দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে অর্থনৈতিক জোগানের ভিত্তি মজবুত করতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে একগুচ্ছ সুদূরপ্রসারী ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের এই বাজেট প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এবারের বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মূল লক্ষ্যই হলো করের পরিধি বাড়ানো, কর ফাঁকির পথ চিরতরে বন্ধ করা এবং পুরো কর ব্যবস্থায় শতভাগ ডিজিটাল অটোমেশন নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে দেশের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে থাকা নতুন করদাতাদের খুঁজে বের করার একটি বৃহৎ মিশন শুরু হচ্ছে। তবে শুধু করের বোঝাই নয়, দেশের তরুণ সমাজ ও উদীয়মান অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে বেশ কিছু ক্ষেত্রে বড় ধরনের শুল্কছাড় ও কর অব্যাহতির বিশেষ সুবিধাও রাখা হচ্ছে এই বাজেটে।
ব্যবসায়িক ও প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেনে ‘বিন’ আবশ্যিক
ভ্যাটের (VAT) জাল দেশজুড়ে বিস্তৃত করতে সরকার নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ব্যবসায় শনাক্তকরণ সংখ্যা বা বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (BIN) প্রদর্শন সম্পূর্ণ আবশ্যিক করার প্রস্তাব করছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক হিসাব বা এসটিডি হিসাব খোলা ও পরিচালনা করা, যেকোনো ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ সুবিধা গ্রহণ, স্থানীয় সরকার থেকে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন এবং আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক হিসেবে নতুন লাইসেন্স বা নিবন্ধন নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘বিন’ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হচ্ছে। এর বাইরেও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলা, বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংগঠনের সদস্যপদ সচল রাখা, গ্যাস ও বিদ্যুতের নতুন সংযোগ নেওয়া এবং বিআরটিএ থেকে যেকোনো ধরনের বাণিজ্যিক যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন করার ক্ষেত্রেও ব্যবসায়ীদের এই ভ্যাট নম্বরটি প্রদর্শন করতে হবে।
ব্যাংক হিসাব ও নাগরিক সেবায় টিআইএন-এর কড়াকড়ি
নতুন করদাতা শনাক্তকরণ প্রক্রিয়াকে আরও জোরদার করতে কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন (TIN) ব্যবহারের পরিধি নজিরবিহীনভাবে বাড়ানো হচ্ছে। এখন থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি অ্যাকাউন্ট এবং বিশেষ কিছু নো-ফ্রিলস অ্যাকাউন্ট ছাড়া দেশের যেকোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকে নতুন হিসাব খুলতে গেলে টিআইএন সনদ দাখিল করা বাধ্যতামূলক করা হবে। শুধু ব্যাংকিং খাতের সাধারণ লেনদেনই নয়, স্থানীয় নির্বাচন এবং স্থাবর সম্পত্তি কেনাবেচাতেও এই নিয়ম কার্যকর হচ্ছে। যেমন—ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাওয়া যেকোনো প্রার্থীকে বাধ্যতামূলকভাবে টিআইএন জমা দিতে হবে। এছাড়া যেকোনো জমি বা ফ্ল্যাট কেনাবেচার চুক্তি সম্পন্ন করতে এবং নির্দিষ্ট কিছু পেশাজীবী সংগঠনের সদস্যপদ লাভের ক্ষেত্রেও টিআইএন ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকছে। এর মাধ্যমে বড় অংকের লেনদেনকারী নাগরিকদের সহজেই করজালের মধ্যে নিয়ে আসা সম্ভব হবে।
খুচরা বাজার নিয়ন্ত্রণে অগ্রিম করের কৌশল
দেশের বিশাল অনানুষ্ঠানিক খুচরা বাজারকে করের মূল ধারায় যুক্ত করতে একটি অত্যন্ত চতুর ও কৌশলগত কর আদায়ের পদ্ধতি চালু করার প্রস্তাব করছেন অর্থমন্ত্রী। নতুন বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো আমদানিকারক, উৎপাদক কিংবা বড় পরিবেশকদের কাছ থেকে যখন সাধারণ খুচরা বিক্রেতারা পাইকারি পণ্য কিনতে যাবেন, তখন মোট সরবরাহ মূল্যের ওপর শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ (০.২০%) হারে অগ্রিম আয়কর কেটে রাখা হবে। এই নামমাত্র করের মূল উদ্দেশ্য সরাসরি বড় রাজস্ব আদায় নয়, বরং এর মাধ্যমে দেশের লাখ লাখ খুচরা বিক্রেতার কেনাবেচা ও অর্থনৈতিক লেনদেনের প্রকৃত তথ্য সরাসরি এনবিআরের কেন্দ্রীয় সার্ভারে চলে আসবে। এই ডিজিটাল ডেটাবেজ পর্যালোচনার মাধ্যমে পরবর্তীতে নতুন করদাতা শনাক্ত করা অনেক সহজ হবে।
ডিজিটাল নজরদারি ও কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার সমন্বয়
এই সামগ্রিক নজরদারি প্রক্রিয়াকে নির্ভুল ও শক্তিশালী করতে ‘সেন্ট্রাল ডেটা ইন্টিগ্রেশন’ বা কেন্দ্রীয় তথ্য সমন্বয়ের একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এর আওতায় এনবিআরের নিজস্ব তথ্যভাণ্ডারকে দেশের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ডেটাবেজ, সব ব্যাংকের আর্থিক বিবরণী, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির মতো ইউটিলিটি সেবার তথ্য এবং ভূমি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সিস্টেমের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করা হচ্ছে। একই সাথে আইনগত পরিবর্তন এনে এনবিআরকে এমন বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে তারা যেকোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডারে সরাসরি প্রবেশ বা এক্সেস নিতে পারবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা দিতে বাধ্য থাকবে। এছাড়া তামাক পণ্যের অবৈধ বাণিজ্য ও রাজস্ব ফাঁকি রুখতে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ নামক আধুনিক ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা থাকছে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায়।
কোম্পানির স্টক ডিভিডেন্ড ও সংরক্ষিত আয়ের ওপর নতুন কর
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ দেওয়ার নীতিতে বড় পরিবর্তন এনে করের চাপ বাড়াতে চায় সরকার। কোম্পানিগুলো যাতে শেয়ারহোল্ডারদের নগদ অর্থ দিতে উৎসাহিত হয়, সে জন্য এই উদ্যোগ। তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য যেকোনো কোম্পানি যদি ক্যাশ ডিভিডেন্ডের পরিবর্তে স্টক ডিভিডেন্ড বা বোনাস শেয়ার ঘোষণা করে, তবে সেই স্টক ডিভিডেন্ডের ওপর ১০ শতাংশ হারে নতুন কর আরোপের প্রস্তাব করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি কোম্পানিগুলো যেন তাদের উপার্জিত মুনাফা নিজেদের তহবিলে অলস ফেলে না রেখে বিনিয়োগকারী ও শেয়ারহোল্ডারদের মাঝে বণ্টন করে, সে জন্য কঠোর নিয়ম করা হচ্ছে। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি কর-পরবর্তী নিট মুনাফার অন্তত ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ হিসেবে দিতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের মোট সংরক্ষিত তহবিল, উদ্বৃত্ত বা রিটেইন্ড আর্নিংসের ওপর ১০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত জরিমানা বা কর আরোপ করা হবে।
স্বর্ণ শিল্পকে বৈধ ও আনুষ্ঠানিক খাতে আনার উদ্যোগ
উচ্চ উৎসে করের হারের কারণে দেশের স্বর্ণ ও স্বর্ণালঙ্কারের বাজারের একটি বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক রয়ে গেছে, যার ফলে সরকার এই বিশাল খাত থেকে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব পায় না। এই খাতের ব্যবসায়ীদের বৈধ ও আনুষ্ঠানিক পথে উৎসাহিত করতে স্বর্ণ সরবরাহের ওপর বিদ্যমান ৫ শতাংশ উৎসে করের হার এক ধাক্কায় কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ (০.৫%) করার প্রস্তাব করা হতে পারে। এছাড়া ভ্যাট আদায়ের প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করতে শতাংশের হিসাব বাদ দিয়ে প্রতি ভরি স্বর্ণালঙ্কারে নির্দিষ্ট ২ হাজার ৫০০ টাকা ভ্যাট নির্ধারণের প্রস্তাব করা হতে পারে। এতে স্বর্ণের বাজারে স্থায়িত্ব আসবে এবং চোরাচালান কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তরুণ ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য করছাড়ের উপহার
নতুন করদাতা খোঁজার এই কঠোর অভিযানের পাশাপাশি দেশের তরুণ সমাজ, স্টার্টআপ এবং আইটি খাতকে এক বিশাল প্রণোদনা ও ছাড় দিচ্ছে সরকার। আগামী ২০auto৩৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের সমস্ত স্টার্টআপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সম্পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, নতুন স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ব্যবসার ক্ষেত্রে টার্নওভার ট্যাক্স বা বিক্রয় কর শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হচ্ছে। আইটি খাতের পাশাপাশি যেকোনো ধরনের ফ্রিল্যান্সিং এবং সব ধরনের কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে উপার্জিত আয়কে সম্পূর্ণ আয়করমুক্ত রাখার ঐতিহাসিক ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। পরিশেষে, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে ২০২৬-২৭ থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত আগামী ৫ বছরের জন্য একটি পূর্বানুমানযোগ্য ও প্রগতিশীল কর কাঠামো ঘোষণা করা হবে, যা ব্যক্তি ও করপোরেট উভয় খাতের করদাতাদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা করতে সর্বোচ্চ সহায়তা করবে।
তথ্যসূত্র: সমকাল