বাংলাদেশের স্থানীয় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতে এক দীর্ঘ বিরতির পর আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে ঐতিহ্যবাহী ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থা। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৮০ সালে সর্বপ্রথম ‘স্বনির্ভর গ্রাম সরকার’ ধারণার হাত ধরে তৃণমূল পর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসনকে শক্তিশালী করার যে অভিনব প্রয়াস শুরু হয়েছিল, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নানা আইনি মারপ্যাচে তা হারিয়ে গিয়েছিল অতীতে। বিভিন্ন সময় এই কাঠামোর রূপ পরিবর্তন, বিলুপ্তি এবং নতুন করে আইনি রূপ দেওয়ার ইতিহাস পেরিয়ে দীর্ঘ ১৭ বছর পর বর্তমান বিএনপি সরকার এই ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার চূড়ান্ত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে সম্প্রতি ‘গ্রাম সরকার আইন, ২০২৬’-এর একটি পূর্ণাঙ্গ খসড়া জনসমক্ষে প্রকাশ করে জনগণের সুনির্দিষ্ট মতামত আহ্বান করা হয়েছে। এই প্রস্তাবিত আইনটি শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত রূপ লাভ করে বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৪৬ বছর পর দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিটি ওয়ার্ডে নতুন আঙ্গিকে আত্মপ্রকাশ করবে বহুল আলোচিত এই গ্রাম সরকার ব্যবস্থা।
স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রকাশিত প্রস্তাবিত খসড়া নথিপত্র অনুযায়ী, প্রতিটি ওয়ার্ডের গ্রাম সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো সাজানো হয়েছে ১৭ জন সদস্যের সমন্বয়ে। এই কাঠামোর শীর্ষপদে থাকবেন সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড থেকে সরাসরি নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বা ইউপি মেম্বার, যিনি গ্রাম সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া সংশ্লিষ্ট এলাকার সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য পদাধিকার বলে গ্রাম সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত থাকবেন। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রথম সভার কার্যদিবস থেকে এই গ্রাম সরকারের মেয়াদ নির্ধারিত হয়েছে পাঁচ বছর। প্রধান ও উপদেষ্টা ছাড়াও বাকি ১৫ জন সদস্যের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে সমাজের বিভিন্ন পেশা ও স্তরের প্রতিনিধিত্বের এক সুষম বিন্যাস রাখা হয়েছে খসড়ায়।
প্রস্তাবিত কাঠামোর সদস্য নির্বাচনে সমাজের নানা শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ১৫ জন সাধারণ সদস্যের মধ্যে থাকছেন দুজন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি বা সমাজসেবক, সরকারি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর একজন পুরুষ ও একজন নারী সদস্য। পাশাপাশি কৃষকদের মধ্য থেকে দুজন এবং নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজী, সমবায় সমিতির প্রতিনিধি, পল্লিচিকিৎসক, শিক্ষক, স্থানীয় ব্যবসায়ী, বিভিন্ন পেশাজীবী, শ্রমিক এবং যুবসমাজের একজন করে প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস থাকলে তাদের মধ্য থেকেও একজন প্রতিনিধি রাখার বিধান রাখা হয়েছে। যদি কোনো বিশেষ শ্রেণির প্রতিনিধি পাওয়া না যায়, তবে সেই শূন্য পদগুলো গণ্যমান্য ব্যক্তি বা সমাজসেবকদের সংখ্যা বাড়িয়ে পূরণ করা হবে বলে খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে। এসব সদস্য নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের মোট ভোটার তালিকার অন্তত ১০ শতাংশ ভোটারের সরাসরি উপস্থিতি এবং ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা পরিচালনা করবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
গ্রাম সরকারের কাজের পরিধি কেবল সাধারণ প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি, বরং গ্রামীণ জনপদের সামগ্রিক উন্নয়ন থেকে শুরু করে সামাজিক অপরাধ দমনের মতো গুরুদায়িত্বও এর ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। গ্রামের অভ্যন্তরীণ রাস্তাঘাট, কালভার্ট ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের অগ্রাধিকার তালিকা প্রস্তুত করা, চলমান সরকারি প্রকল্পের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা এবং বিভিন্ন সরকারি সেবামূলক কার্যক্রমে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করবে এই প্রতিষ্ঠান। এর পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতন, সামাজিক অপরাধ, চুরি, মাদক, জুয়া এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ছোটখাটো বিরোধ সালিশির মাধ্যমে মীমাংসা করার উদ্যোগ নেবে তারা। কোমলমতি শিশুদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া, পুষ্টিহীনতা দূরীকরণ, টিকাদান কর্মসূচি সফল করা এবং বিশুদ্ধ পানীয় জল ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নেও গ্রাম সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এছাড়া কৃষকদের জন্য সার ও বীজসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণের সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সংকট তৈরি হলে তা দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবে এই স্থানীয় বডি। সমবায় আন্দোলন জোরদার করা, কুটিরশিল্পের প্রসার, মৎস্যচাষ, গবাদিপশু পালন, বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতেও সচেষ্ট থাকবে গ্রাম সরকার। কার্যক্রমের গতিশীলতা বজায় রাখতে প্রতি দুই মাসে অন্তত একটি নিয়মিত সভা এবং প্রতি ছয় মাসে অন্তত একটি উন্মুক্ত সাধারণ সভা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যেখানে ওয়ার্ডের অন্তত ১০ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
গ্রাম সরকারের নিজস্ব আর্থিক তহবিল গঠনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবও রাখা হয়েছে এই খসড়ায়, যেখানে ইউনিয়ন পরিষদ এবং অন্যান্য বৈধ উৎস থেকে প্রাপ্ত অনুদান ও অর্থ জমা হবে। দাপ্তরিক নানা উপকরণ ক্রয়ের খরচ মেটানোর জন্য ইউনিয়ন পরিষদ তাদের নিজস্ব আয়ের একটি সুনির্দিষ্ট অংশ এই তহবিলে প্রদান করবে। কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে এই কার্যক্রম নিয়মিত পরিদর্শন ও তদন্তের বিধান রাখা হয়েছে। যদি কোনো গ্রাম সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক দায়িত্ব অবহেলা, প্রশাসনিক বা আর্থিক অক্ষমতা, জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক তা বাতিল করার ক্ষমতা রাখবেন। তবে যেকোনো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আগে অভিযুক্ত কমিটিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়ে যথাযথ কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করতে হবে।
গ্রাম সরকার ব্যবস্থার এই দীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৮০ সালের ২৪ মে সরকারি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গ্রামীণ মানুষকে স্বাবলম্বী করে তোলার লক্ষে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, গণসাক্ষরতা প্রসার, পরিবার পরিকল্পনা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ স্থানীয় বিরোধ মীমাংসাকে এর প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু ১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর এই ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ‘স্থানীয় সরকার (গ্রাম পরিষদ) আইন’ প্রণয়ন করলেও তা কার্যকর হয়নি। এরপর ২০০৩ সালে বিএনপি সরকার নতুন করে ‘গ্রাম সরকার আইন’ পাশ করে। তবে সেই আইনের আওতায় প্রধান ও উপদেষ্টা নির্বাচিত হলেও বাকি ১৩ জন সদস্য মনোনয়নের ভিত্তিতে গঠিত হওয়ায় এবং নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে মনোনীত এই সদস্যদের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আইনি জটিলতা দেখা দেয়। মানবাধিকার সংস্থা ব্লাস্টের করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫ সালের ২ আগস্ট হাইকোর্ট সেই আইনটিকে সংবিধানের গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী ও অসাংবিধানিক বলে রায় দেন। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় আইনটি আনুষ্ঠানিকভাবে রহিত করা হয়।
বর্তমান সময়ে এই পুরোনো কাঠামুকে নতুন কলেবরে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ দেশের রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজন-এর প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন যে, বর্তমান বাস্তবতায় নতুন করে গ্রাম সরকারের কোনো যৌক্তিকতা বা প্রয়োজন নেই। ক্ষমতার প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ ও জনকল্যাণের পরিবর্তে এই ধরনের সংস্থায় শেষ পর্যন্ত দলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন করা হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি জানান যে, এটি বাস্তবায়িত হলে সুফলের চেয়ে অশুভ ফল বয়ে আসার শঙ্কা অনেক বেশি। অন্যদিকে লেখক ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ এজাজ মনে করেন যে, স্থানীয় সরকারের মূল দর্শন হওয়া উচিত ক্ষমতার সঠিক বিকেন্দ্রীকরণ, যা গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক অগ্রগতিতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে দেশে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ মিলিয়ে ইতিমধ্যেই পাঁচটি স্থানীয় সরকারের স্তর রয়েছে। নতুন করে আরেকটি সমান্তরাল কাঠামো তৈরি না করে বরং বিদ্যমান এই পাঁচটি কাঠামোকে সঠিকভাবে ক্ষমতায়িত ও কার্যকর করাটাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি বলে মনে করেন তিনি। তৃণমূল মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার মহৎ উদ্দেশ্যে প্রস্তাবিত এই গ্রাম সরকার শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক জটিলতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এড়াতে কতটা সফল হয়, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করবে চূড়ান্ত আইনের রূপরেখা এবং জনগণের প্রকৃত মতামতের সঠিক প্রতিফলনের ওপর।
তথ্যসূত্র: যুগান্তর