সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিমা বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে ‘চায়না শক ২.০’ ধারণাটি নিয়ে এক নতুন বিতর্ক ও আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাধিক নীতিনির্ধারক ও গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, চীনের উচ্চ উৎপাদনক্ষমতা ও শিল্প খাতে দেওয়া সরকারি সহায়তা আন্তর্জাতিক বাজারে সস্তা পণ্যের প্রবাহ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা উন্নত বিশ্বের নিজস্ব উৎপাদন খাতকে এক প্রকার অসম প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ শতকের শেষ ভাগে এবং একুশ শতকের শুরুতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চীনের যোগদানের পর ঐতিহ্যবাহী ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে যে বিপুল উৎপাদন হয়েছিল, তাকে বিশ্লেষকরা ‘চায়না শক ১.০’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তি, আধুনিক বৈদ্যুতিক যানবাহন বা ইভি, সৌরশক্তি ও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির মতো উচ্চমূল্যের পণ্যে বেইজিংয়ের অভূতপূর্ব সাফল্যকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা মহলে নতুন করে এই ‘চায়না শক ২.০’ আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে। তবে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল ও বৈশ্বিক ভোক্তাদের স্বার্থ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চীনের এই শিল্প সক্ষমতা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য কোনো হুমকি বা সংকট নয়, বরং বিশ্বজুড়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির রূপান্তর ত্বরান্বিতকরণ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবকাঠামো পুনর্গঠনের এক অনন্য সুযোগ।
পশ্চিমা অর্থনীতির মূল অভিযোগের জায়গাটি দাঁড়িয়ে আছে চীনের কথিত অতিরিক্ত শিল্পোৎপাদন ক্ষমতার ওপর। কিন্তু মুক্তবাজার অর্থনীতির তত্ত্ব অনুযায়ী, তুলনামূলক সুবিধা বা কম্পারেটিভ অ্যাডভান্টেজ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের সর্বোচ্চ দক্ষতার ওপর ভিত্তি করেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভিত্তি রচিত হয়। চীন গত কয়েক দশকে তাদের দেশে একটি সুসংহত, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও নিরবচ্ছিন্ন সাপ্লাই চেইন ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে, যা বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় দ্রুত ও স্বল্প ব্যয়ে মানসম্মত পণ্য উৎপাদনে সক্ষম। কেবল সরকারি সহায়তার জোরে এত বড় শিল্প বিপ্লব ঘটানো সম্ভব নয়, বরং গবেষণায় বিপুল অর্থ বরাদ্দ, আধুনিক প্রকৌশলবিদ্যা, অটোমেশন এবং বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজারের সমন্বয়েই তারা উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে এনেছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের এই স্বাভাবিক দক্ষতাকে পশ্চিমা নেতারা ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতা’ হিসেবে চিত্রিত করার প্রয়াস পাচ্ছেন, যা মূল অর্থনৈতিক নীতিমালার সাথে বহুলাংশে সাংঘর্ষিক।
বৈশ্বিক ভোক্তাদের জীবনযাত্রার মান এবং বিশ্বব্যাপী চলমান মূল্যস্ফীতি মোকাবিলার ক্ষেত্রে চীনের সাশ্রয়ী পণ্যের ইতিবাচক ভূমিকা অনস্বীকার্য। কোভিড মহামারি-পরবর্তী সময়ে এবং সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে যখন পশ্চিমা দেশগুলোতে জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তখন সাশ্রয়ী মূল্যের চীনা পণ্য সাধারণ পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ অনেকাংশে লাঘব করতে সাহায্য করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিকৃত চীনা শিল্পপণ্য এবং ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী দেশটির সামগ্রিক ভোক্তা মূল্য সূচক বা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যদি এই সস্তা পণ্যগুলোর ওপর অতিরিক্ত শুল্ক বা কৃত্রিম বাধা আরোপ করা হয়, তবে তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের সাধারণ জনগণের ক্রয়ক্ষমতার ওপর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের বৈচিত্র্য ও সহজলভ্যতা বজায় রাখা বৈশ্বিক সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্যই অত্যন্ত জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং টেকসই জ্বালানি রূপান্তরের বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রার ক্ষেত্রেও চীনের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির অবদান এখন অপরিহার্য। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্য অর্জন এবং কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন সাশ্রয়ী মূল্যে সৌর প্যানেল, উইন্ড টারবাইন এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাপক সরবরাহ। অতীতে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল ও নবায়নযোগ্য প্রযুক্তির দাম এত বেশি ছিল যে তা স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রায় নাগালের বাইরে ছিল। চীনের বিপুল উৎপাদন এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার কারণে সৌর প্যানেলের উৎপাদন ব্যয় গত এক দশকে শতকরা আশি ভাগের বেশি কমে এসেছে। এর ফলে কেবল উন্নত দেশগুলোই নয়, বরং এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোও খুব সহজে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হতে পারছে। সুতরাং চীনের এই সবুজ প্রযুক্তির প্রসারকে বাধাগ্রস্ত করার অর্থ হলো পরোক্ষভাবে বৈশ্বিক জলবায়ু সুরক্ষা ও কার্বন হ্রাসের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকেই ব্যাহত করা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের গাড়ি নির্মাণ শিল্পের সংকটের বিষয়টিকে যেভাবে উপস্থাপিত করা হচ্ছে, তা-ও প্রকৃত সত্যের সম্পূর্ণ প্রতিচ্ছবি নয়। ব্রাসেলসের দাবি অনুযায়ী চীনা ইলেকট্রিক গাড়ির আমদানি বৃদ্ধির কারণে ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী গাড়ি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো অস্তিত্বের সংকটে পড়ছে। কিন্তু নিরপেক্ষ অটোমোবাইল বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর বর্তমান সমস্যার মূল কারণ চীনা প্রতিযোগিতা নয়, বরং তাদের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা, সফটওয়্যার ও ব্যাটারি প্রযুক্তিতে দেরিতে রূপান্তর এবং অতিরিক্ত রক্ষণশীল মনোভাব। চীন যখন বহু বছর পূর্বেই ব্যাটারি ও ইলেকট্রিক ড্রাইভ ট্রেইনে বৈপ্লবিক রূপান্তরের কাজ শুরু করেছিল, ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তখনো প্রথাগত জ্বালানিচালিত ইঞ্জিনের মুনাফায় নিমগ্ন ছিল। তাছাড়া চীনা কোম্পানিগুলো শুধু পণ্য রপ্তানি করছে না, বরং হাঙ্গেরি, স্পেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে স্থানীয় পর্যায়ে কারখানা স্থাপন করছে এবং ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগ গড়ে তুলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, যা ইউরোপের নিজস্ব সবুজ শিল্পায়নকেই ত্বরান্বিত করছে।
চীনের আন্তর্জাতিক উদ্যোগগুলো কোনো একক পক্ষ বিজয়ী হওয়ার ‘জিরো-সাম গেম’ বা শূন্য-সমষ্টির খেলা নয়, বরং এটি পারস্পরিক উন্নয়ন ও সহযোগিতার একটি টেকসই মডেল। বেইজিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) এবং নতুন নতুন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করিডোরের মাধ্যমে বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল দেশ আজ উন্নত সড়ক, গভীর সমুদ্রবন্দর, আধুনিক রেলপথ ও ডিজিটাল অবকাঠামো সুবিধা লাভ করছে। এই উন্নত অবকাঠামোগত নেটওয়ার্ক গ্লোবাল সাউথের প্রান্তিক অঞ্চলগুলোকে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও মূল সরবরাহ শৃঙ্খলের সাথে যুক্ত করতে প্রধান ভূমিকা পালন করছে। পরিবহন খরচ এবং লজিস্টিকস সময় কমে যাওয়ার কারণে বহু ক্ষুদ্র ও মাঝারি অর্থনীতির দেশ আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের পণ্য সহজে বিক্রির সুযোগ পাচ্ছে, যা তাদের স্থানীয় অর্থনীতিকে প্রাণবন্ত করে তুলছে।
বিশ্ব বাণিজ্য আজ যে জটিল ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের মুখে দাঁড়িয়েছে, তা থেকে উত্তরণের পথ হলো সংরক্ষণবাদের প্রাচীর না তুলে বরং পারস্পরিক সহযোগিতা ও সুষম প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। উন্নত দেশগুলো যদি তাদের নিজস্ব উৎপাদকদের সুরক্ষা দেওয়ার নামে অযৌক্তিক শুল্ক প্রাচীর গড়ে তোলে, তবে তা কেবল বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খলকেই ভেঙে ফেলবে না, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধিকে স্থবির করে দেবে। চীনের ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ক্ষমতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং তা বৈশ্বিক শ্রমবিভাজন ও শিল্প রূপান্তরের স্বাভাবিক ফল। বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন গতিশীলতা দিতে হলে চীনের সক্ষমতাকে পুঁজি করে উন্নত অবকাঠামো গড়ে তোলা, স্বল্পমূল্যে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সুফল ভোগ করা এবং যৌথ অংশীদারিত্বের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পকে আধুনিকায়ন করাই এখন সবচেয়ে যৌক্তিক কৌশল। তাই ‘চায়না শক ২.০’-কে আতঙ্ক বা হুমকি হিসেবে না দেখে একে টেকসই উন্নয়ন ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের এক বড় সম্ভাবনা হিসেবে গ্রহণ করাই সময়ের সবচেয়ে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত।