রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে গলাকেটে হত্যার চাঞ্চল্যকর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেছেন প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার। বুধবার (৩ জুন) বেলা ১১টা ১০ মিনিটে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। দুই আসামির বক্তব্য রেকর্ড করার পর আদালত এই মামলায় চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেছেন।
শুনানির শুরুতে কাশিমপুর ও কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে দুই আসামিকে কড়া নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করা হয়। বিচারক পূর্বে গ্রহণ করা সাক্ষীদের জবানবন্দি পড়ে শোনানোর পর আসামি সোহেল রানার কাছে তার নিজস্ব কোনো বক্তব্য আছে কি না, তা জানতে চান। এ সময় সোহেল আদালতকে বলেন যে তিনি নির্দোষ এবং তিনি বেকসুর খালাস চান। নিজের একটি সন্তান আছে উল্লেখ করে তিনি আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, ঘটনার সময় তার সাথে ‘ডলার’ নামের আরেকজন ব্যক্তি ছিল যাকে কেউ দেখেনি। তিনি আদালতকে ওই ব্যক্তিকে ধরার অনুরোধ করেন এবং নিজের পাপের শাস্তি মাথা পেতে নেওয়ার কথা বললেও তার স্ত্রী সম্পূর্ণ নির্দোষ বলে দাবি করেন। এ পর্যায়ে বিচারক তাকে থামিয়ে দিয়ে শুধুমাত্র নিজের বিষয়ে কথা বলার নির্দেশ দেন।
এরপর আদালত আসামি স্বপ্না আক্তারের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনিও নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ বলে দাবি করেন। এ সময় বিচারক তাকে প্রশ্ন করেন যে, ঘটনার দিন ভেতর থেকে কেন দরজা খোলা হয়নি—এর কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা তার কাছে আছে কি না। বিচারক স্বপ্নাকে সতর্ক করে বলেন, তার স্বামীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হলে একই অপরাধের শাস্তি তারও হতে পারে। এরপরও স্বপ্না পুনরায় নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন যে তিনি এর কিছুই করেননি।
এর আগে মঙ্গলবার এই মামলায় চার্জশিটভুক্ত ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের জবানবন্দি রেকর্ড করে সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ করেন আদালত। মামলার বাদী ও নিহত শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার জবানবন্দির মাধ্যমে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছিল। এরপর পর্যায়ক্রমে রামিসার মা পারভীন আক্তার, বড় বোন, অন্যান্য আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং মামলার সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রস্তুতকারী চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করেন। রাষ্ট্র নিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী তাদের জেরা করেন এবং এরপর আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য বুধবার দিন ধার্য করা হয়েছিল।
আদালত ও মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, নিহত রামিসা পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকালে সে বাসা থেকে বের হওয়ার পর স্বপ্না তাকে কৌশলে নিজেদের রুমে নিয়ে যান। দীর্ঘক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার মা আসামির রুমের সামনে তার জুতা দেখতে পান। ডাকাডাকির পর ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে অন্যান্যদের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে আসামির শয়নকক্ষের মেঝেতে শিশুটির মস্তকবিহীন দেহ এবং একটি বড় বালতির ভেতর তার কাটা মাথা পাওয়া যায়। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে স্বপ্নাকে আটক করে এবং পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় গত ২০ মে ভিকটিমের বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন।