বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে উত্তেজনাকর এবং ভীতিকর ইস্যু হলো ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত। কিন্তু রণাঙ্গনে যতটা গোলাগুলি চলছে, তার চেয়ে বেশি ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে। পশ্চিমা এবং মধ্যপ্রাচ্যের গণমাধ্যমগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে সাধারণ পাঠক আজ বিভ্রান্ত। এক পক্ষ বলছে তারা বিজয়ী, অন্য পক্ষ বলছে তারা গুঁড়িয়ে দিচ্ছে শত্রুর ঘাঁটি।
এই চরম পক্ষপাতিত্বমূলক সংবাদের ভিড়ে সাধারণ মানুষের মনে একটিই প্রশ্ন—আসলে ঘটছেটা কী?
পশ্চিমা গণমাধ্যমের চশমায় যুদ্ধ: ‘আত্মরক্ষা ও আগ্রাসন দমন’
সিএনএন, ফক্স নিউজ, বিবিসি, নিউইয়র্ক টাইমস বা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতো পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যমগুলো মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বয়ান (Narrative) প্রচার করছে। তাদের খবরে যে বিষয়গুলো প্রাধান্য পাচ্ছে:
ইরানকে খলনায়ক বানানো: ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতার মূল কারণ এবং ‘সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
ক্ষয়ক্ষতি আড়াল করা: মার্কিন ঘাঁটি বা সম্পদে হামলার খবরগুলো শুরুতে চেপে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। যেমন, সৌদিতে ৫টি মার্কিন বিমান বিধ্বস্ত হলেও দাবি করা হচ্ছে—”এগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি, মেরামতযোগ্য এবং কেউ মারা যায়নি।”
আত্মরক্ষার অধিকার: ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলাগুলোকে (যেমন- অপারেশন রোয়ারিং লায়ন বা এপিক ফিউরি) ‘আত্মরক্ষা’ এবং ‘সন্ত্রাসবাদ দমনের অপরিহার্য পদক্ষেপ’ হিসেবে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানি গণমাধ্যমের বয়ান: ‘প্রতিরোধ ও সাম্রাজ্যবাদ পতন’
অন্যদিকে ইরানের প্রেস টিভি, ইরনা (IRNA), ফারস নিউজ এবং কাতারভিত্তিক আল-জাজিরার মতো সংবাদমাধ্যমগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে:
প্রতিরোধের বীরত্ব: এই সংবাদমাধ্যমগুলো ইরানকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ‘একমাত্র লড়াকু প্রতিরোধকারী’ হিসেবে উপস্থাপন করছে।
শত্রুর ক্ষতি অতিরঞ্জিত করা: মার্কিন সেনাঘাঁটিগুলোতে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। অনেক সময় যুক্তরাষ্ট্রের সামান্য ক্ষতিকেও বিশাল সামরিক বিজয় হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
জনমতের আবেগ: গাজা বা লেবাননের ইস্যুকে সামনে রেখে মুসলিম বিশ্বের আবেগ কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে।
দুই মেরুর প্রোপাগান্ডার আড়ালে আসল সত্যটা কী?
স্বাধীন সামরিক বিশ্লেষক এবং ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স (OSINT)-এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে এই দুই মেরুর মাঝামাঝি একটি বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়:
উভয় পক্ষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি: যুদ্ধ একতরফা হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও বিমান হামলা ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করছে। অন্যদিকে, ইরানের তৈরি সস্তা কিন্তু কার্যকর সুইসাইড ড্রোন ও ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন ও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেদ করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হচ্ছে।
কৌশলগত স্নায়ুযুদ্ধ: কেউই পুরোপুরি সর্বাত্মক যুদ্ধে (Total War) জড়াতে চাইছে না, কারণ এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। এটি মূলত একটি ‘ওয়ার অব অ্যাট্রিশন’ বা একে অপরের স্নায়ু ও সম্পদ ক্ষয়ের যুদ্ধ।
রাশিয়ার ছায়াযুদ্ধ: মার্কিন পেন্টাগনের দাবি অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধের পাল্টা জবাব দিতে রাশিয়া আড়াল থেকে ইরানকে স্যাটেলাইট ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।
মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Psychological Warfare): উভয় পক্ষই নিজেদের দেশের জনগণের মনোবল চাঙ্গা রাখতে এবং আন্তর্জাতিক মিত্রদের সমর্থন ধরে রাখতে নিজেদের ব্যর্থতা লুকাচ্ছে এবং সফলতাকে বড় করে দেখাচ্ছে।
পাঠকের বিভ্রান্তি ও এই গোলকধাঁধা থেকে মুক্তির উপায়
মিডিয়ার এই মেরুকরণের কারণে সাধারণ পাঠক এখন ‘ফগ অব ওয়ার’ বা যুদ্ধের ধোঁয়াশায় বন্দী। এ অবস্থা থেকে বাঁচতে কোনো একটি নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যমের ওপর নির্ভর করা বোকামি। পশ্চিমা খবরের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের খবরও পড়তে হবে, এবং নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক থিংক-ট্যাংক বা স্বাধীন সামরিক পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণের সাথে মিলিয়ে তবেই সিদ্ধান্তে আসতে হবে।
সবচেয়ে বড় সত্য হলো, যুদ্ধে প্রথম মৃত্যু ঘটে ‘সত্যের’। আর এই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে গণমাধ্যমগুলো সেই সত্য গোপনের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।