বিশ্বজুড়ে যখন অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি নিয়ে বিভিন্ন দেশে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে, তখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে সম্পূর্ণ স্বস্তির বার্তা দিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। সরকারের নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো জনগণের সামনে তুলে ধরতে আজ মঙ্গলবার (১৯ মে) রাজধানীর তথ্য অধিদপ্তরে এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এই সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী দেশের জ্বালানি মজুত, বহুল প্রতীক্ষিত মেগাপ্রকল্পের উদ্বোধন, স্বাস্থ্যখাতের সংকট নিরসন এবং স্থবির হয়ে থাকা স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তুলে ধরেন। পুরো সংবাদ সম্মেলন জুড়েই তিনি বর্তমান সরকারের দায়বদ্ধতা এবং জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপগুলোর ওপর জোর দেন।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি জ্বালানি তেলের মজুত ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন তথ্যমন্ত্রী। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়লেও দেশের বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে দেওয়া হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, “বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেলেও দেশের অভ্যন্তরে তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা হয়েছে। আমি দেশবাসীকে সম্পূর্ণ আশ্বস্ত করে বলতে চাই যে, বর্তমানে দেশে চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত পরিমাণ জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। তাই জ্বালানি সংকট বা মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কোনো ধরনের গুজবে কান দেওয়া বা আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।” তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, সরকার ভর্তুকি ও কৌশলগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতকে সচল রাখতে বদ্ধপরিকর।
জ্বালানি খাতের এই স্বস্তিদায়ক খবরের পাশাপাশি দেশের এভিয়েশন খাতের জন্য একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং যুগান্তকারী সুখবর দিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী। দীর্ঘদিন ধরে দেশের মানুষ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছেন। জাইকার অর্থায়নে নির্মিত অত্যাধুনিক এই টার্মিনালটি দেশের আকাশপথে যোগাযোগের চেহারা সম্পূর্ণ পাল্টে দেবে। এই মেগাপ্রকল্পের উদ্বোধনের দিনক্ষণ ঘোষণা করে মন্ত্রী বলেন, “আগামী ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসে বহুল প্রতীক্ষিত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হবে। নির্দিষ্ট সময়সীমাকে লক্ষ্য রেখে বর্তমানে এর যাবতীয় প্রস্তুতি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।” তিনি আরও জানান, এই টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু হলে বছরে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ যাত্রীকে অনায়াসে আন্তর্জাতিক মানের সেবা প্রদান করা সম্ভব হবে, যা দেশের এভিয়েশন ও কার্গো পরিবহনে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।
সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতি এবং বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে খোলামেলা ক্ষোভ প্রকাশ করেন জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি এই স্বাস্থ্য সংকটের জন্য সরাসরি বিগত সরকারের গাফিলতিকে দায়ী করে বলেন, “পূর্ববর্তী সরকারের চরম খামখেয়ালিপনা ও উদাসীনতার কারণে দেশে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, যার বিশাল খেসারত এখন সাধারণ মানুষকে দিতে হচ্ছে। তাদের সময়ে টিকাদান কর্মসূচিতে চরম অবহেলা করা হয়েছিল।” তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বর্তমান সরকারের ত্বরিত পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুততার সাথে পর্যাপ্ত হামের টিকা সংগ্রহ করেছে এবং দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করেছে।”
দেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একটি কাঠামোগত সংস্কার আনা এবং চিকিৎসাসেবা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে সরকারের একটি নতুন স্বপ্নের কথাও সংবাদ সম্মেলনে জানান তথ্যমন্ত্রী। উন্নত বিশ্বের আদলে দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্যগত তথ্য একটি ডিজিটাল ডেটাবেজে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “জনগণের সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বা ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ নিশ্চিত করতে শিগগিরই দেশব্যাপী ‘হেলথ কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে।” এই কার্ডের মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ অত্যন্ত সহজে সরকারি হাসপাতালগুলো থেকে চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ লাভ করতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে বিপাকে পড়া নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনতে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর হালনাগাদ তথ্যও প্রদান করেন জহির উদ্দিন স্বপন। ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কার্যক্রমকে আরও সম্প্রসারিত করার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ৫৩ হাজার ৯৬টি পরিবারকে নতুন করে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হয়েছে।” এর মাধ্যমে এই পরিবারগুলো নিয়মিতভাবে বাজারদরের চেয়ে অনেক কম দামে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী কিনতে পারছেন, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিচ্ছে।
পরিশেষে, দেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভিত মজবুত করার বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট রাজনৈতিক পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তথ্যমন্ত্রী। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং অন্যান্য কাঠামোগত সংস্কারের কারণে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং পৌরসভার মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির হয়ে আছে। জনপ্রতিনিধি না থাকায় তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষ যে কাঙ্ক্ষিত নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তা সরকার গভীরভাবে উপলব্ধি করছে। এই সংকট নিরসনে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করে মন্ত্রী বলেন, “আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের সব স্থবির হয়ে থাকা স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে সরকার অত্যন্ত নিবিড়ভাবে কাজ করছে।” এই নির্বাচনগুলো সম্পন্ন হলে তৃণমূল পর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে এবং থমকে থাকা গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে পুনরায় গতি ফিরে আসবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।