• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২২ অপরাহ্ন
Headline
এনসিটিবির উপসচিব-সদস্যসহ আরও ৪ কর্মকর্তাকে বদলি তাহসিফের মৃত্যুতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতি রয়েছে: জামায়াত সশস্ত্র বাহিনী বোর্ডের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন ফি ১৬৮ টাকা রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ শুরু খাদ্যশস্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতে টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে: খাদ্যমন্ত্রী মানবতাবিরোধী অপরাধে হানিফের মৃত্যুদণ্ড, অপর তিন আসামির আমৃত্যু কারাদণ্ড চার বছরে ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষক কার্ড দেবে সরকার জাপানে টয়োটার মোতোমাচি কারখানা পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী কারিগরি ত্রুটিতে টোকিও থেকে ঢাকাগামী প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে বিলম্ব বিচার ব্যবস্থাকে মানুষের আস্থার জায়গায় আরও সুদৃঢ় করতে চাই: আইনমন্ত্রী

তামাক খাত থেকে রাজস্ব আয় এক লাফে ১৭% বৃদ্ধি

Reporter Name / ২ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান দেশের তামাক ও সিগারেট খাতের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতিতে এক নতুন ও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে | অর্থনৈতিক নানা প্রতিকূলতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যেও তামাকজাত পণ্য থেকে সরকারের রাজস্ব আয় এক লাফে ১৭ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে | পূর্ববর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সিগারেট খাত থেকে এনবিআরের মোট রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ যেখানে ৪০ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ ছিল, সর্বশেষ ২০২৫-২০ অর্থবছরে তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৪৭ হাজার ৫২৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে | কর আদায়ের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা বাহ্যিকভাবে সরকারি কোষাগারকে সমৃদ্ধ করলেও এর নেপথ্য কারণ, বাজার কাঠামোর পরিবর্তন এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে দেশের অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে |

সিগারেট বিক্রির ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর আদায়ের সুবিধার্থে দীর্ঘকাল ধরে বাজারটিকে মূলত চারটি ভিন্ন স্তরে বা শ্রেণিতে বিভক্ত করে রেখেছে, যার মধ্যে রয়েছে প্রিমিয়াম বা সর্বোচ্চ মূল্য, উচ্চ, মধ্যম এবং নিম্নস্তর | সর্বশেষ অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের খাতভিত্তিক উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এই চার স্তরের মধ্যে নিম্নস্তর বাদে বাকি তিনটি স্তরেই রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ঘটেছে | এর মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যের বা প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেট থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৭ হাজার ১০৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে | অন্যদিকে, তিন শতাংশ প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে উচ্চ স্তরের সিগারেট থেকে আহরিত রাজস্বের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৭ কোটি টাকায় | তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর ও বড় ধরনের লাফ দেখা গেছে মধ্যম স্তরের সিগারেটের ক্ষেত্রে, যেখান থেকে রাজস্ব আদায় এক লাফে ৫৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২২ হাজার ১২২ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে | এর বিপরীতে, নিম্নস্তরের সিগারেট থেকে সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ আগের অর্থবছরের তুলনায় ১২ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১৬ হাজার ২৪৮ কোটি টাকায় নেমে এসেছে |

মধ্যম স্তরের সিগারেটের রাজস্ব আহরণে এই অস্বাভাবিক ও ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিকে দেশের পরিবর্তিত আর্থসামাজিক পরিস্থিতি ও ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার পরিবর্তনের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করছে এনবিআর | সংস্থাটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে যে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ধূমপান অভ্যাসেও | উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেটের নিয়মিত এবং বনেদি ভোক্তারা তাদের নিজস্ব বাজেট সংকোচন নীতির অংশ হিসেবে অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী বা কম দামি ‘মধ্যম স্তরে’ নেমে আসতে বাধ্য হয়েছেন | একই সঙ্গে, নিম্নস্তরের কিছু ভোক্তা সামান্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে নিজেদের সামাজিক বা মানসম্মত অবস্থান বজায় রাখতে মধ্যম স্তরের সিগারেটের দিকে ঝুঁকেছেন | এই দুইমুখী ভোক্তা প্রবাহের কারণে মধ্যম স্তরের সামগ্রিক বিক্রি ও বাজারের পরিধি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার প্রত্যক্ষ সুফল হিসেবে সরকারি কোষাগারে রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব জমা হয়েছে |

কর ফাঁকি রোধ এবং প্রশাসনিক তদারকির ক্ষেত্রেও মধ্যম স্তরের বাজারটি কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে | নিম্নস্তরের সস্তা ব্র্যান্ডগুলোর ক্ষেত্রে প্রায়ই জাল ব্যান্ডরোল বা নকল স্ট্যাম্প ব্যবহারের মাধ্যমে বড় ধরনের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অবৈধ প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, যা সরকারের রাজস্ব আহরণের পথে একটি বড় অন্তরায় | কিন্তু এর বিপরীতে, মধ্যম স্তরের সিগারেটগুলো সাধারণত দেশের বড় ও সুপ্রতিষ্ঠিত শিল্প গ্রুপ এবং শীর্ষস্থানীয় তামাক কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে উৎপাদিত ও বাজারজাত করা হয় | ফলে এই নির্দিষ্ট খাতটিতে এনবিআরের নিবিড় তদারকি ও নজরদারি বজায় রাখা অনেক বেশি সহজ হয়, যার ফলে প্রকৃত বিক্রির প্রায় শতভাগ রাজস্ব সঠিকভাবে কোষাগারে জমা হতে বাধ্য হয় | যদিও বাজারে কোন স্তরে কী পরিমাণ সিগারেট উৎপাদিত বা বিক্রি হচ্ছে তা তাৎক্ষণিকভাবে বা রিয়েল টাইমে নিখুঁতভাবে গণনার জন্য কোনো ডিজিটাল ট্র্যাকিং প্রযুক্তি এখনো পুরোপুরি চালু করা যায়নি, তবুও এনবিআর খুব দ্রুত ডিজিটাল ব্যবস্থা বাস্তবায়নের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে |

তবে তামাকবিরোধী গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা এই রাজস্ব বৃদ্ধির পেছনের কৌশলটিকে তামাক কোম্পানিগুলোর একটি সুদূরপ্রসারী ও মুনাফাকেন্দ্রীভূত কৌশল বলে অভিহিত করেছেন | বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল যে সিগারেটের এই চার স্তরবিশিষ্ট জটিল কর কাঠামো বাতিল করে তা কমিয়ে এক বা দুই স্তরে নামিয়ে আনা হোক | কিন্তু কোম্পানিগুলো সেই সুপারিশ বাস্তবায়নের বিপরীতে নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার্থে একটি বিকল্প কৌশল বা ট্যাকটিক্যাল গেম শুরু করেছে | ‘ওয়ার্ক ফর আ বেটার বাংলাদেশ (ডাব্লিউবিবি) ট্রাস্ট’-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, কোম্পানিগুলো খুব সুকৌশলে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেটের মধ্যকার দামের ব্যবধান কমিয়ে এনেছে | বর্তমানে বাজারে নিম্নস্তরের একটি সিগারেটের গড় দাম যেখানে প্রায় ৮ টাকা, সেখানে মধ্যম স্তরের দাম মাত্র ১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, অথচ উচ্চ স্তরে পৌঁছাতে হলে ভোক্তাকে ১৭ থেকে ১৮ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয় |

দামের এই সামান্য ব্যবধানের কারণে একজন ধূমপায়ীর পক্ষে ৮ টাকার সিগারেট ছেড়ে ১০ টাকার মধ্যম স্তরের সিগারেটে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা অত্যন্ত সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে | পূর্বে তামাক কোম্পানিগুলোর এমন প্রবণতা ছিল না, কারণ নিম্নস্তরে করের বা সম্পূরক শুল্কের বোঝা তুলনামূলক কম ছিল, যা পরবর্তীতে বাড়িয়ে ৫৭ শতাংশ থেকে ৬৭ শতাংশে উন্নীত করা হয় | সম্পূরক শুল্কের হার বৃদ্ধির ফলে যখন কোম্পানিগুলো দেখল যে নিম্নস্তরে তাদের কাঙ্ক্ষিত মুনাফা কমে যাচ্ছে, তখনই তারা ভোক্তাদের কৌশলে মধ্যম স্তরের দিকে ঠেলে দেওয়ার এই অভিনব বাণিজ্য কৌশল গ্রহণ করে | ফলে অতীতে যেখানে মধ্যম স্তরের ভোক্তা বা বাজার অংশীদারিত্ব অত্যন্ত সীমিত ছিল, আজ তা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত মুনাফা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এনবিআরকেও বেশি রাজস্ব দিতে বাধ্য হচ্ছে |

অন্যদিকে, তামাকবিরোধী গবেষণা ও ক্যাম্পেইন পরিচালনাকারী সংস্থা প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, সিগারেটের দাম বা স্তর যাই হোক না কেন, জনস্বাস্থ্যের ওপর এর ধ্বংসাত্মক প্রভাব সর্বত্রই সমান | বৈজ্ঞানিকভাবে এটি প্রমাণিত যে প্রিমিয়াম হোক কিংবা সস্তা নিম্নস্তরের সিগারেট—তামাকের কোনো নিরাপদ মাত্রা বা সেফ জোন থাকতে পারে না | বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের মুখে বহু মানুষ যখন দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছেন, তখন কম দামি বা সাশ্রয়ী মূল্যের সিগারেট সমাজের বিপন্ন জনগোষ্ঠী এবং উঠতি বয়সের তরুণ প্রজন্মকে খুব সহজেই নেশার জালে জড়িয়ে ফেলছে | নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষের পক্ষে তামাকজনিত দুরারোগ্য ক্যানসার বা হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা ব্যয় বহন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয় |

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার এই মহাসংকট থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে তামাক খাতের এই চার স্তর কাঠামো সম্পূর্ণরূপে বাতিল করতে হবে বলে জোরালো দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা | বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম স্তর আলাদা রাখার কোনো যৌক্তিক অর্থনৈতিক বা সামাজিক ভিত্তি থাকতে পারে না, তাই এই দুটি স্তরকে দ্রুত একীভূত করতে হবে | একই সঙ্গে সিগারেটের ন্যূনতম ভিত্তিমূল্য এমন একটি উচ্চপর্যায়ে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে তা সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্রয়ক্ষমতার সম্পূর্ণ বাইরে চলে যায় | সরকারের নীতিনির্ধারকদের এটি উপলব্ধি করতে হবে যে, সাময়িক রাজস্ব বৃদ্ধির মোহে তামাকের বিস্তার রোধে ব্যর্থ হলে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের মানবসম্পদ ও স্বাস্থ্য খাতের ওপর এক বিশাল বিপর্যয় ডেকে আনবে | তাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং টেকসই রাজস্ব আহরণের মধ্যে একটি সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি |

তথ্যসূত্র: বাংলা স্ট্রিম


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category