• মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ০২:০৮ পূর্বাহ্ন

তামাশার নগরী ও ভিউ শিকারি ভ্লগারদের ‘শক কনটেন্ট’

Reporter Name / ৭ Time View
Update : সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬

এক শ্বেতাঙ্গ ভদ্রলোক মুখে ক্যামেরা বেঁধে পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি গলি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। তাঁর ইউটিউব ভিডিওর থাম্বনেইলে বড় বড় অক্ষরে লেখা—‘ইনসাইড দ্য ওয়ার্ল্ডস ক্রেজিয়েস্ট সিটি’ (বিশ্বের সবচেয়ে উন্মাদ শহরের ভেতরে)। অন্য একজন ভ্লগার আবিষ্কার করলেন আমাদের অতি পরিচিত ‘ফুচকা’। এমন এক আবহ তৈরি করা হলো, যেন ব্রিস্টল থেকে আসা ওই ভ্লগার তেঁতুলের জল মুখে দিয়ে ‘দারুণ’ না বলা পর্যন্ত পুরো বাঙালি জাতি ফুচকার স্বাদ নিশ্চিত হওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল! আরেকজন বিদেশি ভ্লগার বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকাভ্রমণ করতে করতে কালো জলের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছেন, যেন দূষণ জিনিসটা পৃথিবীতে তিনিই প্রথম আবিষ্কার করলেন। অথচ সত্যিটা হলো, ওই ভ্লগারের জন্মের বহু আগেই বুড়িগঙ্গা নদীটা মরে গেছে।

বর্তমান বৈশ্বিক কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য এখন সবচেয়ে লোভনীয় রুট হলো—ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। বিপুল জনসংখ্যা, আবেগপ্রবণ দর্শক আর মন্তব্যের ঘরের উপচে পড়া ভিড়—সব মিলিয়ে ইউটিউব ও ফেসবুক অ্যালগরিদম দক্ষিণ এশিয়াকে দেখছে একটি রাজকীয় বুফে হিসেবে। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যেই বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটি ২৮ লাখে পৌঁছেছে এবং সোশাল মিডিয়া আইডি রয়েছে ৬ কোটি ৪০ লাখ। আর এই বিশাল বাজারে ভিউয়ের ‘জ্যাকপট’ হলো ঢাকা শহর। জাতিসংঘের ২০২৫ সালের নগরায়ণ রিপোর্ট অনুযায়ী, ৩৬.৬ মিলিয়ন (৩ কোটি ৬৬ লাখ) জনসংখ্যা নিয়ে ঢাকা এখন বিশ্বের দ্বিতীয় জনবহুল শহর, যা ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম মেগাসিটিতে পরিণত হবে। বালি বা ম্যানিলায় যাদের ভিউ শুকিয়ে গেছে, সেইসব ট্রাভেল ক্রিয়েটরদের জন্য ঢাকা এখন তাৎক্ষণিক ড্রামা বা রোমাঞ্চের খনি। ক্যামেরার ফ্রেমে মানুষের গায়ে মানুষের ধাক্কা, জট পাকানো বৈদ্যুতিক তার, রিকশার জটলা আর ঘাম—সব মিলিয়ে এই শহরকে ক্যামেরার লেন্সে এমনভাবে দেখানো সহজ, যেন একদল অতি-আশাবাদী কিন্তু নামমাত্র মজুরি পাওয়া মানুষ তাড়াহুড়ো করে এই শহরটা বানিয়েছে।

সত্যের আড়ালে ক্যামেরার নিখুঁত মিথ্যাচার

সমস্যা এটা নয় যে ঢাকার কোনো কুৎসিত রূপ নেই। আমরা যারা এই শহরে থাকি, তারা খুব ভালো করেই জানি এর বাতাস কতটা বিষাক্ত বা এর যানজট একজন সুস্থ মানুষকেও কতটা খিটখিটে বানিয়ে ছাড়ে। এগুলো রূঢ় বাস্তব। কিন্তু আসল সমস্যাটা হলো ‘বাছাইকরণ’ বা সিলেকশনে।

“একটি ক্যামেরা আপনাকে শতভাগ সত্য দেখিয়েও চরম মিথ্যাচার করতে পারে। ক্যামেরাটি মিথ্যা বলে যখন সে পুরো শহরের বিশালতা থেকে কেবল ড্রেন, বস্তি, খালি পায়ের শিশু, উপচে পড়া লঞ্চ, ময়লার পাশে ঘুমিয়ে থাকা মানুষ কিংবা ছাদের ওপর ট্রেনের বিপজ্জনক স্ট্যান্টটুকুই বেছে নেয়। এই খণ্ডচিত্রগুলোকে যখন পুরো দেশের ‘মূল চরিত্র’ বা নির্যাস হিসেবে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করা হয়, তখনই জন্ম নেয় চরম মিথ্যাচার। ঢাকা তখন হয়ে ওঠে কেবল ‘দারিদ্র্য’, ‘বিশৃঙ্খলা’, ‘বিপদ’ আর ‘টক্সিক’ এক নরককুণ্ড।”

ইউটিউবের শিরোনামগুলো দেখলেই এই চতুর প্যাটার্ন ধরা পড়ে—‘লাক্সারি অ্যান্ড পভার্টি ইন ঢাকা’, ‘বাংলাদেশস ডার্টি রিয়েলিটি’, ‘দ্য মোস্ট টক্সিক কান্ট্রি’ কিংবা ‘আই নিয়ারলি ডাইড ইন বাংলাদেশ’। পুরো শহরটাকে কিছু সস্তা এবং অতি-আবেগী থাম্বনেইলে টুকরো টুকরো করে কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। পশ্চিমা দর্শকদের একাংশের মধ্যে ‘তৃতীয় বিশ্ব’ বা অনুন্নত দেশকে তামাশা হিসেবে দেখার এক আদিম ক্ষুধা রয়েছে। বাদামী চামড়ার মানুষের কষ্ট বা অভাব তাদের কাছে এক ধরণের সিনেমাটিক বিনোদন। একটি নোংরা নদী বা একটি ক্ষুধার্ত শিশুর ছবি পশ্চিমা বাজারে খুব ভালো বিক্রি হয়, কারণ তা তাদের ভেতরের সেই ঔপনিবেশিক অহংকারকে তৃপ্ত করে যে—এই দেশগুলো আসলে এমনই ট্রাজিক, বিশৃঙ্খল এবং এখানে মানুষের মর্যাদার কোনো মূল্য নেই। এটি আসলে আধুনিক এডিটিং সফটওয়্যার দিয়ে তৈরি এক ধরণের ‘পভার্টি পর্ন’ বা দারিদ্র্য বিক্রি করার নোংরা বাণিজ্য।

আমাদের ‘উপনিবেশিক হ্যাংওভার’ ও ভিউ ফার্মিংয়ের শিকার

সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয় হলো, এই বিদেশী ভ্লগাররা কিন্তু একা কাজ করেন না। তাদের এই বাণিজ্যে অবচেতনভাবেই সাহায্য করছে আমাদের নিজস্ব ‘ঔপনিবেশিক হ্যাংওভার’ বা দাসত্ব মানসিকতা। একজন বিদেশী যখন ক্যামেরার সামনে এসে বলেন ‘বাংলাদেশ ইজ সো ফ্রেন্ডলি’, অমনি আমাদের মন গলে জল হয়ে যায়। একজন শ্বেতাঙ্গ যখন বলেন ‘কাচ্চি বিরিয়ানি ভারতের হায়দরাবাদি বিরিয়ানির চেয়েও সেরা’, রাতারাতি আমরা তাকে বিশ্বখ্যাত ফুড ক্রিটিক বানিয়ে দিই। একজন ভ্লগার শুধু ‘আই লাভ বাংলাদেশ’ বললেই আমাদের কমেন্ট সেকশনটি যেন জাতীয় পুরস্কার কমিটির রূপ নেয়।

আমরা বৈশ্বিক স্বীকৃতির জন্য এতটাই ক্ষুধার্ত যে, খুব সহজেই আমাদের আবেগ নিয়ে ‘ভিউ ফার্মিং’ বা ভিউয়ের চাষাবাদ করা সম্ভব হয়। বন্যা, ফ্যাক্টরি ধস কিংবা রাজনৈতিক সংকট ছাড়া আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বাংলাদেশ সাধারণত ইতিবাচকভাবে স্থান পায় না। তাই কোনো বিদেশী এসে যখন দুটো মিষ্টি কথা বলে, তখন আমাদের ভালো লাগে। কিন্তু এই ক্ষুধার সুযোগ নিয়েই মূলত স্থানীয় মানুষদের ‘প্রপস’ বা সস্তা পুতুলে পরিণত করা হচ্ছে। একজন দরিদ্র রিকশাচালক তাদের ক্যামেরায় হয়ে যান ‘দ্য কাইন্ডেস্ট ম্যান ইন বাংলাদেশ’, একটি অসহায় শিশু হয়ে ওঠে ‘হার্টব্রেকিং রিয়েলিটি’, আর কোনো ইংরেজি বলা স্থানীয় নারী হয়ে ওঠেন ভিডিওর রোমান্টিক প্লট।

ঢাকাকে ক্ষতচিহ্ন নয়, একটি সম্পূর্ণ শহর হিসেবে দেখানোর তাগিদ

অবশ্য সব বিদেশী ভ্লগারই এমন নোংরা ভিউ বাণিজ্যে লিপ্ত নন। দ্য ডেইলি স্টারের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক বৈশ্বিক ট্রাভেল ভ্লগার ঢাকার এই চেনা ছকের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ খাবার, ঐতিহ্যবাহী বিয়ে, সিলেটের চা বাগান, বান্দরবানের পাহাড় কিংবা ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে অত্যন্ত সম্মানজনক কাজ করেছেন। তারা ঢাকার যানজটকে অস্বীকার করেননি, কিন্তু যানজটকেই দেশের ‘জাতীয় সঙ্গীত’ বানিয়ে ছাড়েননি।

একটি ভালো ট্রাভেল ভিডিওতে অবশ্যই শহরের বিশৃঙ্খলা, বস্তি, সদরঘাটের উপচে পড়া ভিড় কিংবা পোশাক শ্রমিকের কষ্ট দেখানো উচিত—কিন্তু তার সাথে ‘কনটেক্সট’ বা সঠিক প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা জরুরি। নদীটি কেন মরল, এই দূষণের পেছনে কার লাভ লুকিয়ে আছে, কিংবা কোন গ্রামীণ স্বপ্ন পূরণের তাগিদে মানুষ এই শহরে প্রতিনিয়ত ছুটে আসছে—তাও দেখানো দরকার। ঢাকার মেট্রোরেল, সমৃদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়, বইয়ের দোকান, ছাদবাগান, ধানমন্ডি লেকের লাইভ মিউজিক কিংবা পথকুকুরদের পরম মমতায় খাওয়ানো সাধারণ মানুষের গল্পগুলোও ক্যামেরার ফ্রেমে আসা উচিত। ঢাকাকে একটি পচনশীল ক্ষতচিহ্ন হিসেবে না দেখিয়ে, একটি জীবন্ত শহর হিসেবে দেখানোই প্রকৃত ভ্লগিং।

একই সাথে, আমাদের দেশী দর্শকদেরও এখন পরিপক্ব হওয়ার সময় এসেছে। কোনো বিদেশী মুখ ফসকে ‘ধন্যবাদ’ বললেই কমেন্ট বক্সে হুমড়ি খেয়ে পড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা ভ্লগারদের প্রতি আতিথেয়তা দেখাবো, কিন্তু নিজেদের বিলিয়ে দিয়ে নয়। লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিদিন এই অসম্ভব শহরে ঘুম থেকে জেগে ওঠে এবং প্রবল কষ্ট সহিষ্ণুতা, রসবোধ, চা আর অফুরন্ত জীবনীশক্তি নিয়ে জীবনকে সচল রাখে। ঢাকা কোনো সস্তা ইউটিউব থাম্বনেইল বা রিয়্যাকশন ভিডিও নয়; এটি এক অপরাজিত যাপনের নাম।

তথ্যসূত্র: ডেইলি স্টার


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category