দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকার বিষয়ে সরকারের বারবার আশ্বাসের পরেও রাজধানীর বাস্তবে দেখা দিয়েছে ভিন্ন চিত্র। ফিলিং স্টেশনগুলোতে চাহিদামতো ডিজেল না মেলায় চরম বিপাকে পড়েছেন গণপরিবহন চালকরা। রেশনিং পদ্ধতির দোহাই দিয়ে পাম্পগুলো প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য তেল সরবরাহ করায় ঢাকার রাস্তায় বাসের ট্রিপ সংখ্যা কমিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা করছেন মালিকরা, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ যাত্রীদের ওপর।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, লোকাল বাসের জন্য দিনে ৭০–৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাসের জন্য ২০০ থেকে ২২০ লিটার ডিজেল বরাদ্দের নিয়ম থাকলেও রোববার রাজধানীর চিত্র ছিল উল্টো। সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ লোকাল বাস মাত্র ২০–২৫ লিটার এবং দূরপাল্লার বাসগুলো মাত্র ৪০–৫০ লিটারের বেশি ডিজেল সংগ্রহ করতে পারছে না।
গুলিস্তান-গাজীপুর রুটের বাসচালক আল আমিন বলেন, “আমার দরকার ছিল ৫০ লিটার, কিন্তু পাম্প থেকে ২০ লিটারের বেশি দেয়নি। তেল কম পাওয়ায় এখন বাধ্য হয়ে ট্রিপ সংখ্যা কমিয়ে দিতে হচ্ছে।” একই অভিযোগ প্রভাতী বনশ্রী ও এয়ারপোর্ট পরিবহনের চালকদেরও। তাদের মতে, ১২০ লিটার ধারণক্ষমতার ট্যাঙ্ক নিয়ে বারবার পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়েও চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ তেলও মিলছে না।
রাজধানীর মহাখালী, খিলক্ষেত ও উত্তরা এলাকার অনেক ফিলিং স্টেশনে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা গেছে। বিমানবন্দর সড়কের ডিএল ফিলিং স্টেশন ও খিলক্ষেতের ইসরাইল তালুকদার ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সব ধরনের জ্বালানি বিক্রি বন্ধ রয়েছে। পাম্প কর্মীদের দাবি, শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটি থাকায় তেলের গাড়ি আসেনি, ফলে মজুত শেষ হয়ে গেছে। প্রোগ্রেসিভ ফিলিং স্টেশনের কর্মী আব্দুল্লাহ জানান, তাদের স্টকের পরিমাণ সীমিত হওয়ায় সবাইকে অল্প করে তেল দিয়ে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।
জ্বালানি তেলের এই অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশে ডিজেলের কোনো সংকট নেই। অর্ডার করা ১৪টি কার্গোর অধিকাংশ ইতিমধ্যে দেশে পৌঁছেছে এবং আগামীকাল (৯ মার্চ) আরও নতুন কার্গো আসার কথা রয়েছে। বিপিসি’র এক কর্মকর্তা জানান, এপ্রিল পর্যন্ত ডিজেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা আছে, তাই আসন্ন ঈদ ঘিরে কোনো সংকটের সম্ভাবনা নেই।
শনিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুও জনগণকে আশ্বস্ত করেছেন। তিনি বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সাময়িক সমস্যা ও মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে, তাই আমরা সতর্কতামূলক রেশনিং চালু করেছি। তবে ভয়ের কিছু নেই, কাল-পরশু আরও দুটি জাহাজ বন্দরে ভিড়লে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।”
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সোমবার থেকে রাজধানীর রাস্তায় বাসের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যেতে পারে। একদিকে রমজান ও ঈদের প্রস্তুতি, অন্যদিকে তেলের অভাবে ট্রিপ কমে যাওয়া—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াত খরচ ও ভোগান্তি উভয়ই বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।