• রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন
Headline

নেহেরুর বহুমাত্রিক ভারত বদলে যাচ্ছে মোদির হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রে

Reporter Name / ৬ Time View
Update : রবিবার, ৩১ মে, ২০২৬

আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র এবং এর আদর্শিক ভিত্তি গত এক দশকে এমন এক অভাবনীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে, যা দেশটির প্রতিষ্ঠাতাদের কল্পনারও অতীত ছিল। আজকের দিনের ভারত এবং ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর কল্পিত সেই বহুমাত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী ভারতের মধ্যে আদর্শিক পার্থক্য এখন যোজন যোজন দূর। বর্তমান ভারত ক্রমান্বয়ে রূপ নিচ্ছে এক চরমপন্থী, উগ্র জাতীয়তাবাদী এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনৈতিক বাস্তবতায়। যেখানে রাষ্ট্রীয় শক্তির আস্ফালন, সামরিক ও আগ্রাসী ভাষা, সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের আধিপত্য এবং ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি মিলেমিশে এক নতুন ধরণের রাজনৈতিক আবেগ ও ইকোসিস্টেম তৈরি করেছে। এই বিপুল পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হলো ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দেওয়া ঐতিহ্যবাহী দল জাতীয় কংগ্রেস, যারা আজ নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং গভীরতম অস্তিত্ব সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।

স্বাধীন ভারতের সূচনালগ্নে, ১৯৪৭ সালে যখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির কাছ থেকে শাসনক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়, তখন সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রটির সামনে সবচেয়ে বড় এবং অস্তিত্ব রক্ষার মূল সংকট ছিল ‘ভারত’ নামের এই বিশাল ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ধারণাটিকে যেকোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখা। ইউরোপের অনেক আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের মতো ভারত কেবল একটি নির্দিষ্ট ভাষা, একটি একক জাতিসত্তা বা একটি সুনির্দিষ্ট ধর্মের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। বরং এটি ছিল অসংখ্য জাতিগত পরিচয়, শত শত ভিন্ন ভাষা ও উপভাষা, গভীর ও জটিল বর্ণপ্রথা, সুদীর্ঘকালের ধর্মীয় বিভাজন এবং সদ্য ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী দেশভাগের মর্মান্তিক স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক অত্যন্ত ভঙ্গুর ভূখণ্ড। সেই চরম সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সরকার পরিচালনার পাশাপাশি জওহরলাল নেহেরুর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রকল্প ও স্বপ্ন ছিল এমন এক ‘আইডিয়া অব ইন্ডিয়া’ বা ভারতের ধারণা নির্মাণ করা, যেখানে মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে সাংবিধানিক নাগরিকত্ব অনেক বেশি বড় করে দেখা হবে। যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের আস্ফালনের বদলে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বড় হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালিত হবে সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, বৈজ্ঞানিক মানসিকতা ও আধুনিকতার সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর ভর করে।

নেহেরু অত্যন্ত গভীরভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, এই বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশটিকে যদি কেবল হিন্দু সভ্যতার রাষ্ট্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করা হয়, তবে এই রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে কোনোভাবেই টিকতে পারবে না এবং তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। তাই তিনি রাষ্ট্রের ঐক্যের প্রধান ভিত্তি হিসেবে একদিকে স্বাধীন বিচার বিভাগ, একটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা, মুক্তচিন্তার বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণার প্রতিষ্ঠান এবং একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রকে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ, নেহেরুর ভারত মূলত ছিল এমন একটি বিশাল রাজনৈতিক কল্পনা, যেখানে হাজারো বিভক্ত এবং বৈচিত্র্যময় পরিচয় একত্রে মিলেমিশে এক ছাদের নিচে বসবাস করতে পারবে। আর স্বাধীন ভারতে সেই প্রকল্পের প্রধান ও একমাত্র রাজনৈতিক বাহন বা ইঞ্জিন ছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। কিন্তু ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস, যে কংগ্রেস একসময় ভারতের বহুত্ববাদী রাষ্ট্রচিন্তার প্রধান ধারক ও বাহক ছিল, আজ সেই দলটিই ভারতের বর্তমান রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় অস্তিত্ব সংকটে ধুঁকছে।

স্বাধীনতার পর টানা কয়েক দশক ধরে কংগ্রেস যে শুধু ভারতের একটি সাধারণ রাজনৈতিক দল ছিল, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। বরং কংগ্রেস নিজেই ছিল ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু, জাতীয়তাবাদের একমাত্র ভাষা এবং অনেক ক্ষেত্রে খোদ রাষ্ট্রেরই সমার্থক একটি সত্তা। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় ভারতের রাজনৈতিক দৃশ্যপট আমূল বদলাতে শুরু করে। আঞ্চলিক জাতিগত রাজনীতির উত্থান, বর্ণভিত্তিক রাজনীতির মেরুকরণ, নব্বইয়ের দশকের অর্থনৈতিক উদারীকরণ, মিডিয়ানির্ভর তুমুল জনতুষ্টিবাদ এবং সর্বোপরি ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) হাত ধরে হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের যে আগ্রাসী উত্থান ঘটেছে, তা নেহেরুবাদী রাজনৈতিক কাঠামোকে অত্যন্ত গভীরভাবে চ্যালেঞ্জ করেছে। আজকের দিনে কংগ্রেস একদিকে যেমন বিজেপির কেন্দ্রীয় হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের প্রবল ঝড়ের মুখে খড়কুটোর মতো উড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি স্থানীয় ভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক পরিচয়ের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা অত্যন্ত শক্তিশালী প্রাদেশিক দলগুলোর চাপে পিষ্ট হচ্ছে।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে স্থানীয় ইস্যু, ভাষার স্বকীয়তা, সংস্কৃতির অহংকার এবং জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে অত্যন্ত শক্তিশালী রাজনৈতিক দল গড়ে উঠেছে। যেমন—তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ডিএমকে (দ্রাবিড় মুন্নেত্র কড়গম) বা এআইএডিএমকে (অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্র কড়গম), উত্তরপ্রদেশে অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি ও মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি, বিহারে লালু প্রসাদ যাদবের আরজেডি ও নীতীশ কুমারের জেডিইউ, পাঞ্জাবে আকালি দল এবং অন্ধ্রপ্রদেশে চন্দ্রবাবু নাইডুর তেলেগু দেশম পার্টি। সাম্প্রতিক সময়ে এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে দক্ষিণী সুপারস্টার থালাপতি বিজয়ের নতুন রাজনৈতিক দল টিভিকে। একদিকে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির হিন্দুত্ববাদী ও আগ্রাসী রাজনীতিকে মোকাবিলা করা, আবার একই সাথে আঞ্চলিক স্তরে এই শক্তিশালী দলগুলোর সাথে লড়াই করে নিজেদের পুরোনো রাজনৈতিক জমি টিকিয়ে রাখা—এই দ্বিমুখী কঠিন সমীকরণের মাঝে পড়ে কংগ্রেস যেন তার ঐতিহাসিক ভূমিকা, রাজনৈতিক ভাষা এবং সাংগঠনিক ভিত্তি সবকিছুই চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে।

দিল্লি থেকে শুরু করে কলকাতা, কিংবা তামিলনাড়ু থেকে জম্মু-কাশ্মীর—ক্ষমতার আশপাশে এখন আর ভারতের এই ঐতিহ্যবাহী দল কংগ্রেসকে তেমন একটা দেখা যায় না। যে দলকে একসময় নেতৃত্ব দিয়েছেন মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু বা ইন্দিরা গান্ধীর মতো হিমালয়সম নেতারা, সেই দলের বর্তমান নেতৃত্ব আজ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এই অবর্ণনীয় করুণ পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো? গত তিন দশকের রাজনীতিতে কংগ্রেস কীভাবে এতটা কোণঠাসা হয়ে পড়ল যে, তারা এখন আর শক্ত কোনো বিরোধী দল হিসেবেও নিজেদের প্রমাণ করতে পারছে না?

এই পতনের সবচেয়ে বড় ও নিখুঁত উদাহরণ হতে পারে পশ্চিমবঙ্গ। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনেও কংগ্রেসের করুণ দশা মানুষের চোখে পড়েছে। একসময় এই রাজ্যটি ছিল ইন্দিরা গান্ধীর অত্যন্ত শক্তিশালী এক দুর্গ। ১৯৭০-এর দশকের প্রথমার্ধে এই রাজ্যের শাসনক্ষমতায় সর্বশেষ আসীন ছিল কংগ্রেস। এরপর ১৯৭৭ সাল থেকে শুরু হয় তাদের ধারাবাহিক পতনের গল্প। টানা ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসন এবং পরবর্তীতে একসময়ের লড়াকু কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের যে অভাবনীয় উত্থান ঘটে, তা কংগ্রেসকে আর পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়াতেই দেয়নি। তৃণমূলের টানা ১৫ বছরের শাসনে কংগ্রেস আজ এই রাজ্যে একটি অদৃশ্য রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যাদের অস্তিত্ব কেবল টেলিভিশনের টকশো বা বিতর্কের মঞ্চেই সীমাবদ্ধ। গত পনেরো বছরে যে দলটির আসন সংখ্যা ৪২ থেকে কমতে কমতে ২-এ নেমে এসেছে, সেই দলটি ভারতের প্রায় পনেরোটি রাজ্যে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় বিজেপির কাছে পর্যুদস্ত হওয়া কংগ্রেসকে নতুন প্রজন্মের বেশিরভাগ ভোটারই আর ক্ষমতার বিকল্প হিসেবে দেখছেন না। ফলে কংগ্রেসের প্রতি সাধারণ মানুষ আর কোনোভাবেই নিজেদের রাজনৈতিক আস্থা ধরে রাখতে পারছে না।

সাংগঠনিক দুর্বলতার পাশাপাশি আদর্শিক লড়াইয়েও কংগ্রেস আজ দিশেহারা। বিজেপি অত্যন্ত সুকৌশলে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিকে একটি মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ভারতের সীমানার ওপারে পাকিস্তান বা চীনের জুজু, এমনকি বাংলাদেশ নিয়ে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বা তিস্তা ইস্যুর মতো বিষয়গুলোকে সামনে এনে বিজেপি এমন এক উগ্র জাতীয়তাবাদী বয়ান তৈরি করেছে, যা সাধারণ ভোটারদের গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। ভারতের ভোটারদের একটি বিশাল অংশ এখন যেকোনো কিছুর চেয়ে দেশের নিরাপত্তাকেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখে। ঠিক এই জায়গাতেই কংগ্রেসের সেই ধ্রুপদি, ঐতিহ্যবাহী এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ভাষা খেই হারিয়ে ফেলছে। জনমানসে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই ধারণাটি গেঁথে দেওয়া হয়েছে যে, কংগ্রেসের নরমপন্থী পররাষ্ট্রনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান ভারতের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ। ফলে অসাম্প্রদায়িকতার যে বয়ান কংগ্রেস যুগ যুগ ধরে ফেরি করে এসেছে, তা এখন বিজেপির তৈরি করা উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রবল ঢেউয়ে ভেসে যাচ্ছে।

সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি দৃশ্যমান হয় দল দুটির সাংগঠনিক কাঠামো ও মাঠপর্যায়ের কাজের ধরনে। নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে বিজেপি যখন প্রতিটি ৬০ জন ভোটারের জন্য একজন করে ‘পান্না প্রমুখ’ নিয়োগ করে তাদের প্রচারণাকে সরাসরি সাধারণ মানুষের ড্রয়িংরুম পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছে, কংগ্রেস তখনো কেবল গান্ধী পরিবারের উত্তরাধিকার ও পুরোনো নস্টালজিয়ার ওপর ভর করে রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাইছে। রাহুল গান্ধীর দেশজোড়া ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’ কিংবা ‘মহব্বত কি দুকান’ (ভালোবাসার দোকান)-এর মতো আবেগপূর্ণ বয়ান বা স্লোগানগুলো বর্তমান ভারতের তরুণ প্রজন্মের ব্যক্তিগত ও অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষার সাথে সেভাবে সংগতিপূর্ণ হতে পারছে না। ভারতের নতুন ভোটাররা, যারা প্রতিদিন কর্মসংস্থান, উন্নত অবকাঠামো ও ডিজিটাল সংযোগের স্বপ্ন দেখে, তাদের কাছে কংগ্রেসের সেই পুরনো দিনের ধর্মনিরপেক্ষতার স্লোগানগুলো আজ অনেকটাই পরাবাস্তব ও সেকেলে মনে হয়। গত লোকসভা নির্বাচনে ‘ইন্ডিয়া’ জোট যদিও বিজেপিকে কিছুটা চাপে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল, কিন্তু তৃণমূল পর্যায় থেকে দলকে নতুন করে ঢেলে না সাজালে এবং আধুনিক ভারতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো নতুন রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে না পারলে নেহেরুর ভারতের কফিনে শেষ পেরেকটি খুব শিগগিরই হয়তো ঠুকে যাবে। রাজনৈতিক সমীকরণ যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে কংগ্রেসের জন্য পুনরুত্থানের পথ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।

তথ্যসূত্র: দ্যা পোস্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category