুলনায় দেশে নবজাতক ও শিশুমৃত্যুর হার দৃশ্যমানভাবে হ্রাস পেয়েছে। পাঁচ বছর পূর্বে প্রতি হাজারে জীবিত জন্মানো নবজাতকের মৃত্যুর হার ছিল ২৬ জন, যা কমে বর্তমানে ২২ জনে এসে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৪০ জন থেকে কমে ৩৩ জনে নেমে এসেছে। পুষ্টির দিক থেকেও কিছুটা অগ্রগতি সাধিত হয়েছে; শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়া বা খর্বকায় শিশুর হার পূর্বের ২৮ শতাংশ থেকে কমে এখন ২৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়া সুপেয় পানির অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ এখন নিরাপদ উৎস ব্যবহার করছেন এবং খানা বা গৃহস্থালি পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধা আগের ৩৭.৬ শতাংশ থেকে অভাবনীয়ভাবে বেড়ে ৭২.১ শতাংশে রূপ নিয়েছে।

তবে ইতিবাচক অর্জনের পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক পুষ্টি, শিশু সুরক্ষা ও সামাজিক সূচকে এখনও কিছু গভীর বৈষম্য ও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। জন্মগ্রহণের পর প্রথম ছয় মাস শিশুদের শুধু মায়ের দুধ পান করানোর বা একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ দানের হার ৬২.৬ শতাংশ থেকে আশঙ্কাজনকভাবে কমে ৫৬.৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা শিশুর পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক নেতিবাচক। অন্যদিকে তীব্র পুষ্টিহীনতার শিকার বা কৃশতায় ভোগা শিশুর হার ৯.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২.৯ শতাংশে পৌঁছেছে। সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের হার ৫১.৪ শতাংশ থেকে কিছুটা কমে ৪৭.২ শতাংশ হলেও তা এখনও অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে অবস্থান করছে। পাশাপাশি শিশুদের ওপর শারীরিক ও মানসিক সহিংসতার হার ৮৫.৭ শতাংশে উন্নীত হওয়া এবং শিক্ষার গুণগত মান ধরে রাখা নতুন চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে যে, ২০৩০ সালের নির্ধারিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্য খাতের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা ‘ক্লিনিক্যাল অডিট’ অবিলম্বেই কার্যকর করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিটি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ঠিক কী চিকিৎসাগত কারণে সিজার করা হলো, তার সুনির্দিষ্ট বিবরণী বা অডিট যাচাই বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান বন্ধে দক্ষ বা পেশাদার মিডওয়াইফ বা ধাত্রীদের ভূমিকা বৃদ্ধি করে স্বাভাবিক প্রসব বা নরমাল ডেলিভারিতে মায়েদের উৎসাহিত করতে হবে। প্রসূতি স্বাস্থ্য, পুষ্টির ভারসাম্য রক্ষা এবং শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশ সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন থেকে পিছিয়ে পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা কঠোর সতর্কবার্তা ব্যক্ত করেছেন।

তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category