• মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০৬ অপরাহ্ন
Headline
অতিরিক্ত বাসভাড়া নিলে জরিমানা, বাতিল হবে রুট পারমিট: সড়ক পরিবহনমন্ত্রী সরকারি হাসপাতালের সামনে কোনো ক্লিনিকের অনুমোদন দেওয়া হবে না বিরোধী দলগুলো আত্মস্বীকৃত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে: রিজভী দূরপাল্লা ও মহানগরে বাসভাড়া বাড়ল নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের নতুন হাইকমিশনার পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম সীমিত সম্পদের ভারসাম্য রক্ষায় জ্বালানি খাতে ভর্তুকি সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত : তথ্য উপদেষ্টা বাস্তবসম্মত ও কর্মমুখী শিক্ষা প্রদানে বিশেষ জোর দেওয়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির বিমার টাকা হাতাতে নিজেদের বাসেই আগুন দিচ্ছে আওয়ামী লীগ চক্র চাকরির চূড়া থেকে নামার প্রস্তুতি ফিফা সংস্কারের প্রস্তাব ইনফান্তিনোর

উচ্চশিক্ষার আড়ালে নীরব মেধাপাচার: বিদেশ গিয়ে আর ফেরেন না শিক্ষকরা

Reporter Name / ৩ Time View
Update : সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হওয়ার পর উচ্চতর ডিগ্রির উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি জমানো এবং পরবর্তীতে দেশে আর ফিরে না আসার প্রবণতা ক্রমশ একটি নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে। মেধা পাচারের এই উদ্বেগজনক চিত্রটি নতুন করে সামনে এনেছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) সাম্প্রতিক একটি ঘটনা। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম শীর্ষ এই বিদ্যাপীঠের ২৩ জন শিক্ষক শিক্ষা ছুটির নির্ধারিত মেয়াদ পার হওয়ার পরও নিজ কর্মস্থলে যোগদান করেননি। উচ্চতর গবেষণার সুযোগ নিয়ে তারা উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছেন, কিন্তু মেয়াদ শেষে দেশের প্রতি বা নিজ প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রমাণ তারা রাখেননি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যবিপ্রবির মোট ৪৫০ জন শিক্ষকের মধ্যে বর্তমানে ৯৪ জন শিক্ষক শিক্ষা ছুটিতে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। পিএইচডি বা পোস্টডক্টরাল গবেষণার মতো উচ্চতর বিদ্যায়তনিক কাজের উদ্দেশ্যে তারা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন উন্নত দেশে গেছেন। সামগ্রিকভাবে শিক্ষকদের বিদেশে গবেষণায় যুক্ত হওয়া যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত গৌরবের বিষয় হলেও, বিপত্তি বেধেছে এই ৯৪ জনের মধ্যে ২৩ জন শিক্ষককে নিয়ে। তাদের ছুটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেলেও তারা দেশে ফেরার কোনো তাগিদ অনুভব করেননি। শুধু তাই নয়, অনুপস্থিতির এই দীর্ঘ সময়ে তাদের পেছনে বেতন ও ভাতা বাবদ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অর্থাৎ রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে অতিরিক্ত ৩ কোটি ৫ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে, যা একটি উন্নয়নশীল দেশের প্রেক্ষাপটে সাধারণ জনগণের করের টাকার চরম অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
যে ২৩ জন শিক্ষক দেশে না ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়ে এক ধরনের নৈতিক স্খলনের পরিচয় দিয়েছেন, তাদের বিভাগভিত্তিক তালিকাটি বিশ্লেষণ করলে ক্ষতির মাত্রাটি আরও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায়। এই শিক্ষকরা মূলত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং প্রকৌশলের মতো অত্যন্ত যুগোপযোগী ও চাহিদাসম্পন্ন বিষয়গুলোর বিশেষজ্ঞ। জানা গেছে, মেয়াদোত্তীর্ণ ছুটিতে থাকা এই শিক্ষকদের মধ্যে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) এবং মাইক্রোবায়োলজি (এমবি) বিভাগের সর্বোচ্চ চারজন করে শিক্ষক রয়েছেন। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগে এই দুটি বিভাগের গুরুত্ব অপরিসীম। এছাড়া পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের মতো মৌলিক বিজ্ঞানের তিনজন শিক্ষক কর্মস্থলে ফেরেননি। পাশাপাশি ফার্মেসি এবং পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (ইএসটি) বিভাগের দুজন করে শিক্ষক রয়েছেন এই তালিকায়। এর বাইরে শিল্প ও উৎপাদন প্রকৌশল (আইপিই), রাসায়নিক প্রকৌশল (সিএইচই), উৎপাদন ও যন্ত্র প্রকৌশল (পিএমই), তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল (ইইই), বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং (বিএমই), জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি (জিইবিটি), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সিস্টেম (এআইএস) এবং এনএফটি বিভাগের মতো আধুনিক ও বিশেষায়িত প্রতিটি বিভাগ থেকে একজন করে শিক্ষক ছুটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করা থেকে বিরত রয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো অগ্রসরমান বিষয়ে এমনিতেই দেশে দক্ষ বিশেষজ্ঞের অভাব রয়েছে, সেখানে এই শিক্ষকদের না ফেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাঠামোর জন্য এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে।
শিক্ষকদের এই দীর্ঘমেয়াদি অনুপস্থিতি এবং দেশে না ফেরার মানসিকতা সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে জানিয়েছেন যে, শিক্ষকদের একটি বড় অংশ বছরের পর বছর বিদেশে অবস্থান করায় তাদের স্বাভাবিক পাঠদান প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সিলেবাস যথাসময়ে শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না, যার ফলে শিক্ষার্থীদের সেশনজটের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। গবেষণায় দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক জ্ঞানের ভিত্তিও অনেকাংশে দুর্বল হয়ে পড়ছে। যদিও যবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে যাওয়া শিক্ষকদের শূন্যস্থানের বিপরীতে একজন করে বিকল্প বা খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাতে পাঠদান প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের সমস্যা বা অচলাবস্থা তৈরি না হয়। কিন্তু বিকল্প শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও একজন পিএইচডি বা পোস্টডক্টরাল পর্যায়ের অভিজ্ঞ গবেষকের শূন্যস্থান যে একজন তরুণ বা নবীন বিকল্প শিক্ষক দিয়ে পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়, সেটি বিদ্যায়তনিক মহলের সবাই খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পারেন।
শিক্ষকদের এই দলে দলে বিদেশে থেকে যাওয়ার পেছনের কারণগুলোও অত্যন্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক এই প্রবণতার পেছনের রূঢ় বাস্তবতাগুলো তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, দেশের বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার চরম সংকট রয়েছে। পর্যাপ্ত গবেষণাগার, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং গবেষণা তহবিলের অভাবে একজন মেধাবী গবেষক দেশে তার কাঙ্ক্ষিত কাজগুলো স্বাধীনভাবে করতে পারেন না। অন্যদিকে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অত্যন্ত স্বচ্ছতা, মেধার মূল্যায়ন এবং জবাবদিহির মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। সেখানে গবেষণার জন্য রয়েছে অফুরন্ত সুযোগ ও অর্থায়ন। একবার সেই উন্নত গবেষণা পরিবেশ এবং বিশ্বমানের বিদ্যায়তনিক সংস্কৃতির স্বাদ পেলে অনেকেই আর দেশের সীমাবদ্ধ পরিবেশে ফিরে আসতে চান না। এর পাশাপাশি উন্নত জীবনের হাতছানি, পারিবারিক নিরাপত্তা এবং নিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রলোভনও না ফেরার পেছনে একটি বিশাল বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। মেধাবী এই শিক্ষকদের দাবি, জোর করে বা আইনি ভয় দেখিয়ে এই মেধা পাচার ঠেকানো সম্ভব নয়। মেধা পাচার ঠেকাতে হলে বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষকদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারকে একটি যুগোপযোগী ও আকর্ষণীয় নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে তাদের গবেষণার স্বাধীনতা ও উন্নত জীবনমানের নিশ্চয়তা থাকবে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং তদারকি সংস্থাগুলো শিক্ষকদের এই স্বেচ্ছাচারী আচরণকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দিতে রাজি নয়। যবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়েছেন যে, বিদেশে অবস্থানরত ৯৪ জন শিক্ষকের বেশিরভাগেরই ছুটির মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি, তাই তাদের বিষয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু যে ২৩ জন শিক্ষক ইতিমধ্যে তাদের ছুটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কর্মস্থলে ফেরেননি, তাদের এই আচরণকে চরম শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের দেশে ফেরার তাগিদ দিয়ে ইতিমধ্যে কয়েক দফা চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছে। উপাচার্য স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, তারা যদি এসব আইনি নোটিশের কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারেন বা অবিলম্বে কর্মস্থলে ফিরে না আসেন, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রিজেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রয়োজনে তাদের চাকরিচ্যুত করে সেই শূন্য পদগুলোতে নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক জীবন আর ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
শুধু চাকরিচ্যুত করেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ থেমে থাকতে চাইছে না। দেশে না ফেরা শিক্ষকদের পেছনে জনগণের যে বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা পাই পাই করে আদায় করার রূপরেখাও প্রস্তুত করা হয়েছে। উপাচার্য আরও জানিয়েছেন যে, দেশের উচ্চশিক্ষার দেখভালকারী প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনও (ইউজিসি) মেধা পাচারের এই অনৈতিক চর্চার বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কর্মস্থলে না ফেরা শিক্ষকদের কাছ থেকে পাওনা টাকা অর্থাৎ ৩ কোটি ৫ লাখ টাকার সমুদয় অংশ কড়ায়-গণ্ডায় আদায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ইউজিসিও সরাসরি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর সহায়তা নিয়ে হলেও রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ করা হবে। একজন শিক্ষক যখন রাষ্ট্রের টাকায় বিদেশে গিয়ে ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের স্বার্থে দেশের কথা ভুলে যান, তখন তার বিরুদ্ধে এমন কঠোর আইনি ব্যবস্থাই হয়তো ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তবে দিন শেষে শুধু আইনি ব্যবস্থা নয়, কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করে গবেষণাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমেই কেবল এই মেধা পাচারের মহোৎসব চিরতরে বন্ধ করা সম্ভব।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category