গোপনীয়তার নিশ্ছিদ্র প্রাচীর ভেঙে বিশ্বজুড়ে কর ফাঁকি ও অবৈধ অর্থ পাচার রোধে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলো থেকে নিজ দেশের নাগরিকদের গোপন সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করছে ভারত ও পাকিস্তানসহ পৃথিবীর শতাধিক দেশ। আন্তর্জাতিক এই ডেটা বা তথ্য ব্যবহার করে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের অবৈধ পুঁজি ও অর্থ পাচার বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। তবে এই বৈশ্বিক স্বচ্ছতার দৌড়ে এখনো অন্ধকারে এবং অনেক পেছনে পড়ে রয়েছে বাংলাদেশ। যার প্রত্যক্ষ খেসারত হিসেবে দেশ থেকে অর্থ পাচারের গ্রাফ প্রতিনিয়ত ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ বার্ষিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমাকৃত অর্থের পরিমাণ অবিশ্বাস্যভাবে ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা।
আর্থিক গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, সুইস ব্যাংক থেকে বিশ্বের দেশগুলো মূলত দুটি কার্যকরী পদ্ধতিতে পাচারকৃত অর্থের সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করছে। প্রথমত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ক্ষমতাশালী দেশগুলো সুইজারল্যান্ডের সাথে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করে তাদের নাগরিকদের হিসাবের বিবরণী নিয়ে নিচ্ছে। আর যাদের সাথে সরাসরি এমন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নেই, তারা অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা ‘ওইসিডি’র (OECD) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য পাচ্ছে। এই দুই বিশ্বস্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ সুইস ব্যাংক থেকে প্রায় ৩৬ লাখ গোপন অ্যাকাউন্টের তথ্য হাতিয়ে নিয়েছে। তবে দুঃখজনক বাস্তবতায় বাংলাদেশ এই দুটি কার্যকর ব্যবস্থার কোনোটির সাথেই যুক্ত হতে পারেনি। যার ফলে একদিকে যেমন অর্থ পাচারকারীদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে না, অন্যদিকে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের পাহাড় বড় হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার সুইস কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশিত সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন বা রিপোর্টে এক অত্যন্ত চোখধাঁধানো বৈপরীত্যের চিত্র দেখা গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক কড়াকড়ি ও তথ্য আদান-প্রদানের ফলে সুইস ব্যাংকগুলোতে সামগ্রিকভাবে মোট আমানতের স্থিতি ধারাবাহিকভাবে কমছে। যেসব দেশ সুইজারল্যান্ড থেকে নিয়মিত তথ্য পাচ্ছে, ওইসব দেশের নাগরিকদের জমানো অর্থের পরিমাণ প্রতি বছর হ্রাস পাচ্ছে। কিন্তু ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশসহ অন্ধকারে থাকা তৃতীয় বিশ্বের কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে, যেখানে তথ্য পাওয়ার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় পাচারকারীরা সুইস ব্যাংককে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল মনে করছে।
প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায়, ২০২৫ সাল শেষে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের মোট আমানতের স্থিতি এসে ঠেকেছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্র্যাংকে। প্রতি ফ্র্যাংক ১৫২ টাকা হিসেবে বাংলাদেশি স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা। অথচ এর আগের বছরও এই আমানতের পরিমাণ ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা কম ছিল। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সুইস ব্যাংকে আমানত জমার দিক থেকে ভারতের পরেই এখন বাংলাদেশের অবস্থান। অথচ এই একই সময়ে বিশ্বজুড়ে সুইস ব্যাংকের মোট আমানত ২০২১ সালের ১ লাখ ৪০ হাজার ৭৪৭ কোটি ফ্র্যাংক থেকে ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৫ সালে মাত্র ৮৯ হাজার ৬৩৮ কোটি ফ্র্যাংকে নেমে এসেছে। অর্থাৎ বিশ্ব যখন সুইস ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে, বাংলাদেশিরা তখন সেখানে নতুন করে টাকার পাহাড় গড়ছে।
সুইস ব্যাংক থেকে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করছে প্যারিসভিত্তিক আন্তর্জাতিক নীতি-নির্ধারণী সংস্থা ওআইসিডি। ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থার ৩৮টি স্থায়ী সদস্য দেশ খুব সহজেই তাদের নাগরিকদের কর ফাঁকির তথ্য পেয়ে যায়। এর বাইরে আরও ৬৩টি দেশ ওইসিডির আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ‘কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড’ (সিআরএস) এবং ‘অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অব ইনফরমেশন’ (এইওআই) কাঠামো সফলভাবে অনুসরণ করে সুইস ব্যাংক থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য নিচ্ছে। এই তালিকায় বিশ্বের ১০১টি দেশের মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো থাকলেও বাংলাদেশ এখনো এই তালিকায় নাম লেখাতে পারেনি।
এই বিষয়ে ‘বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ)’ প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন জানান, সুইজারল্যান্ডের সাথে বাংলাদেশের কোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নেই। আর আন্তর্জাতিক আয়কর সংক্রান্ত স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময়ের ফোরাম ওইসিডির সিআরএস কাঠামোর সদস্যপদ পাওয়ার পুরো বিষয়টি দেখছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কেন এখনো বাংলাদেশ এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার সদস্য হতে পারল না বা এর বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসরণ করতে পারছে না, তার জবাব এনবিআর-ই ভালো দিতে পারবে। তবে আশার কথা হলো, দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর ৭৪ নম্বর অনুচ্ছেদে দেশে-বিদেশে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এই ‘কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড’ (সিআরএস) অনুসরণ করার এবং তা বাস্তবায়নে সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে সমস্ত রাজনৈতিক দল নীতিগতভাবে একমত হয়েছে।
সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড বা সিআরএস ফলো করার কারণে এশিয়ার অন্য দেশগুলোর আমানত কীভাবে কমছে। যেমন, ২০২১ সালে সুইস ব্যাংকে পাকিস্তানের নাগরিকদের আমানত ছিল ৭০ কোটি ফ্র্যাংক, যা কঠোর নজরদারি ও তথ্য পাওয়ার কারণে ২০২৫ সালে এসে মাত্র ২৩ কোটি ফ্র্যাংকে নেমে এসেছে। একইভাবে, ভারতের নাগরিকদের আমানতও ২০২৪ সালের ৩৫০ কোটি ফ্র্যাংক থেকে কমে ২০২৫ সালে ৩২৩ কোটি ফ্র্যাংকে নেমেছে। উন্নত দেশ যুক্তরাজ্যের আমানতও ২০২১ সালের ৩৭ হাজার ৫২০ কোটি ফ্র্যাংক থেকে কমে ২০২৫ সালে ১৮ হাজার ৩৯০ কোটিতে ঠেকেছে। প্রতিবেশী দেশগুলো যখন তাদের পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনছে বা নতুন করে পাচার হওয়া ঠেকাতে পারছে, তখন বাংলাদেশ আইনি ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা হারানোর এক অন্তহীন বৃত্তে বন্দি হয়ে রয়েছে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য এক বিরাট সতর্কসংকেত।
তথ্যসূত্র: যুগান্তর