• রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ০৮:০২ অপরাহ্ন

ঐতিহাসিক জয়ে আর্জেন্টিনার সেমিফাইনাল ও মেসির নতুন কীর্তি

Reporter Name / ২ Time View
Update : রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

বিশ্বকাপ ফুটবলের টানটান উত্তেজনায় ঠাসা কোয়ার্টার ফাইনাল পর্বের খেলা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। মহানাটকীয় এক ম্যাচে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। আলবিসেলেস্তেদের এই স্মরণীয় জয়ে বর্তমান ফুটবল বিশ্বের মহাতারকা লিওনেল মেসি নিজে জালের দেখা না পেলেও সতীর্থ হুলিয়ান আলভারেজ এবং লাউতারো মার্টিনেজের অনবদ্য পারফরম্যান্সে শেষ চারের টিকিট কাটে ল্যাটিন আমেরিকার এই পরাশক্তি। মাঠের লড়াইয়ে গোল না পেলেও পুরো ম্যাচজুড়ে মেসির পা থেকে এসেছে দারুণ সব সুযোগ, যা আন্তর্জাতিক ফুটবল পরিসংখ্যানের পাতায় যুক্ত করেছে অবিশ্বাস্য কিছু নতুন মাইলফলক। একই সঙ্গে এই ম্যাচে সুইজারল্যান্ডকে বিদায় করার মধ্য দিয়ে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের এক অবিস্মরণীয় ম্যাচ দেখল বিশ্ববাসী।

আন্তর্জাতিক ফুটবল পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৯২ সালে অফিশিয়ালি ফিফা র‍্যাঙ্কিং প্রবর্তন করার পর থেকে ফুটবল ইতিহাসের এই প্রথমবার শীর্ষ ৪টি বাছাই দল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পা রাখতে সক্ষম হয়েছে। ফুটবল বিশ্বকাপের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এটি মাত্র তৃতীয় সংস্করণ, যেখানে সেমিফাইনালের লড়াইয়ে টিকে থাকা চার সেমিফাইনালিস্ট দলই অতীতে অন্তত একবার হলেও বৈশ্বিক এই শিরোপা জয়ের স্বাদ পেয়েছে, যার আগের দুটি নজির ছিল যথাক্রমে ১৯৭০ ও ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে। পরিসংখ্যানের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, মেসি চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপে গোল অভিমুখে সতীর্থদের শটের দিকে নিয়ে যাওয়া ২০টি নিখুঁত পাস দিয়েছেন। ১৯৬৬ সালের পর তিনি পৃথিবীর প্রথম ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের তিনটি ভিন্ন আসরে ২০ বা তার বেশি শটের জন্য পাস দেওয়ার এক বিরল কীর্তি গড়লেন। এর আগে ২০২২ বিশ্বকাপে ২১টি এবং ২০১৪ সালের আসরে ২৪টি এমন পাস এসেছিল তার ম্যাজিকাল পা থেকে।

আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের ধার এই আসরে কতটা প্রখর, তা দলটির টানা গোল করার রেকর্ড দেখলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আলবিসেলেস্তেরা ২০২৬ বিশ্বকাপে টানা চারটি ম্যাচে প্রতিপক্ষের জালে ৩ বা তার বেশি গোল করার অনন্য গৌরব অর্জন করেছে। বিশ্বকাপের সুদীর্ঘ ইতিহাসে আর্জেন্টিনার আগে সমান সংখ্যক ম্যাচে টানা তিন বা তার বেশি গোল করার এই কীর্তি ছিল কেবল ইউরোপের পরাশক্তি ফ্রান্সের। ফরাসিদের সেই ঐতিহাসিক ধারাটি এই আসরে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ১-০ গোলের ম্যাচে থমকে যায়। অন্যদিকে, উচ্চতার দিক থেকে এই বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে আর্জেন্টিনা গড় উচ্চতায় নিচের দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু শরীরী উচ্চতায় খাটো দল হওয়া সত্ত্বেও অন্য ৪৪টি দেশের চেয়ে হেডের মাধ্যমে করা গোলে তারা এগিয়ে রয়েছে। চলতি আসরে কর্নার থেকে ৩টি গোল করে তারা এই ধরনের সর্বাধিক গোলে ইংল্যান্ড ও বসনিয়া-হার্জেগোভিনার রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছে এবং সেট পিস থেকে সর্বাধিক ৫টি গোল করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছে।

আর্জেন্টাইন দলপতি লিওনেল মেসি ব্যক্তিগত রেকর্ডের পাতায় জার্মানির কিংবদন্তি খেলোয়াড় লোথার মাথেউস, মিরোস্লাভ ক্লোসা এবং উভে সিলারের পাশে নিজের নাম লিখিয়েছেন। ফুটবল ইতিহাসের চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মূল একাদশে ম্যাচ শুরু করার গৌরব অর্জন করলেন তিনি। অন্যদিকে দলের তরুণ স্ট্রাইকার হুলিয়ান আলভারেজ তার ক্যারিয়ারের পাঁচটি বিশ্বকাপ গোলের মধ্যে চারটি গোলই করেছেন নকআউট রাউন্ডের মতো মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে। এর মাধ্যমে তিনি আর্জেন্টিনার ফুটবল ঈশ্বর ডিয়েগো ম্যারাডোনার পাশে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নকআউট গোলের আসনে বসলেন। এই তালিকায় ৭টি নকআউট গোল নিয়ে আলভারেজ ও ম্যারাডোনার ওপরে শীর্ষ স্থানে রয়েছেন খোদ মেসি।

ম্যাচের নেতিবাচক দিক হিসেবে সুইস তারকা ব্রিল এম্বোলো ডাইভিং বা অভিনয়ের জন্য রেফারি কর্তৃক দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন, যা তাকে ২০০৬ সালে মেক্সিকোর লুইস পেরেজ, ঘানার আসামোয়া গিয়ান এবং ২০০২ সালে ইতালির ফ্রান্সেসকো টট্টির পাশে দাঁড় করিয়েছে। বিশ্বকাপের গত ৬০ বছরের ইতিহাসে সিমুলেশনের জন্য মাঠ ছাড়ার এটি চতুর্থ ঘটনা। এদিকে ২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউট রাউন্ডে এটি ছিল অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো অষ্টম ম্যাচ। এর আগে ১৯৯০ ও ২০১৪ সালের আসরেও সমান সংখ্যক ৮টি ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গিয়েছিল, তবে তখন নকআউট ম্যাচ ছিল মাত্র ১৫টি, যেখানে এবার ২৮টি ম্যাচের মধ্যে এই সমতা দেখল ফুটবল বিশ্ব।

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে গোল না পাওয়ায় মেসির টানা ৯টি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার অতিমানবীয় রেকর্ডটির অবসান ঘটল, যার মধ্যে ২০২২ সালের আসরে ৪টি এবং ২০২৬ সালের আসরে ৫টি গোল ছিল। তবে গোল না পেলেও দলের তারকা মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারকে দেওয়া কর্নার পাসের মাধ্যমে বিশ্বকাপে মেসির অ্যাসিস্ট সংখ্যা এখন ১০টিতে উন্নীত হলো। ১৯৬৬ সালের পর অন্য যেকোনো ফুটবলারের চেয়ে যা অন্তত দুটি বেশি, যেখানে ডিয়েগো ম্যারাডোনার অ্যাসিস্ট ছিল ৮টি। মেসির এই ১০টি অ্যাসিস্টের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এগুলো ১০ জন ভিন্ন ভিন্ন খেলোয়াড়ের গোল করতে ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া ম্যাচের ৯ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডের মাথায় দেওয়া এই পাসটি বিশ্বকাপে মেসির ক্যারিয়ারের দ্রুততম অ্যাসিস্ট এবং কর্নার থেকে দেওয়া প্রথম অ্যাসিস্ট।

এই অনন্য পারফরম্যান্সের মাধ্যমে গত ৬০ বছরে একমাত্র ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের একাধিক আসরে ১০টির বেশি গোলে সরাসরি অবদান রাখার তালিকায় কিলিয়ান এমবাপ্পের পাশে নাম লেখালেন মেসি। এমবাপ্পে ২০২২ সালে ১০টি এবং ২০২৬ সালে ১১টি গোলে অবদান রেখেছেন, আর মেসি ২০২২ ও ২০২৬ উভয় আসরেই ১০টি করে গোলে অবদান রাখলেন। অন্যদিকে ম্যাক অ্যালিস্টারের কাছে গোল খাওয়ার মাধ্যমে এই পুরো বিশ্বকাপ চক্রে (বাছাইপর্ব এবং মূল আসর) সুইজারল্যান্ড দল প্রথমবারের মতো কোনো ম্যাচে প্রতিপক্ষের চেয়ে পিছিয়ে পড়ার তেতো স্বাদ পেল, যা এই আসরে কেবল তাদেরই একক রেকর্ড ছিল।

সব মিলিয়ে ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ৮টি নকআউট পর্বের ম্যাচে মেসি সরাসরি ১৩টি গোলের সাথে সম্পৃক্ত থেকেছেন, যার মধ্যে ৭টি গোল ও ৬টি অ্যাসিস্ট রয়েছে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসে আর্জেন্টিনার অতিরিক্ত সময়ে খেলা ১৩তম ম্যাচ, যা যেকোনো দেশের চেয়ে সর্বোচ্চ। এর আগে তারা জার্মানির সাথে ১২টি ম্যাচ খেলে সমতায় ছিল। পেনাল্টি শুটআউটসহ এই ১৩টি ম্যাচের মধ্যে ১১টিতেই জয়ের শেষ হাসি হেসেছে ল্যাটিন আমেরিকার দলটি। বিশ্বকাপের মূল সময়ের অতিরিক্ত অংশের ভেতরে এটি ছিল তাদের পঞ্চম জয়, যা ইতালির (৬টি জয়) ঠিক পেছনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

চলতি বিশ্বকাপে প্রতিটি দিনই মেসির জন্য নতুন রেকর্ড বয়ে আনছে। আর্জেন্টাইন অধিনায়কের এখন বিশ্বকাপ নকআউট রাউন্ডে সরাসরি ১৫টি গোলে সম্পৃক্ততা রয়েছে, যা গত ৬০ বছরের ইতিহাসে যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্য সর্বোচ্চ এবং এর মাধ্যমে তিনি কিলিয়ান এমবাপের ১৪টি গোলের রেকর্ড ভেঙে এককভাবে চূড়ায় বসলেন। রোমাঞ্চকর এই ম্যাচে আর্জেন্টিনার শুরুর একাদশের গড় বয়স ছিল ৩০ বছর ১৭৭ দিন, যা ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিলের ৩০ বছর ২০৯ দিনের বুড়ো একাদশের পর বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক দল হিসেবে ফুটবল ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category