• রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ০১:২৭ পূর্বাহ্ন

গরু কোরবানি ইসলামের বাধ্যতামূলক বিধান নয় জানাল কলকাতা হাইকোর্ট

Reporter Name / ২ Time View
Update : শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে তৈরি হয়েছে নতুন আইনি ও রাজনৈতিক সমীকরণ। উন্মুক্ত বা জনপরিসরে গবাদিপশু জবাইয়ের ওপর রাজ্য সরকারের জারি করা কঠোর নিষেধাজ্ঞাকে বৈধতা দিয়েছেন কলকাতা হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আদালত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক পর্যবেক্ষণে জানিয়েছেন যে, গরু কোরবানি দেওয়া ঈদুল আজহা উৎসবের কোনো অপরিহার্য অংশ নয় এবং ইসলামের ধর্মীয় বিধানেও এটি কোনো বাধ্যতামূলক বিষয় নয়।

বৃহস্পতিবার (২০ মে) কলকাতা হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণের আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ চেয়ে করা আবেদন খারিজ করে দিয়ে এই যুগান্তকারী রায় প্রদান করেন। নতুন রাজ্য সরকারের নির্দেশনার পর আদালতের এই রায় পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

আদালতের ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ ও সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স

আইনবিষয়ক প্রখ্যাত সংবাদমাধ্যম ‘লাইভ ল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থ সারথি সেনের সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ এই মামলার শুনানি গ্রহণ করেন। শুনানি শেষে আদালত জনপরিসরে গরু ও মহিষ জবাই করার ওপর আরোপিত সরকারি নিষেধাজ্ঞাকে সম্পূর্ণ বহাল রাখেন।

রায়ের আদেশে হাইকোর্টের বেঞ্চ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন:

  • উন্মুক্ত স্থানে জবাই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ: রাস্তাঘাট বা যেকোনো উন্মুক্ত জনপরিসরে গরু, মহিষসহ অন্যান্য গবাদিপশু জবাই করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ থাকবে। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের কথা বিবেচনায় নিয়ে এই সিদ্ধান্ত মান্য করতে হবে।

  • সুপ্রিম কোর্টের নজির: আদালত ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি পুরোনো ও ঐতিহাসিক রায়ের (মো. হানিফ কোরেশি ও অন্যান্য বনাম বিহার রাজ্য মামলা) কথা স্মরণ করিয়ে দেন। ওই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন যে, ঈদুল আজহায় গরু কোরবানি দেওয়া ইসলামের অধীনে কোনো বাধ্যতামূলক ধর্মীয় বিধান নয়। এটি উৎসবের অপরিহার্য কোনো অংশও নয়।

নবনির্বাচিত বিজেপি সরকারের মে মাসের বিজ্ঞপ্তি

পশ্চিমবঙ্গে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে ঐতিহাসিক পালাবদলের পর শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে গঠিত নবনির্বাচিত বিজেপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই পশু জবাই নিয়ন্ত্রণের দিকে কড়া নজর দেয়। গত ১৩ মে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়।

এই বিজ্ঞপ্তিতে কোরবানির পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠোর নির্দেশিকা বেঁধে দেওয়া হয়:

  • ফিটনেস সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক: সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দেওয়া ‘ফিটনেস সার্টিফিকেট’ বা পশুর সুস্থতার চিকিৎসাপত্র ছাড়া কোনোভাবেই কোনো প্রাণী জবাই করা যাবে না।

  • শাস্তিমূলক ব্যবস্থা: সরকারের এই নির্দেশনা অমান্য করে কেউ যদি যত্রতত্র পশু জবাই করে, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

  • জনপরিসরে নিষেধাজ্ঞা: সরকার ওই বিজ্ঞপ্তিতে আরও স্পষ্ট করে জানায় যে, সবার চোখের সামনে উন্মুক্ত জনপরিসরে কোনো প্রাণী জবাই করা ‘কঠোরভাবে নিষিদ্ধ’ থাকবে। এর জন্য নির্দিষ্ট স্থান বা স্লটার হাউস ব্যবহার করতে হবে।

আইনি চ্যালেঞ্জ ও তৃণমূল নেত্রীর পিটিশন

রাজ্য সরকারের এই কড়াকড়ির নির্দেশিকার পর ঈদ উদযাপনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন অনেকেই। সরকারের এই বিজ্ঞপ্তিকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টে একাধিক পিটিশন দায়ের করা হয়। পিটিশনকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) প্রভাবশালী সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র।

পিটিশনকারীদের মূল দাবি ছিল:

  • আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে ধর্মীয় আচার পালনের সুবিধার্থে সরকারের এই কঠোর আদেশের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেওয়া হোক।

  • ‘প্রাণী জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫০’-এর ১২ ধারার অধীনে উৎসবের দিনগুলোতে পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ আইনি ছাড় বা ওয়েভার (Waiver) প্রদান করা হোক।

আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশনা

পিটিশনকারীদের আবেদন ও যুক্তিতর্ক শোনার পর কলকাতা হাইকোর্ট রাজ্য সরকারের মে মাসের বিজ্ঞপ্তির ওপর কোনো ধরনের স্থগিতাদেশ দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান। অর্থাৎ, ঈদের সময় উন্মুক্ত স্থানে পশু জবাইয়ের নিষেধাজ্ঞা বহালই থাকছে।

তবে পিটিশনকারীদের ১৯৫০ সালের আইনের ১২ ধারার আওতায় ছাড় চাওয়ার বিষয়ে আদালত সরাসরি কোনো রায় দেননি। হাইকোর্ট রায়ে বলেন, “কয়েকজন পিটিশনকারীর চাওয়া এই বিশেষ ছাড়ের বিষয়ে ১৯৫০ সালের আইনের ১২ ধারার আওতায় রাজ্য সরকারকে একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো।”

অর্থাৎ, ঈদের সময় কোনো নির্দিষ্ট শর্তে ছাড় দেওয়া হবে কি না, তার চূড়ান্ত বল এখন রাজ্য সরকারের কোর্টেই ঠেলে দিয়েছেন আদালত। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এবং নতুন সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে এবারের ঈদুল আজহা পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের জন্য একেবারেই ভিন্ন এক অভিজ্ঞতার জন্ম দিতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category