• শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ১২:২২ পূর্বাহ্ন

নব্য উদারবাদী অর্থনীতি: দেশে কি ধনী গরিবের বৈষম্য আরও বাড়বে?

Reporter Name / ২ Time View
Update : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

দীর্ঘ দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে জাতীয় অর্থনীতিকে অনন্য উচ্চতায় নেওয়ার রূপরেখা ঘোষণা করেছে বিএনপি। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) মার্কিন ডলারের জিডিপিতে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই মেগা লক্ষ্যমাত্রাকে ভিত্তি ধরে সরকার প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকার বিশাল জাতীয় বাজেট বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এই যাত্রাপথকে এগিয়ে নিতে বর্তমান প্রশাসন যে নীতিগত কাঠামোর ওপর ভর করছে, তা মূলত অর্থনীতির তাত্ত্বিক ভাষায় ‘নব্য উদারবাদী অর্থনীতি’ বা ‘নিউ লিবারেল ইকোনমি’ হিসেবে পরিচিত। মুক্তবাজারের স্বাভাবিক গতি, বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই মডেলের সাফল্য ও সংকট নিয়ে আজ বিশ্বজুড়ে গভীর আলোচনা চলছে।
নব্য উদারবাদী অর্থনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি হলো রাষ্ট্রকে ব্যবসার মাঠ থেকে দূরে রাখা এবং বাজারকে নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া। এই মডেলে পণ্য বা সেবার মূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব সরকারের হাতে না রেখে ক্রেতা ও বিক্রেতার চাহিদা-যোগানের ভারসাম্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন দেওয়া, বিনিময় হারকে বাজারের ওপর ছেড়ে দিয়ে ডলারের বাজারভিত্তিক দর নির্ধারণ এবং সরকারি কাঠামোর বাইরে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার সাম্প্রতিক নীতিগুলো মূলত এই মুক্তবাজার চিন্তারই প্রতিফলন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশল ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো উদীয়মান খাতে বৈশ্বিক বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পুঁজি আকর্ষণ করতেই বাজারকেন্দ্রিক এই পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রচিন্তার প্রভাব থাকলেও সত্তরের দশকের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও মুদ্রাস্ফীতির পর মিল্টন ফ্রিডম্যান ও ফ্রিডরিখ হায়েকদের মতো মুক্তবাজারের প্রবক্তাদের নব্য উদারবাদী দর্শন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আশির দশকে ব্রিটেনের মার্গারেট থ্যাচার ও যুক্তরাষ্ট্রের রোনাল্ড রিগ্যানের বলিষ্ঠ প্রয়োগে বিশ্বায়নের যে জোয়ার তৈরি হয়, তা বহু দেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। তবে এই সুবিশাল অর্জনের অন্ধকার দিকটি হলো তীব্র সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য। শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা জ্বালানির মতো মৌলিক নাগরিক অধিকার যখন সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক মুনাফার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সেবা পাওয়া থেকে ছিটকে পড়ে। ২০০৮ সালের নজিরবিহীন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দাও সরকারের শিথিল তদারকি ও আর্থিক খাতের অতিরিক্ত ফাটকাবাজির কারণেই সংঘটিত হয়েছিল।
বিশ্বের এই তিক্ত অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার একটি ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যম পন্থা অনুসরণের কৌশল নিয়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাঠামোগত শর্ত মেনে পর্যায়ক্রমে জ্বালানি ও সারের ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ করা হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষকে সুরক্ষার চাদরে বাঁধতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি ব্যাপকভাবে চালু করা হয়েছে। কার্ডধারীদের প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অর্থ সহায়তা কিংবা সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপণ্য সরবরাহের এই উদ্যোগ মূলত মুক্তবাজার ব্যবস্থার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে প্রান্তিক মানুষকে বাঁচানোর এক কল্যাণকামী প্রতিরক্ষা বলয়।
তবে এই উচ্চাভিলাষী রূপান্তরের সামনে এখনও দাঁড়িয়ে আছে গভীর কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। বাজারকে উন্মুক্ত করার ফলে দ্রব্যমূল্যের ওপর চাপ বা অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি এবং সরকারের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব ঘাটতি মেটানোই এখন প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এছাড়া ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকার পাহাড়সম খেলাপি ঋণের জট না ছুটিয়ে কার্যকর বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। অর্থনৈতিক সংস্কারের এই সূক্ষ্ম খেলায় সাধারণ মানুষকে চরম বৈষম্যের মুখে না ফেলে ২০৩৪ সালের কাঙ্ক্ষিত ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যে সরকার কতটুকু সফলভাবে পৌঁছাতে পারবে, তা নির্ভর করবে সুশাসন ও আর্থিক শৃঙ্খলার কার্যকর প্রয়োগের ওপর।
তথ্যসূত্র: দ্যা পোস্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category