মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে অর্থনীতির চাকা যখন ধীর হয়ে আসছে, তখন এই চরম অস্থিরতা ও সংকটের মাঝেই রীতিমতো ফুলেফেঁপে উঠছে কিছু নির্দিষ্ট খাত। আল জাজিরার এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও বিনিয়োগ ব্যাংক, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বাজির প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য এই সংকট যেন আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইএমএফের সতর্কবার্তা ও অর্থনৈতিক শ্লথগতি
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ইতিমধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি কমে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। চলতি বছরের জন্য বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৩.৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩.১ শতাংশে নামিয়ে এনেছে সংস্থাটি। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে নিয়ে গেলে ২০২৬ সাল শেষে এই প্রবৃদ্ধির হার ২.৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে কঠোর সতর্কতা উচ্চারণ করেছে আইএমএফ।
ওয়াল স্ট্রিটের ব্যাংকগুলোর রমরমা ব্যবসা
গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। তবে এই অস্থিরতার বাজারকেই কাজে লাগিয়েছে বৃহৎ বিনিয়োগ ব্যাংকগুলো। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়:
মরগান স্ট্যানলি: মুনাফা করেছে ৫৫৭ কোটি ডলার (গত বছরের তুলনায় ২৯ শতাংশ বেশি)।
গোল্ডম্যান স্যাকস: মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৫৬৩ কোটি ডলারে (১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি)।
জেপি মরগ্যান চেইস: প্রথম প্রান্তিকে আয় করেছে ১ হাজার ৬৪৯ কোটি ডলার, যা গত বছরের চেয়ে ১৩ শতাংশ বেশি।
তবে বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধের এই অস্থিরতা খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিনিয়োগকারীরা ঋণ নিয়ে লেনদেনে নিরুৎসাহিত হতে পারেন, যার ফলে ব্যাংকিং খাতের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবৃদ্ধি থমকে যেতে পারে।
যুদ্ধ নিয়ে বাজি: প্রেডিকশন প্ল্যাটফর্মের বিপুল আয়
ওয়াল স্ট্রিটের পাশাপাশি অবিশ্বাস্য আয় করছে ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক বিভিন্ন প্রেডিকশন বা বাজির প্ল্যাটফর্ম। এর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ‘পলিমার্কেট’। চলতি মাসের শুরু থেকেই প্রতিদিন অন্তত ১০ লাখ ডলারের বেশি আয় করছে প্রতিষ্ঠানটি। সাধারণত খেলাধুলা বা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বাজি ধরার সুযোগ থাকলেও, পলিমার্কেট এখন ইরান যুদ্ধের মতো স্পর্শকাতর সংঘাতের ফলাফল নিয়েও বাজির সুযোগ দিচ্ছে। গত ৩০ মার্চ প্ল্যাটফর্মটি তাদের ফি কাঠামো পরিবর্তন করায় আয়ের পরিমাণ আরও বেড়েছে। কালশি, নোভিগ ও রবিনহুডের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোকে পেছনে ফেলে ২০২৬ সালে পলিমার্কেটই সবচেয়ে বেশি মুনাফা করছে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি বছর শুধু ফি থেকেই তাদের আয় ৩৪ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা খাতের পোয়াবারো
ইউক্রেন, গাজা, লেবানন, সুদান এবং সর্বশেষ ইরান যুদ্ধ—বিশ্বজুড়ে সংঘাতের বিস্তৃতির কারণে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও অ্যারোস্পেস খাতের ব্যবসা রকেটের গতিতে ছুটছে। আইএমএফের এপ্রিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বিশ্বের অর্ধেক দেশ তাদের সামরিক বাজেট বাড়িয়েছে, যার ফলে ড্রোন থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্রের চাহিদা তুঙ্গে। ইউরোপীয় দেশগুলোতে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে তাদের জিডিপির ৫ শতাংশ সামরিক খাতে ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্টক মার্কেটে; মার্চের শেষে ‘এমএসসিআই ওয়ার্ল্ড অ্যারোস্পেস অ্যান্ড ডিফেন্স ইনডেক্স’ অন্তত ৩২ শতাংশ রিটার্ন বা মুনাফা দেখিয়েছে।
অপ্রতিরোধ্য এআই এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্প
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বাজার ছিল ১৮ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের, যা ২০৩৩ সালের মধ্যে ২০ গুণ বৃদ্ধি পাবে। ইরান যুদ্ধ এই প্রযুক্তির জয়যাত্রায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) বিশ্লেষক নিক মারোর মতে, যুদ্ধের ধাক্কা সত্ত্বেও এআই খাত অত্যন্ত স্থিতিশীল। যার প্রমাণ মেলে পূর্ব এশিয়ার সেমিকন্ডাক্টর চিপ রপ্তানির পরিসংখ্যানে। শুধু মার্চ মাসেই তাইওয়ান রেকর্ড ৮০.২ বিলিয়ন ডলারের চিপ রপ্তানি করেছে (গত বছরের চেয়ে ৬১.৮% বেশি)। বিশ্বের শীর্ষ চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘টিএসএমসি’ ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকেই ১ হাজার ৮১০ কোটি ডলার আয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৮ শতাংশ বেশি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নতুন মোড়
কোভিড মহামারি এবং ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইরান যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তৃতীয় বড় ধাক্কা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই সংকট বিশ্বনেতাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, কেবল পরিবেশ রক্ষার জন্যই নয়, বরং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থেই জীবাশ্ম জ্বালানি বা তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো জরুরি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই যুদ্ধের পর নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে বিশ্বের অন্তত ১৫০টি দেশ নতুন নীতি গ্রহণ করেছে।