দেশের জ্বালানি সংকট নিরসন এবং ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে স্থলভাগ ও সাগরের ৪৭টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের দিকে এগোচ্ছে সরকার। নতুন নির্বাচিত সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারমূলক কর্মপরিকল্পনায় এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই স্থলভাগ ও সমুদ্রে অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বানের যাবতীয় প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করা হয়েছে। সংশোধিত উৎপাদন-বণ্টন চুক্তির (পিএসসি ২০২৬) আওতায় দেশের স্থলভাগে ২১টি এবং সমুদ্রে ২৬টি ব্লকে বহুজাতিক তেল কোম্পানিগুলোকে (আইওসি) এই অনুসন্ধানের কাজে যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা পেট্রোবাংলা।
এই উদ্যোগটি এমন এক সময়ে নেওয়া হচ্ছে যখন মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দামে ব্যাপক অস্থিরতা বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ইতোমধ্যে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে এবং স্পট মার্কেটে এলএনজির দামও প্রতি এমএমবিটিইউ ২১ ডলারে পৌঁছেছে। বৈশ্বিক এই সংকটের পাশাপাশি দেশেও গ্যাস উৎপাদনের চিত্র বেশ উদ্বেগজনক। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, ২০২০ সালে দেশীয় কূপগুলো থেকে যেখানে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত, তা বর্তমানে কমে ১ হাজার ৭০১ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। অথচ দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। উৎপাদন ও চাহিদার এই বিশাল ঘাটতির কারণেই শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আবাসিক খাতে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে, যা সামাল দিতে সরকারকে বিপুল ব্যয়ে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে।
এর আগে ২০২৪ সালের মার্চে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আকর্ষণহীন চুক্তির কারণে কোনো বিদেশী কোম্পানি তাতে সাড়া দেয়নি। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও এই খাতে নতুন করে বিদেশি বিনিয়োগ টানতে ব্যর্থ হয়। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান সরকার মডেল পিএসসি ২০২৬-এ বেশ কিছু যুগান্তকারী সংস্কার এনেছে। নতুন নিয়মে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে গ্যাসের দাম আগের উচ্চ সালফার ফুয়েল অয়েল সূচকের পরিবর্তে সরাসরি ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এতে গভীর সমুদ্রে গ্যাসের দাম ব্রেন্টের তিন মাসের গড় দামের ১১ শতাংশ, অগভীর সমুদ্রে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ, সমতলে ৮ শতাংশ এবং পাহাড়ি এলাকায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে বাধ্যতামূলক অনুদান ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে এবং পাইপলাইন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আলোচনা সাপেক্ষ ট্যারিফ চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ব্লকগুলোকে এই দরপত্রের বাইরে রাখা হচ্ছে।
সরকারের এই তৎপরতাকে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রখ্যাত ভূতত্ত্ববিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরূল ইমাম জানিয়েছেন, স্থলভাগ ও সাগরে দরপত্র আহ্বানের এই উদ্যোগ সফল হলে এবং বিদেশী কোম্পানিগুলো বিস্তৃত আকারে অনুসন্ধান চালালে দেশে বড় ধরনের গ্যাসের মজুদ পাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে অত্যন্ত ব্যয়বহুল আমদানিকৃত এলএনজির ওপর দেশের নির্ভরতা যেমন উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাও সুসংহত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।