বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই আলোচনায় থাকা জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি এবার তাদের অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। মাত্র দেড় বছর আগে একটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এবং অপ্রচলিত সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে দলটি তাদের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সাংগঠনিক কাজের বাস্তবতার নিরিখে সেই কাঠামোতে এবার বড় ধরনের রদবদল ঘটতে যাচ্ছে। দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম হিসেবে পরিচিত ‘সুপার ইলেভেন’ বা এগারো সদস্যের শীর্ষ নেতৃত্বকে ভেঙে আরও ছোট ও সুনির্দিষ্ট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন পরিকল্পনায় এই এগারো জনের বিশাল কাঠামোকে সংকুচিত করে মাত্র ছয় জনের একটি কোর কমিটিতে রূপান্তর করা হচ্ছে, যা রাজনৈতিক মহলে ‘সুপার সিক্স’ হিসেবে পরিচিতি পেতে যাচ্ছে। এই আমূল পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হলো দলের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় গতিশীলতা আনা এবং অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা দূর করা।
এনসিপি যখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তখন গতানুগতিক রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে গিয়ে একটি ব্যতিক্রমী সাংগঠনিক রূপরেখা দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বে মোট এগারোটি গুরুত্বপূর্ণ পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল। এই পদগুলোর মধ্যে ছিল আহ্বায়ক, সদস্য সচিব, মুখ্য সমন্বয়ক, দুজন মুখ্য সংগঠক, একজন মুখপাত্র, দুজন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক, দুজন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব এবং একজন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক। দলটির অভ্যন্তরে এবং বাইরের রাজনৈতিক মহলে এই বিশাল ও বহুমাত্রিক শীর্ষ নেতৃত্ব সুপার ইলেভেন নামেই ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিল। তাত্ত্বিকভাবে এই কাঠামোটি বেশ অন্তর্ভুক্তিমূলক মনে হলেও, বাস্তবে মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে এটি নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছিল। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক বেশি আনুষ্ঠানিকতা এবং একাধিক স্তরের অনুমোদনের প্রয়োজন হওয়ায় দলের কার্যক্রমে এক ধরনের ধীরগতি চলে আসছিল, যা কোনো উদীয়মান রাজনৈতিক দলের জন্য মোটেই ইতিবাচক নয়।
এই কাঠামোগত দুর্বলতা ও ধীরগতি অনুধাবন করতে পেরেই এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব এবার একটি বাস্তবমুখী ও প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন রূপরেখা অনুযায়ী, এগারো সদস্যের শীর্ষ পর্ষদকে নামিয়ে আনা হবে মাত্র ছয় জনে। এই পরিবর্তিত এবং অনেক বেশি সুসংহত সুপার সিক্স কাঠামোতে মূলত চারটি স্তরের পদ বহাল থাকবে। এগুলো হলো—একজন আহ্বায়ক, একজন সদস্য সচিব, দুজন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক এবং দুজন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব। মুখ্য সমন্বয়ক, মুখ্য সংগঠক বা মুখপাত্রের মতো পদগুলোকে শীর্ষ নেতৃত্বের মূল কোর কমিটি থেকে আলাদা করে ফেলা হচ্ছে। দলটির নীতিনির্ধারকদের বিশ্বাস, শীর্ষ নেতার সংখ্যা কমে গেলে যেকোনো জরুরি রাজনৈতিক ইস্যুতে খুব দ্রুত আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে। এর ফলে দলের ভেতরে যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দানা বাঁধছিল, তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা যাবে এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম অনেক বেশি গতিশীল ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।
প্রস্তাবিত এই নতুন কাঠামোতে কারা দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন, তা নিয়ে দলের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিশ্বস্ত দলীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, দলের প্রধান দুই শীর্ষ পদে কোনো পরিবর্তন আসছে না। অর্থাৎ, বর্তমান আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং সদস্য সচিব আক্তার হোসেন তাদের নিজ নিজ পদে বহাল থাকছেন। এই দুজনের নেতৃত্বেই মূলত নতুন কোর কমিটি পরিচালিত হবে। তাদের পাশাপাশি বাকি চারটি গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য যাদের নাম সবচেয়ে বেশি জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে, তারা হলেন নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী, হাসনাত আব্দুল্লাহ, সারজিস আলম এবং আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। এর মধ্যে নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী ও হাসনাত আব্দুল্লাহকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে এবং সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এই তরুণ ও উদ্যমী নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত শীর্ষ নেতৃত্ব দলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শীর্ষ নেতৃত্বের আকার সংকুচিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে দলের অন্যান্য নেতাদের কাজের পরিধি বা গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। বরং, নতুন এই বিন্যাসের ফলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং দায়িত্বের সুস্পষ্ট বণ্টন ঘটতে যাচ্ছে। সুপার ইলেভেনের যারা কোর কমিটিতে জায়গা পাচ্ছেন না, তাদের হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। রাজনৈতিক পর্ষদের অন্যান্য সদস্যদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সুনির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব বা পোর্টফোলিও নির্ধারণ করা হচ্ছে। তাদের কাউকে হয়তো সমমনা দলগুলোর সঙ্গে জোটের রাজনীতি সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হবে, কাউকে দলের সার্বিক সাংগঠনিক কাঠামো বিস্তারের কাজ দেওয়া হবে। আবার কেউ হয়তো দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা, দপ্তর ব্যবস্থাপনা, কিংবা পেশাজীবী ও ছাত্র সংগঠনগুলোর সাথে সমন্বয় সাধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো দেখভাল করবেন। দলের ঘোষিত রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলো মাঠপর্যায়ে সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য আলাদা নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি, দলের কাঠামোকে আরও পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে সম্পাদকীয় এবং সহসম্পাদকীয় পর্যায়ে নতুন বেশ কয়েকটি পদ সৃষ্টির বিষয়েও দলীয় ফোরামে গভীর আলোচনা চলছে।
এনসিপির এই তড়িঘড়ি করে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের পেছনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে সামনে আসতে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার নির্বাচন যেকোনো রাজনৈতিক দলের তৃণমূল পর্যায়ের জনসমর্থন এবং সাংগঠনিক শক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষাক্ষেত্র। এই নির্বাচনে সফল হতে হলে দলের কেন্দ্র থেকে শুরু করে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত দ্রুত ও কার্যকর যোগাযোগের কোনো বিকল্প নেই। প্রার্থী বাছাই, স্থানীয় কোন্দল নিরসন এবং নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণের জন্য কেন্দ্রকে প্রতিনিয়ত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এগারো জনের বিশাল কমিটির মাধ্যমে এ ধরনের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। তাই নির্বাচনের মাঠে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিতে এবং সাংগঠনিক তৎপরতা বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতেই সুপার সিক্স কাঠামো বাস্তবায়নের এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যদিও এখন পর্যন্ত এই কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে দলীয় ফোরামে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি, তবে দলের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পুরোদমে এগিয়ে চলছে। এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য সারোয়ার তুষার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, আগামী জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই এই পুনর্গঠিত কমিটির নতুন রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে তা প্রকাশ করা হতে পারে। তিনি আরও স্পষ্ট করেছেন যে, এই নতুন কমিটি কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নয়। এটি মূলত একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাঠামো হিসেবে কাজ করবে। আগামী জাতীয় সম্মেলন বা কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত, অর্থাৎ মোটামুটি আগামী ছয় মাস এই পুনর্গঠিত কমিটিই এনসিপির সমস্ত সাংগঠনিক কার্যক্রম ও নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলো পরিচালনা করবে। এই সময়ের মধ্যে দলটি নিজেদের নতুন কাঠামোর কার্যকারিতা যাচাই করে নেওয়ার সুযোগ পাবে।
রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের মাত্র দেড় বছরের মাথায় এনসিপি প্রমাণ করেছে যে, তারা সময়ের প্রয়োজনে নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে প্রস্তুত। দলের এই নমনীয়তা এবং বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিঃসন্দেহে তাদের দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক যাত্রার জন্য একটি ইতিবাচক দিক। আগামী বছরের শুরুতেই দলটির প্রথম জাতীয় কাউন্সিল বা সম্মেলন আয়োজনের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। সেই কাউন্সিলের মাধ্যমেই দলের গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত করা হবে এবং তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ, গণতান্ত্রিক ও দীর্ঘমেয়াদী সাংগঠনিক কাঠামো গঠন করা হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেকোনো নতুন রাজনৈতিক দলের জন্যই প্রথম কয়েক বছর অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। আদর্শিক ঘোষণার পাশাপাশি একটি মজবুত সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলা সহজ কাজ নয়। এনসিপি সেই চ্যালেঞ্জটি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে। প্রচলিত ধারার রাজনীতির বাইরে গিয়ে তারা যে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেছিল, তা হয়তো পুরোপুরি সফল হয়নি, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা তাদের সংগঠনকে আরও পরিণত করেছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করে এই ছয় সদস্যের কোর কমিটি যদি তৃণমূলের সাথে একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে, তবে আগামী দিনে দেশের রাজনীতিতে তারা একটি উল্লেখযোগ্য শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা, জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে এই নতুন নেতৃত্ব কীভাবে আত্মপ্রকাশ করে এবং দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তারা কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তা দেখার জন্য সবাই গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন।
তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস