• বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:০২ অপরাহ্ন

দিল্লির কৌশলগত সমীকরণে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপস্থিতি

Reporter Name / ৩ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

বিশ্ব রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাসে কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ক্ষমতাচ্যুত বা রাজনৈতিক সংকটে পড়া প্রভাবশালী রাষ্ট্রনেতাকে নিজেদের ভূখণ্ডে আশ্রয় দেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে তাঁদের একটি বিশেষ কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা একেবারেই নতুন কোনো ঘটনা নয়। বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, অভ্যন্তরীণ গণঅভ্যুত্থান কিংবা সামরিক অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসা কোনো শীর্ষ নেতাকে আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রটি সংশ্লিষ্ট প্রতিবেশী দেশের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা করে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব ও রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়েও এখন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে ঠিক একই ধরণের গভীর ও বহুমুখী সমীকরণ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এখন অন্যতম প্রধান প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, শেখ হাসিনা কি ভারতের কাছে স্রেফ একজন মানবিক আশ্রয়প্রার্থী, নাকি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দিল্লির প্রভাব ও স্বার্থ ধরে রাখার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও গোপন ‘তুরুপের তাস’।

যদি আমরা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির অতীত ইতিহাসের দিকে তাকাই, তবে দেখা যাবে যে ভারত ইতিপূর্বেও তার প্রতিবেশী দেশগুলোর বহু বিতর্কিত ও শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকে দীর্ঘ মেয়াদের জন্য নিজেদের মাটিতে নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছে। এই তালিকার সবচেয়ে বড় ও জ্যান্ত উদাহরণ হলেন তিব্বতের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা। ১৯৫৯ সালে চীনের কমিউনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে তিব্বতিদের একটি বড় বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি দলবলসহ পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন এবং সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত ভারতের হিমাচল প্রদেশের ধর্মশালায় তাঁর স্থায়ী রাজনৈতিক সদর দপ্তর গড়ে উঠেছে। দালাই লামার এই দীর্ঘ অবস্থান গত কয়েক দশক ধরে ভারত ও চীনের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্যতম একটি প্রধান সংবেদনশীল ও বিরোধপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করছে। একইভাবে, বিগত ২০২১ সালে আফগানিস্তানের ক্ষমতা তালেবানদের হাতে চলে যাওয়ার পর দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি দূরপ্রাচ্যে পালিয়ে গেলেও, আফগান সরকারের বহু গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী রাজনীতিকেরা ভারতের রাজধানী দিল্লিতে এসে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন। ভারত সরকার তাঁদের সেখানে রেখে কেবল মানবিক সাহায্যই করেনি, বরং তাঁদের নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করে কাবুলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার এবং দীর্ঘমেয়াদে আফগানিস্তানের সাথে একটি অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের সেতু ধরে রাখার একটি শক্তিশালী কৌশলগত চাল চালছিল।

তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশের মতে, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই ভারতে অবস্থানের বিষয়টি দালাই লামা কিংবা আফগানিস্তানের নির্বাসিত মন্ত্রীদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং অনেক বেশি জটিল। এর মূল কারণ হলো, শেখ হাসিনা কোনো সাধারণ নির্বাসিত নেতা নন, বরং তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে থাকা সভাপতি এবং টানা ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা একজন দাপুটে প্রধানমন্ত্রী। তাঁর শাসনামলে বাংলাদেশের পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র, জাতীয় প্রশাসন, পুলিশ ও সামরিক বাহিনী, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর তাঁর ও তাঁর দলের একচ্ছত্র এবং অত্যন্ত গভীর প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ফলে তিনি সশরীরে ভারতের মাটিতে অবস্থান করার অর্থ হলো, দিল্লি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির ওপর একটি অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের বিশেষ কৌশলগত সুবিধা নিজেদের পকেটে রেখে দিয়েছে।

নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকার এবং বিশেষ করে শেখ হাসিনা ছিলেন ভারতের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও অন্ধ আস্থাভাজন মিত্র। তাঁর দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে ভারত সরকার বাংলাদেশের কাছ থেকে ট্রানজিট সুবিধা, বন্দর ব্যবহারের অনুমতি এবং একমুখী বাণিজ্য সুবিধাসহ নানা ধরণের কৌশলগত সুবিধা আদায় করে নিয়েছে, যা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। বিগত ২০১৮ সালের মে মাসে গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বয়ং শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন যে, তিনি ভারতকে যা দিয়েছেন তা ভারত আজীবন মনে রাখবে এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রতিদিনের বোমাবাজি ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গুলি বন্ধ করে তিনি সেখানে শান্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। ঠিক একইভাবে, ২০২২ সালে ভারতের আসাম রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্বশর্মাও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন যে, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার নেওয়া অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন পদক্ষেপের কারণেই ভারতের আসাম ও তার আশপাশের রাজ্যগুলো বর্তমানে ভারতের মধ্যে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হতে পেরেছে। এছাড়া ভারতের আদানি গ্রুপের সাথে বাংলাদেশের অত্যন্ত বিতর্কিত ও অসম বিদ্যুৎ চুক্তি সই করাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় খাত গোপনে ভারতের ব্যবসায়িক স্বার্থে উন্মুক্ত করে দেওয়ার পেছনেও শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল।

বর্তমান একবিংশ শতাব্দীতে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে ভারত ও চীনের মধ্যকার আধিপত্য বিস্তারের যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে, বাংলাদেশ তার অন্যতম একটি প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চীন গত এক দশকে বাংলাদেশের বৃহত্তম অবকাঠামো উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে, যার মধ্যে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প, কর্ণফুলী নদীর তলদেশের টানেল এবং পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো মেগা প্রকল্পগুলো অন্যতম। এর বিপরীতে, ভারত সবসময়ই বাংলাদেশকে নিজেদের একান্ত নিরাপত্তা বলয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের ধারণা, যদি বর্তমানের নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার দেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজনে চীনের দিকে অনেক বেশি ঝুঁকে পড়ে, তবে ভারত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপস্থিতি ও তাঁর দলের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ককে বাংলাদেশের ওপর একটি পাল্টা মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করবে। তবে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন অনেকটাই বদলে গেছে এবং কেবল একজন নির্বাসিত নেতার উপস্থিতি দিয়ে পুরো দেশের কৌশলগত অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করা দিল্লির জন্য খুব একটা সহজ হবে না।

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন যে, গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সশরীরে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও বাংলাদেশের বেসামরিক প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং তৃণমূল রাজনীতিতে এখনো তাঁর লাখ লাখ অন্ধ অনুসারী ও কর্মী সক্রিয় রয়েছে। ভারতের মাটিতে বসে শেখ হাসিনা যদি তাঁর এই বিশাল অনুসারী গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর বা সরকারের বিরুদ্ধে ছদ্মবেশী অস্থিতিশীলতা তৈরি করার চেষ্টা করেন, তবে তা দেশের জন্য এক বড় বিপদ হতে পারে। অনেকেই মনে করেন, বর্তমান সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে এবং বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণ করার লক্ষ্যে বিভিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘু ইস্যু ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর পেছনে ভারত এবং শেখ হাসিনার অনুসারীদের একটি পরোক্ষ হাত থাকতে পারে।

কূটনৈতিক অঙ্গনে এমন একটি জোরালো ধারণাও প্রচলিত রয়েছে যে, শেখ হাসিনার ভারতে এই দীর্ঘ অবস্থান বাংলাদেশের সাথে ভারতের যেকোনো ধরণের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার টেবিলে একটি অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। তিস্তা নদীর পানি বণ্টন সমস্যা, সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের নির্বিচার হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি কমানো কিংবা আঞ্চলিক কানেক্টিভিটির মতো জটিল ইস্যুগুলোতে নয়াদিল্লি চাইলে সরাসরি কোনো কথা না বলেও, কেবল শেখ হাসিনাকে নিজেদের কাছে রেখে ঢাকাকে একটি পরোক্ষ রাজনৈতিক বার্তা দিতে পারে। যদিও ভারত সরকার কখনোই এ ধরণের কৌশলগত চাপের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি এবং তারা বরাবরই দাবি করে আসছে যে, বাংলাদেশের সাথে তাদের সম্পর্ক কোনো ব্যক্তি বা বিশেষ দলের ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি দুই দেশের পারস্পরিক রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি রাষ্ট্র-টু-রাষ্ট্র সম্পর্ক।

তবে শেখ হাসিনাকে যদি ভারত দীর্ঘ মেয়াদে একটি দৃশ্যমান রাজনৈতিক বা কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করার অতিরিক্ত চেষ্টা করে, তবে সেটি উল্টো ভারতের নিজেদের পররাষ্ট্রনীতির জন্যও এক প্রকাণ্ড ও দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে ইতিমধ্যে যে তীব্র ভারতবিরোধী জনমত ও সেন্টিমেন্ট তৈরি হয়েছে, তা শেখ হাসিনার এই ভারতীয় আশ্রয়ের কারণে আরও অনেক বেশি শক্তিশালী ও উগ্র রূপ ধারণ করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে ভারতের বাণিজ্যিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য মোটেও লাভজনক হবে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত কোনো নেতাকে আশ্রয় দিয়ে প্রতিবেশী দেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করার এই খেলাটি বিশ্বের অনেক দেশেই অতীতে দেখা গেছে। যেমন, ২০১৪ সালে ইউক্রেনের তীব্র গণবিক্ষোভের মুখে দেশটির রুশপন্থী প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ ক্ষমতা হারিয়ে যখন রাশিয়ায় আশ্রয় নেন, তখন মস্কো তাকে ইউক্রেনের ‘একমাত্র বৈধ প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে ঘোষণা করে ইউক্রেনে সামরিক হস্তক্ষেপের পথ সুগম করেছিল। একইভাবে ১৯৯৯ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর পাকিস্তানের নওয়াজ শরিফ সৌদি আরবে দীর্ঘ নির্বাসনে থাকাকালীন সৌদি রাজপরিবার পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ক্ষমতা ভাগাভাগির সমঝোতায় একটি বড় মোড়ল হিসেবে ভূমিকা রাখার সুযোগ পেয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনের বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু এইচ কিড তাঁর এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন যে, কোনো পলাতক বা নির্বাসিত রাজনৈতিক গোষ্ঠী কিংবা দেশের সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানকে নিজেদের দেশে আশ্রয় দেওয়া স্বাগতিক রাষ্ট্রের জন্য একটি অত্যন্ত কার্যকরী পররাষ্ট্রনীতির হাতিয়ার হতে পারে, যার মাধ্যমে তারা প্রতিবেশী বা প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের ওপর স্থায়ী রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম শফিউল্লাহও মনে করেন, শেখ হাসিনা এখন স্পষ্টভাবেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের একটি লিভারেজ বা ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন এবং ভারতে বসে তাঁর দেওয়া বিভিন্ন বিতর্কিত অডিও বার্তা ও সাক্ষাৎকারগুলো বাংলাদেশে নতুন করে বিশৃঙ্খলা তৈরির উদ্দেশ্যে ছড়ানো হচ্ছে।

এদিকে, এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই এক নতুন আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে। বাংলাদেশে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শত শত ছাত্র-জনতাকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত চেয়ে ভারত সরকারকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সম্প্রতি ২০২৬ সালের ১৪ জুলাই নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে যখন সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করা হয়, তখন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল অত্যন্ত কৌশলী জবাব দিয়ে বলেন যে, যেকোনো দেশের সাথে আসামির প্রত্যর্পণ বা হস্তান্তর বিষয়টি সম্পূর্ণ একটি জটিল আইনি প্রক্রিয়া এবং এটি দুই দেশের আইনগত কাঠামোর আলোকেই নিষ্পত্তি করা হবে। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, শেখ হাসিনার বর্তমান অবস্থান ও আশ্রয়ের বিষয়ে ভারতের পূর্ববর্তী মনোভাবের কোনো ধরণের পরিবর্তন ঘটেনি। ফলে সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে যে, শেখ হাসিনা ভারতের জন্য কেবল একটি মানবিক দায় নন, বরং দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক দাবার বোর্ডে তিনি নয়াদিল্লির জন্য এক অত্যন্ত মূল্যবান এবং স্পর্শকাতর কৌশলগত ঘুঁটি হিসেবেই থেকে যাচ্ছেন।

তথ্যসূত্র: বাংলানিউজ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category