• শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫০ অপরাহ্ন
Headline
৫ আগস্ট জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী দেশে অস্ত্রোপচারে শিশু জন্ম আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধির তথ্য তীব্র গ্যাস সংকটে বন্ধের মুখে দেশের শত শত কারখানা ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণে ৪২ শতাংশ খেলাপি শিল্পকলায় রুনা লায়লার একক সঙ্গীতানুষ্ঠান বেআইনি রাজসাক্ষী বানানোর তদন্তে চার মাসেও মেলেনি রিপোর্ট যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতিতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে চাইলে সংবিধানে সুযোগ আছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী মেডিকেল শিক্ষার্থীদের দেশসেবায় আত্মনিয়োগের আহ্বান ডা. জুবাইদা রহমানের

বেআইনি রাজসাক্ষী বানানোর তদন্তে চার মাসেও মেলেনি রিপোর্ট

Reporter Name / ০ Time View
Update : শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬
Bribery

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) এক প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে আসামিকে ঘুষের বিনিময়ে রাজসাক্ষী বানানোর গুরুতর অভিযোগ তদন্তে গঠিত সত্যঅনুসন্ধান কমিটির কার্যক্রম চার মাস ধরে স্থবির হয়ে রয়েছে। দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও তদন্ত কমিটি এখনো তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি, যার ফলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে তীব্র প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। ঘুষের গুরুতর অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও অভিযুক্ত প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হোসেন তামিম প্রতিনিয়ত প্রসিকিউশন টিমের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। অভিযোগ অনুসন্ধানে তদন্ত বিলম্বিত হওয়া এবং কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় প্রসিকিউশন টিমের অভ্যন্তরীণ সদস্যদের মধ্যেই চরম অসন্তোষ ছড়াচ্ছে। এমনকি প্রধান প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম তদন্ত শেষ করে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আশ্বাস দিলেও, অন্য একাধিক প্রসিকিউটরের দাবি—অভিযুক্তকে বাঁচানোর জন্য ইচ্ছে করেই তদন্ত রিপোর্ট ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে।

ঘুষের এই অভিযোগটি প্রথম প্রকাশ্যে আসে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি, যখন তৎকালীন ট্রাইব্যুনালের অন্যতম প্রসিকিউটর বিএম সুলতান মাহমুদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক সুনির্দিষ্ট পোস্ট দেন। সেই পোস্টে অভিযোগ করা হয়, ঢাকার আশুলিয়ায় সাতজনকে নির্মমভাবে হত্যা এবং পাঁচটি লাশ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার আলোচিত মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার আসামি সাবেক পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর শেখ আবজালুল হকের স্ত্রী এক সন্ধ্যায় এক ভারী ব্যাগ হাতে নিয়ে প্রসিকিউটর তামিমের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামকে পুরো বিষয়টি লিখিত ও মৌখিকভাবে জানানো হলেও তিনি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। পরবর্তীতে তামিম তার সহকর্মীদের সামনে অবজালের স্ত্রীর নিজের রুমে আসার কথা স্বীকার করেছিলেন। অদ্ভূতভাবে এই ঘটনার পর আসামি অবজালকে অপরাধে সরাসরি যুক্ত থাকা সত্ত্বেও বেআইনিভাবে রাজসাক্ষী বানানো হয় এবং ট্রাইব্যুনাল চূড়ান্ত রায়ে তাকে দায়মুক্তি প্রদান করে। সুলতান মাহমুদের অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন প্রধান কৌঁসুলি তাজুল ইসলামের সময়ে প্রসিকিউশন অফিসকে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার বানিয়ে বিপুল অংকের লেনদেনের মাধ্যমে আসামিদের বেকসুর খালাস দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

অবশ্য শুরু থেকেই নিজের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলে দাবি করে আসছেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হোসেন তামিম। একইভাবে সাবেক প্রধান কৌঁসুলি তাজুল ইসলামও এই অভিযোগ অস্বীকার করে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন যে, তার বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের বিন্দুমাত্র প্রমাণ কেউ পেশ করতে পারবে না। তাজুল ইসলামের ভাষ্য মতে, কোনো আসামিকে মাফ করা বা রাজসাক্ষী হিসেবে গ্রহণ করার এখতিয়ার শুধুই আদালতের, এতে প্রসিকিউশনের একচ্ছত্র কোনো ভূমিকা থাকে না। এর প্রেক্ষিতে ২৪ ফেব্রুয়ারি তাজুল ইসলামকে সরিয়ে মো. আমিনুল ইসলামকে নতুন চিফ প্রসিকিউটর নিয়োগ দেয় সরকার এবং ১০ মার্চ এই ঘটনার নিরপেক্ষ অনুসন্ধানে একটি পাঁচ সদস্যের সত্যঅনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু কমিটির প্রধান খোদ চিফ প্রসিকিউটর নিজেই হওয়ায় এবং চার মাসেও মূল সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ বা প্রযুক্তিগত প্রমাণ সংগ্রহ না করায় তদন্তের গতি ও উদ্দেশ্য নিয়ে খোদ প্রসিকিউটরদের ভেতরেই ঘোর সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ বা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংরক্ষণ করার অনুরোধ করা হলেও রহস্যজনকভাবে তা মুছে ফেলা হয়েছে বা গায়েব করা হয়েছে। যদিও প্রসিকিউটর তামিম ব্যাগে টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন, তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে আবজালের স্ত্রী তার কক্ষে এসেছিলেন এবং সেই সময়ে তার রুমের দরজায় বাইরে থেকে লক করা ছিল। কিন্তু তদন্ত কমিটি এখনো পর্যন্ত অবজালের স্ত্রীর মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করেনি বা তাকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনেনি। এমনকি এই সংক্রান্ত তথ্যের ফরেনসিক বিশ্লেষণের জন্য অভিযুক্ত তামিমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও বাজেয়াপ্ত করা হয়নি। ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা আশুলিয়ার ঘটনাস্থলে অবজালের উপস্থিতি, হামলা ও মোবাইল জিওলোকেশন ডেটা বিশ্লেষণ করে তার অপরাধের স্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছিলেন। লাল টি-শার্ট ও হেলমেট পরা অবজালকে ভিডিওতে সরাসরি গুলি চালাতে দেখা গেলেও তার মতো একজন কমান্ডিং পজিশনের পুলিশ অফিসারকে প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা কৌশলে আসামির তালিকা থেকে বাদ দিয়ে রাজসাক্ষী বানিয়ে দিয়েছে।

কেবল ব্যক্তিগত দুর্নীতি ও ঘুষের অভিযোগই নয়, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব চলাকালে ছাত্র-জনতার ওপর সরাসরি গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়া উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের মামলা থেকে বাদ দেওয়া ও রাজনৈতিক দায়মুক্তি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে প্রসিকিউশন টিমের বিরুদ্ধে। উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে রাজধানীর চানখারপুল ও রামপুরা এলাকার গণহত্যার চাঞ্চল্যকর ঘটনাগুলো। চানখারপুলে গত ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে যে পুলিশ টিমের তাণ্ডবে নিরপরাধ বহু আন্দোলনকারী শহীদ হয়েছিলেন, সেই টিমের নেতৃত্বে ছিলেন সাব-ইন্সপেক্টর মো. আশরাফুল ইসলাম। একটি বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেলের ক্যামেরায় তাকে সরাসরি হাঁটু গেড়ে, দাঁড়িয়ে ও শুয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ছোঁড়ার নির্দেশ দিতে দেখা যায়। তথাপি, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের হুকুমদাতাকে মূল আসামির তালিকায় না রেখে ৩৯ নম্বর প্রসিকিউশন সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয় এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করেই রায় ঘোষণা করা হয়।

একই ধরনের পক্ষপাতমূলক ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত দেখা গেছে রামপুরার গণহত্যার মামলাতেও। রামপুরায় ২৮ জন সাধারণ মানুষ ও ছাত্র হত্যার ঘটনায় পুলিশের তৎকালীন মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. হায়াতুল ইসলাম খানের সরাসরি জড়িত থাকার অডিও কল রেকর্ডিং উদ্ধার করেছিল ডিজিটাল টিম। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমানের সাথে ফোনে আলাপকালে হায়াতুল আন্দোলনকারীদের ঘিরে ধরে দুই দিক থেকে একযোগে গুলি করার পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা এনটিএমসি থেকে জেনুইন অডিও হিসেবে বাজেয়াপ্ত করা হয়। ওই ঘটনায় ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হলেও ডিসি হায়াতুল ইসলাম খানকে রহস্যজনকভাবে কোনো মামলার আসামির তালিকাতেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অথচ একই মামলায় তৎকালীন দায়িত্বে থাকা দুই সেনা অফিসারকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তৎকালীন এক শীর্ষ আমলা ও প্রসিকিউটরের বিশেষ হস্তক্ষেপে এই উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের রক্ষা করা হয়েছে বলে প্রসিকিউশনের ভেতরের সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৪, ৩৫ ও ৩৬ ধারা অনুযায়ী, একই অপরাধমূলক উদ্দেশ্যে কোনো বাহিনী বা দলের প্রধান হয়ে যারা আদেশ দেন বা বাস্তবায়নে সরাসরি অংশ নেন, তাদের প্রত্যেকের অপরাধগত দায় সমান। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইন বিশ্লেষকদের স্পষ্ট মত অনুযায়ী, কোনো মূল অপরাধীকে সরাসরি রাজসাক্ষী বানানো সম্পূর্ণ বেআইনি; কোনো অভিযুক্তকে রাজসাক্ষী হিসেবে গ্রহণ করার পূর্বে তাকে অবশ্যই আনুষ্ঠানিকভাবে মামলার আসামি হতে হবে এবং আদালতের নিকট স্বীকারোক্তিমূলক আবেদন জানাতে হবে। অপরাধস্থলে দাঁড়িয়ে কমাণ্ডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিদের আইন বহির্ভূতভাবে বিচার থেকে রেহাই দিয়ে সাক্ষী বানানো নৈতিক, আইনি ও যৌক্তিক কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই গ্রহণযোগ্য নয়। তদন্ত কমিটির এমন চরম শ্লথগতি, গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ লোপাট করা এবং প্রভাবশালী অভিযুক্ত ও আসামিদের বেআইনি সুযোগ সুবিধা দেওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক সুনাম ও জনআস্থা এখন চরম সংকটের মুখে পড়েছে।

তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category