দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে বাংলাদেশ এখন আর কেবল একটি বর্ধিষ্ণু অর্থনীতির দেশ নয়, বরং এটি এখন ওয়াশিংটন এবং বেইজিংয়ের প্রভাব বিস্তারের অন্যতম প্রধান রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ (Bangladesh First) নীতি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি চুক্তির আহ্বান—এই দুইয়ের চাপে বাংলাদেশের সার্বভৌম কূটনীতি এখন এক ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে।
বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের প্রায় ৭২ শতাংশ আসে চীন থেকে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিসেনসেনের বক্তব্য এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চিঠি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ওয়াশিংটন এখন এই ‘চীনা নির্ভরতা’ ভাঙতে চায়। GSOMIA এবং ACSA-র মতো চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকাকে প্রতিরক্ষা খাতে অংশীদার করার প্রস্তাব মূলত চীনের কৌশলগত প্রভাব কমানোরই একটি অংশ।
অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের করা বাণিজ্য চুক্তির ৪.৩ ধারাটি বাংলাদেশের জন্য এক বড় ‘শুল্ক ফাঁদ’। চীন বা রাশিয়ার মতো ‘নন-মার্কেট ইকোনমি’ দেশের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) করলে ৩৩ শতাংশ শুল্ক পুনরায় আরোপের হুমকি বাংলাদেশকে চীনের বলয় থেকে দূরে রাখার একটি সরাসরি অর্থনৈতিক অস্ত্র।
আপনার বিশ্লেষণে থাইল্যান্ডের উদাহরণটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। থাইল্যান্ডে মার্কিনপন্থী দল সরকার গঠন করতে না পারলেও বাংলাদেশে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। এখানে চীনের সমর্থন এবং বিএনপির ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পলিসি একটি ভারসাম্য তৈরি করেছে। চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের মন্তব্য—“তৃতীয় পক্ষের চাপে সম্পর্ক ক্ষুণ্ন হবে না”—এটি আমেরিকার প্রতি সরাসরি একটি ভূ-রাজনৈতিক বার্তা। চীন চায় জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার আমলের সেই বিশ্বস্ত সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করতে, যেখানে তারা হবে বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান অংশীদার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পাকিস্তানের মতো একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি বজায় রাখা। পাকিস্তান যেমন চীনের সাথে বন্ধুত্ব রেখেও আমেরিকার সাথে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে কাজ করছে, বাংলাদেশকে তেমনই একটি ‘ডাবল ট্র্যাক’ ডিপ্লোম্যাসি গ্রহণ করতে হবে।
আমেরিকার সাথে: তৈরি পোশাক শিল্প টিকিয়ে রাখা এবং শুল্ক সুবিধা পেতে বাণিজ্য চুক্তি বজায় রাখা।
চীনের সাথে: দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী এবং সামরিক সরঞ্জামের প্রধান উৎস হিসেবে সম্পর্ক ছিন্ন না করা।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চিঠিতে প্রতিরক্ষা চুক্তির যে তাগিদ দেওয়া হয়েছে, তা যদি বাস্তবায়ন করা হয়, তবে চীন ও ভারত উভয়েই সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশ কোনো জোটের গুঞ্জন যদি ভারত-বিরোধী হিসেবে দেখা দেয়, তবে বাংলাদেশ এই অঞ্চলে আরও বড় জটিলতায় পড়বে।
আমেরিকার দেওয়া শুল্ক হুঁশিয়ারি এবং চীনের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির অনিশ্চয়তা—এই দুইয়ের মাঝে বাংলাদেশ এখন একটি সরু সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটছে। মার্কিন চুক্তির বেড়াজালে পড়ে চীনের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করা যেমন আত্মঘাতী হবে, তেমনি পশ্চিমা বিশ্বের বিশাল বাজার উপেক্ষা করাও অসম্ভব।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি কেবল তখনই সফল হবে, যখন বাংলাদেশ কোনো এক পক্ষভুক্ত না হয়ে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে দরকষাকষির মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। প্রক্সি ওয়ারের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন স্নায়ুযুদ্ধের এই দাবার বোর্ডে দক্ষ ও নিরপেক্ষ চাল।