গত পাঁচ দশক ধরে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়া বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্কে দৃশ্যমান মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই নিকট প্রতিবেশী দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের মোট আকার কমেছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের সামগ্রিক বাণিজ্যের পরিমাণ যেখানে ছিল প্রায় ১ হাজার ৩৪৯ কোটি মার্কিন ডলার, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা সংকুচিত হয়ে ১ হাজার ২৩৬ কোটি ৭৫ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। এই সময়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে পণ্য আমদানির অর্থমূল্য যেমন প্রায় ৯০০ কোটি ডলার কমেছে, তেমনি বাংলাদেশ থেকেও দেশটিতে পণ্য রফতানির পরিমাণ ২০০ কোটি ডলার থেকে হ্রাস পেয়ে ১৭৮ কোটি ডলারে ঠেকেছে।
দুই দেশের বাণিজ্যিক স্থবিরতার এই চিত্র সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত হয়েছে বাংলাদেশের প্রধান স্থলবন্দরগুলোতে। দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল দিয়ে বিগত এক বছরে পণ্য আমদানি কমেছে প্রায় পৌনে দুই লাখ টন। উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্যের আমদানি কমে যাওয়ায় বন্দরটিতে রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। সমাপ্ত অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস হাউজে ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা, অর্থাৎ একক এই বন্দর থেকেই রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকায়। একইভাবে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রায় সাড়ে ৯০০ কোটি টাকা এবং দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরে প্রায় ৪৩ শতাংশ বা ৪৪৮ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব ঘাটতি রেকর্ড করা হয়েছে।
বাণিজ্যিক এই ছন্দপতনের পেছনে অর্থনৈতিক কারণের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সীমান্ত পরিস্থিতি, কঠোর কূটনৈতিক ভাষা, ভিসা প্রদান সীমিতকরণ এবং পুশ-ইন নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে জটিলতা তৈরি হয়। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে বাংলাদেশেকে দেওয়া ভারতের ট্রানশিপমেন্ট সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশও স্থলবন্দর দিয়ে সুতা ও কিছু কাঁচামাল আমদানি বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে ভারতও বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, আসবাব ও প্লাস্টিক পণ্যের স্থলবন্দরভিত্তিক আমদানিতে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করে। দুই দেশের পাল্টাপাল্টি এই পদক্ষেপ সামগ্রিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে।
পণ্যভিত্তিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারত থেকে বাংলাদেশে তুলা আমদানি প্রায় ১৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা দেশের প্রধান রফতানি খাত পোশাক শিল্পের ওপর প্রভাব ফেলছে। এছাড়া বিভিন্ন মূলধনী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশের আমদানিও ৫ শতাংশের বেশি কমেছে। বিপরীতে খাদ্যশস্য আমদানি প্রায় ৭৪ শতাংশ এবং জ্বালানি তেল আমদানি ৫ শতাংশের মতো বেড়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ওভেন পোশাক রফতানি প্রায় ১৯ শতাংশ এবং জুতা রফতানি প্রায় ১৬ শতাংশ কমেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি ও ডলার সংকটের প্রভাব, যার ফলে সার্বিক আমদানি চাহিদা এমনিতেই কম ছিল।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া আস্থার সংকটই বাণিজ্যের এই সংকোচনের মূল কারণ। সীমান্ত বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ায় উভয় দেশের ব্যবসায়ীরা এখন বিকল্প বাজার ও বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে ভৌগোলিক নৈকট্য এবং প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক পরিপূরকতাকে উপেক্ষা করা কোনো পক্ষের জন্যই লাভজনক নয়। ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনও বিষয়টিকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সাময়িক হিসেবে দেখছে এবং মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য পুনরায় স্বাভাবিক গতিতে ফিরবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।
এমন অচলাবস্থার মধ্যেই সম্প্রতি দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করতে নীতি ও ব্যবসায়িক পর্যায়ে নতুন তৎপরতা শুরু হয়েছে। সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার ওপর জোর দেওয়া হয়। ভারতীয় হাইকমিশনার স্পষ্ট করেছেন যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতাই দুই দেশের সম্পর্কের মূল চালিকাশক্তি এবং অর্থনীতিকে রাজনীতির চেয়ে এগিয়ে রাখলে কূটনৈতিক জটিলতাও দূর হবে। পাশাপাশি কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির (সিআইআই) এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল সম্প্রতি ঢাকা সফর করে এফবিসিসিআইয়ের সঙ্গে অবকাঠামো ও প্রযুক্তি বিষয়ে যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও ব্যবসায়ীদের জন্য দ্রুত ভিসা প্রদান এবং দীর্ঘদিনের ভারসাম্যহীন বাণিজ্য কাঠামো সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করা, স্থলবন্দরের জটিলতা কমানো এবং নির্বিঘ্ন যাতায়াত ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে পূর্বের গতি ও আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।