রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ—এই তিন জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাস সংকট। পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও কাঁচামাল থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র গ্যাস সংযোগের অভাবে এই অঞ্চলে নতুন কোনো বড় শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে না, এমনকি সম্ভাবনাময় বিসিক শিল্পনগরীগুলোও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। গতকাল রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সরকারের উচ্চপদস্থ উপদেষ্টাদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ী ও জনপ্রতিনিধিরা এই সংকট নিরসনে জোর দাবি জানান।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন সভায় জানান, রাজশাহীতে ‘বিসিক-২’ প্রকল্প পুরোপুরি প্রস্তুত থাকলেও গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় তা চালু করা যাচ্ছে না। ফলে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও এই অঞ্চলের শিল্পায়নের গতি থমকে আছে। দ্রুত গ্যাস নিশ্চিত করা গেলে এখানে বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব হতো, যা এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
নাটোর জেলা পরিষদের প্রশাসক রহিম নেওয়াজ একটি বিস্ময়কর তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, নাটোর শহরের কোল ঘেঁষেই গ্যাসের মূল পাইপলাইন চলে গেলেও খোদ নাটোর বিসিকে কোনো সংযোগ নেই। এই বৈষম্যের কারণে নাটোরে বড় কোনো শিল্পোদ্যোক্তা বিনিয়োগ করতে সাহস পাচ্ছেন না। নাটোর চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক মতিউর রহমান যোগ করেন, গ্যাস সরবরাহ পেলে নাটোরের চামড়া শিল্প আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়ে স্বনির্ভর হতে পারত।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ জানান, গ্যাস সংকটের কারণে জেলায় কোনো বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। সবচেয়ে বড় সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জেলায় পর্যাপ্ত হিমাগার নেই, যা গ্যাস সংযোগের মাধ্যমে পরিচালনা করা সাশ্রয়ী হতো। এর ফলে প্রতি বছর আম মৌসুমে বিপুল পরিমাণ আম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা এই অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য বিশাল এক ক্ষতি।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আশ্বস্ত করেন যে, সরকার সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, “রাজশাহী অঞ্চলের কৃষির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে পারলে এ অঞ্চল দ্রুত বদলে যাবে এবং সরকার সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে।” সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকা ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদও সুষম উন্নয়নের ওপর জোর দেন।
বিভাগীয় কমিশনার ড. আ ন ম বজলুর রশীদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, আরএমপি কমিশনারসহ তিন জেলার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপাররা উপস্থিত ছিলেন। ব্যবসায়ী নেতারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, উত্তরাঞ্চলকে অবহেলিত রেখে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়; তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সংযোগের ফাইলটি অনুমোদন করা এখন সময়ের দাবি।