দেশজুড়ে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নানামুখী সাইবার অপরাধ। ডিজিটাল সেবার আড়ালে পাতা হচ্ছে অভিনব সব প্রতারণার ফাঁদ, যার ভয়ংকর শিকারে পরিণত হচ্ছে দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী। পুলিশ সদর দপ্তর ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক তদন্তে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। দেশে সংঘটিত মোট সাইবার অপরাধের শিকারদের মধ্যে প্রায় ৯৭ শতাংশই নারী ও শিশু, যার মধ্যে মূল লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে উঠতি বয়সী কিশোরী ও তরুণীদের। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, দেশের প্রতি পাঁচজন কিশোরী ও তরুণীর মধ্যে অন্তত তিনজনই কোনো না কোনোভাবে অনলাইন বুলিং বা সাইবার সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। তবে সামাজিক লোকলজ্জা ও কলঙ্কের ভয়ে ভুক্তভোগীদের প্রায় ৮৯ শতাংশই কোনো আইনি অভিযোগ দায়ের করেন না। আবার যারা সাহস করে অভিযোগ বা মামলা করছেন, তাদের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত ও ডিজিটাল প্রমাণের অভাবে প্রায় ৭২ শতাংশ মামলাই শেষ পর্যন্ত নিষ্পত্তিহীন অবস্থায় ঝুলে থাকছে অথবা পুরোপুরি খারিজ হয়ে যাচ্ছে।
নারীদের লক্ষ্যবস্তু করার পাশাপাশি ব্যাংক সংক্রান্ত আর্থিক তথ্য হাতিয়ে নিয়ে অর্থ চুরির মতো মারাত্মক অপরাধে ব্যাপকভাবে সক্রিয় রয়েছে সাইবার অপরাধী চক্রগুলো। অতি সম্প্রতি দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এমনই একটি সংঘবদ্ধ চক্রকে শনাক্ত করেছে। এই চক্রের সদস্যরা সরকারের একজন শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তার নাম, ভুয়া পরিচয় ও পদবি ব্যবহার করে তার নিকটজন ও সহকর্মীদের কাছ থেকে মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। এমনকি এক স্বজনের কাছ থেকে তারা ইতিমধ্যে প্রতারণা করে পঞ্চাশ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি দেশজুড়ে সড়কে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক মামলা চালুর সুযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষের মোবাইলে বিআরটিএ-র নামে ভুয়া মেসেজ পাঠানো হচ্ছে। সেখানে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের দায়ে জরিমানার ভয় দেখিয়ে এবং বিলম্ব ফির হুমকি দিয়ে একটি ভুয়া ওয়েবসাইটের লিংক জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। এমন ফাঁদে পা দিয়ে অতি সম্প্রতি জিয়্যারত ইসলাম নামের এক চিকিৎসক তার ক্রেডিট কার্ডের তথ্য দেওয়ামাত্রই তার অ্যাকাউন্ট থেকে মুহূর্তের মধ্যে এক লাখ টাকা গায়েব হয়ে যায়।
আর্থিক খাতের এই বড় সংকটের পাশাপাশি দেশে অনলাইন জুয়া ও ফিশিংয়ের মতো অপরাধ এখন এক ভয়াবহ ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশ বা ডিবি সূত্র জানিয়েছে, একাধিক আন্তর্জাতিক চক্রের সহায়তায় দেশীয় অপরাধীরা বিভিন্ন জুয়ার ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ পরিচালনা করছে। এসব অবৈধ প্ল্যাটফর্মে লেনদেন সম্পন্ন করার জন্য তারা মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস-এর সাধারণ ও এজেন্ট অ্যাকাউন্টগুলোকে ব্যবহার করছে। ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ দীর্ঘ দেড় বছর ধরে তদন্ত চালিয়ে সম্প্রতি এমন একটি সংঘবদ্ধ চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের কাছ থেকে বিকাশ ও রকেটসহ বিভিন্ন সেবার প্রায় সাড়ে ছয় হাজারেরও বেশি সচল সিমকার্ড, বিপুল পরিমাণ মোবাইল ডিভাইস এবং ল্যাপটপ জব্দ করা হয়েছে। তদন্তে জানা গেছে, এই জুয়ার সাইটগুলোর মাধ্যমে প্রতিদিন দেশ থেকে প্রায় হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ অবৈধভাবে লেনদেন ও পাচার করা হচ্ছে।
পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, মোবাইল ব্যাংকিং ও ইন্টারনেট প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ যেমন মানুষের জীবন সহজ করেছে, ঠিক তেমনি অপরাধীদের জন্য অর্থ আত্মসাতের এক নতুন চারণভূমি তৈরি করেছে। এছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের আপত্তিকর পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট ছড়ানো, সাইট হ্যাক করে ব্ল্যাকমেইল করা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিগত পাঁচ বছরের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে তথ্য ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, আইসিটি আইন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে প্রায় পাঁচ হাজার মামলা দায়ের করা হলেও, এতদিন পুলিশের পৃথক কোনো বিশেষায়িত সাইবার ইউনিট না থাকায় এসব স্পর্শকাতর মামলার সঠিক তদন্ত ও নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়নি।
এই ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল অপরাধের কঠোর প্রবণতা মোকাবিলা এবং অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করতে সরকার অবশেষে একটি সম্পূর্ণ পৃথক ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’ গঠনের আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে এই সংক্রান্ত একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা পেশ করার পর সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এর নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সাথে সরকারের নীতি নির্ধারক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সাইবার অপরাধীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বা কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচারকারী ও ডিজিটাল জালিয়াতির সাথে জড়িত প্রতিটি চক্রকে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করে দেশের প্রচলিত আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জোরালো আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির এই বিপজ্জনক অপব্যবহার রোধে শুধু আইনি কঠোরতাই নয়, বরং সাধারণ নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি করাও এখন সময়ের দাবি।
তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ