• রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১২ অপরাহ্ন
Headline
খুলনায় পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকে গুলি করে হত্যা আখতারুজ্জামানের জামিন নামঞ্জুর, কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেশে বেড়েছে জ্বর-সর্দির রোগী, ঝুঁকিতে শিশুরা বান্দরবানে শুরু জুমের ধান কাটার উৎসব মদিনায় হুথিদের ড্রোন হামলার ঘটনায় বাংলাদেশের নিন্দা পথশিশুরা ভালো একটি জীবনের দাবি রাখে: ডেপুটি স্পিকার দুর্যোগ-সংকটে দ্রুত সহায়তা পৌঁছাতে কাজ করছে সরকার: উপদেষ্টা স্বপন আখতারুজ্জামান শুধু জামায়াতের নন, মেহনতি মানুষের নেতা: জামায়াত আমির সরকারি সফরে অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র গিয়েছেন সেনাপ্রধান ক্রীড়া কার্ড ও ভাতার জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী

জনদুর্ভোগের নতুন নাম অচল এস্কেলেটর: কোটি টাকার চলন্ত সিঁড়ি এখন আবর্জনার ভাগাড়

Reporter Name / ২ Time View
Update : রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬

রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম ও বিপজ্জনক সড়কগুলো নিরাপদে পারাপারের জন্য পথচারীদের প্রধান এবং ক্ষেত্রবিশেষে একমাত্র ভরসা হলো বিভিন্ন মোড়ে নির্মিত ফুটওভার ব্রিজ বা পদচারী-সেতু। নাগরিক জীবনে আধুনিকায়নের ছোঁয়া হিসেবে এবং পারাপারকে আরও সহজতর করতে এসব ব্রিজে সংযোজন করা হয়েছিল অত্যাধুনিক চলন্ত সিঁড়ি বা এস্কেলেটর। বয়স্ক নাগরিক, শিশু, অসুস্থ রোগী এবং শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা মানুষদের স্বস্তি দিতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে এই বৃহৎ প্রকল্পগুলো হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে নাগরিক স্বস্তির বদলে এগুলো এখন নগরবাসীর জন্য চরম ভোগান্তি ও হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্বোধনের কিছুদিন যেতে না যেতেই রক্ষণাবেক্ষণের চরম অভাবে এসব দামি চলন্ত সিঁড়ি বিকল হয়ে পড়ে আছে দিনের পর দিন। মেরামতের কার্যকর কোনো উদ্যোগ না থাকায় কোটি টাকার এসব মূল্যবান যন্ত্রাংশের প্রবেশমুখে এখন বাঁশ ও পুরনো কাঠের তক্তা দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রাখা হয়েছে। অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে থাকা এই অচল সিঁড়ির ধাপগুলো এখন পরিণত হয়েছে ভাসমান মানুষের ব্যবহৃত ময়লা-আবর্জনার স্তূপে। ফলে বাধ্য হয়েই সাধারণ পথচারীদের হাঁপাতে হাঁপাতে উঁচু সাধারণ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হচ্ছে। বিশেষ করে অফিস শুরু এবং ছুটির চরম ব্যস্ত সময়ে যখন হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে এই ব্রিজগুলো ব্যবহার করেন, তখন সেখানে রীতিমতো এক দমবন্ধ করা ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

রাজধানীর অত্যন্ত ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা ফার্মগেট। এখানকার ফুটওভার ব্রিজটির দিকে তাকালেই সরকারি অর্থের নিদারুণ অপচয় এবং কর্তৃপক্ষের চরম অব্যবস্থাপনার একটি করুণ চিত্র খুব সহজেই ফুটে ওঠে। পথচারীদের পারাপার সহজ করতে ২০২৩ সালের ১৫ অক্টোবর প্রায় বিশ কোটি টাকা বিপুল ব্যয়ে এই দৃষ্টিনন্দন ফুটওভার ব্রিজটি অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদ্বোধন করা হয়েছিল। সাধারণ মানুষের বুকভরা আশা ছিল, এর ফলে ফার্মগেট এলাকার দীর্ঘদিনের পারাপার ভোগান্তির চিরতরে অবসান ঘটবে। কিন্তু সেই আশা নিরাশায় পরিণত হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। উদ্বোধনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পার হতে না হতেই কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই চলন্ত সিঁড়িটির প্রবেশমুখ অত্যন্ত দৃষ্টিকটূভাবে বাঁশ দিয়ে আড়াআড়িভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে ওপরের দিকের অংশে একটি পুরনো কাঠের পাটাতন ফিতা ও সুতা দিয়ে রেলিংয়ের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে, যা কোটি টাকার প্রকল্পের সাথে রীতিমতো একটি প্রহসন। সিঁড়ির ধাপগুলোতে জমে আছে পুরু ধুলার আস্তরণ, আর দুই পাশের স্বচ্ছ কাচেও জমেছে ময়লা ও পানের পিকের দাগ। অচল এস্কেলেটরটির ঠিক পাশের সাধারণ সিঁড়ি দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার শিক্ষার্থী, ভারী ব্যাগ কাঁধে চাকরিজীবী ও নারীদের গাদাগাদি করে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে ওঠানামা করতে হচ্ছে।

ঢাকায় চলন্ত সিঁড়িযুক্ত ফুটওভার ব্রিজের ধারণাটি প্রথম বাস্তবায়িত হয়েছিল বনানী সৈনিক ক্লাবসংলগ্ন ব্যস্ত এলাকায়। ক্লিন এয়ার অ্যান্ড সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট প্রজেক্টের অধীনে ২০১৪ সালে এই স্থানে প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে এস্কেলেটর স্থাপন করা হয়, যা পরবর্তীতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কাছে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছিল। কিন্তু এক দশকের মাথায় এসে এই পথচারী সেতুর অবস্থা এখন রীতিমতো ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। সরেজমিনে এই এলাকা পরিদর্শন করে দেখা যায়, এস্কেলেটরের দুই পাশের সুরক্ষাকারী কাচের বড় একটি অংশ ভেঙে পড়ে আছে। ভেতরের অত্যন্ত সংবেদনশীল যান্ত্রিক গিয়ার, চেইন ও মোটরের যন্ত্রাংশগুলো বাইরের ধুলাবালি ও রোদ-বৃষ্টির কাছে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে আছে। স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে, রাতের আঁধারে এর বেশ কিছু মূল্যবান যন্ত্রাংশ চুরিও হয়ে গেছে। এস্কেলেটরের ওপর ও নিচের প্লাটফর্ম এখন যেন ডাস্টবিনে পরিণত হয়েছে। সেখানে যত্রতত্র পড়ে আছে ব্যবহৃত টিস্যু পেপার, ছেঁড়া প্যাকেট, প্লাস্টিকের পানির বোতল এবং সিগারেটের উচ্ছিষ্ট। চলন্ত সিঁড়ি দীর্ঘকাল ধরে বন্ধ থাকায় অনেক বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন। বিশেষ করে যারা হৃদরোগে আক্রান্ত বা যাদের হাঁটুতে তীব্র ব্যথা রয়েছে, তাদের জন্য এই উঁচু সিঁড়ি বেয়ে ওঠা এক প্রকার দুঃসাধ্য কাজে পরিণত হয়েছে।

প্রায় একই রকম করুণ দশা বিরাজ করছে রাজধানীর অন্যতম প্রবেশদ্বার বিমানবন্দর বাসস্ট্যান্ড এলাকার ফুটওভার ব্রিজেও। ২০১৬ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের একান্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও সদিচ্ছায় এই স্থানে এস্কেলেটর স্থাপন করা হয়েছিল। মহাখালী থেকে বিমানবন্দরমুখী এই অত্যন্ত ব্যস্ত ও দ্রুতগতির সড়কে নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া রাস্তা পার হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই দেশি-বিদেশি যাত্রী এবং সাধারণ পথচারীদের জন্য এই ফুটওভার ব্রিজটিই ছিল একমাত্র লাইফলাইন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এই ব্রিজের দুই পাশের এস্কেলেটরই গত চার-পাঁচ বছর ধরে সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণ না করায় এর কাচ ও সুরক্ষাকবচ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। যন্ত্রাংশগুলো উন্মুক্ত হয়ে পড়ায় বৃষ্টিতে ভিজে মরিচা ধরে সেগুলো চিরতরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ভারী লাগেজ বা ট্রলি ব্যাগ নিয়ে বিদেশগামী যাত্রীদের এই অচল সিঁড়ি পার হতে গিয়ে রীতিমতো অমানবিক কষ্টের শিকার হতে হচ্ছে।

প্রগতি সরণির যমুনা ফিউচার পার্ক এলাকার চিত্রটিও খুব একটা ভিন্ন নয়। ২০১৯ সালে মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী নিহত হওয়ার পর ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনের মুখে সেখানে নিরাপদ পারাপারের জন্য একটি আধুনিক ওভারব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২১ সালে ‘আবরার আহমেদ ফুটওভার ব্রিজ’ নামে এস্কেলেটর সংবলিত এই সেতুটির উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু উদ্বোধনের পর থেকেই এটি কখনোই নিয়মিত সচল রাখা সম্ভব হয়নি। বছরের বেশিরভাগ সময়ই এটি মেরামতাধীন বা সম্পূর্ণ বন্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। যে নিরাপদ সড়ক পারাপারের উদ্দেশ্যে এই বিপুল অর্থের বিনিয়োগ, তার মূল লক্ষ্যই এর মাধ্যমে ব্যাহত হচ্ছে।

অবশ্য রাজধানী জুড়ে এই হতাশার চিত্রের মাঝেও ব্যতিক্রম কিছু উদাহরণ রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নিউমার্কেট এলাকায় নির্মিত ফুটওভার ব্রিজের চলন্ত সিঁড়িটি সচল রয়েছে, যদিও স্থানীয় পথচারীরা জানান সেটিও মাঝেমধ্যে কারিগরি ত্রুটির কারণে বিকল হয়ে যায়। এছাড়া গত মাসে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে রামপুরা খালের ওপর নির্মিত আফতাবনগর-বনশ্রী সংযোগকারী নবনির্মিত ওভার ব্রিজের চলন্ত সিঁড়িটি বর্তমানে সঠিকভাবে কাজ করছে। তবে সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে এই দুয়েকটি সচল সিঁড়ি পুরো রাজধানীর ভঙ্গুর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার ব্যর্থতাকে কোনোভাবেই ঢাকতে পারে না।

এই বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থের অপচয় এবং জনসাধারণের ভোগান্তির বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান একটি ভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তার মতে, মূলত মূল্যবান যন্ত্রাংশ চুরির কারণেই রাজধানীর বেশিরভাগ চলন্ত সিঁড়ি আজ অচল হয়ে পড়েছে। তবে তিনি দাবি করেন যে পরিস্থিতি একেবারে পুরোপুরি হতাশাজনক নয়, ইতিমধ্যে বেশ কিছু যন্ত্রাংশ মেরামত করা হয়েছে এবং অন্তত ছয়টি স্থানে চলন্ত সিঁড়ি বর্তমানে সচল রয়েছে। ফার্মগেটের ফুটওভার ব্রিজটির অব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি জানান যে, ওই ব্রিজটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি এবং এটি সম্পূর্ণভাবে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রয়েছে। এছাড়া বিমানবন্দর এলাকার অচল সিঁড়িটি পুরোপুরি সরিয়ে ফেলার একটি পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষের রয়েছে এবং উত্তরার একটি ব্রিজে বয়স্কদের সুবিধার্থে বিকল্প হিসেবে লিফট স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, কোটি টাকার এই প্রকল্পগুলোর ব্যর্থতার শেকড় আরও অনেক গভীরে প্রোথিত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক ডক্টর আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, এ ধরনের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র এবং নাগরিক সমাজ কেউই এখনো মানসিকভাবে ও কাঠামোগতভাবে পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। এ ধরনের সংবেদনশীল মেকানিক্যাল ডিভাইসের জন্য যে ধরনের নিয়মিত তদারকি এবং নষ্ট হলে দ্রুত মেরামতের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন, তা নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিশাল বাজেটের প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। আমাদের দেশের আবহাওয়ায় বাতাসে যে প্রচুর পরিমাণ ধুলাবালি থাকে, তার কারণে এ ধরনের উন্মুক্ত যন্ত্রাংশ খুব দ্রুত অকেজো হয়ে পড়ার তীব্র ঝুঁকি সবসময়ই বিদ্যমান থাকে। তাই বাস্তবমুখী এবং ব্যবহারবান্ধব সাধারণ নকশার দিকে না গিয়ে, শুধুমাত্র বড় বাজেটের কেনাকাটা বা পারচেজ নির্ভর প্রকল্পের দিকেই কর্তৃপক্ষের মাত্রাতিরিক্ত আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। এটি মূলত কোনো টেকসই উন্নয়ন নয়, বরং জনগণের কষ্টার্জিত করের টাকার এক ধরনের চরম অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রথম পাইলট প্রকল্প বনানীতে চরমভাবে ব্যর্থ হওয়ার পরও সেই ঐতিহাসিক ভুল থেকে কোনো ধরনের শিক্ষা গ্রহণ না করে, পুনরায় উত্তরাসহ বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের অকার্যকর প্রকল্প গ্রহণ করাকে তিনি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং হতাশাব্যঞ্জক বলে আখ্যায়িত করেছেন। একটি মেগা প্রজেক্ট কেবল নির্মাণ করেই কর্তৃপক্ষের দায় শেষ হয়ে যায় না, বরং সেটির দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে না পারলে তা শেষ পর্যন্ত জনকল্যাণের বদলে জনদুর্ভোগেরই প্রতীকে পরিণত হয়।

তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category