• বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৩ অপরাহ্ন
Headline
এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর আত্মহত্যা, সেই মামা ওবায়দুর কারাগারে সাবেক ৭ এমপির বিরুদ্ধে দুদকের মামলা, ৩ জনকে সম্পদ বিবরণীর নোটিশ মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রাতরাশ বৈঠক পোশাক খাতের সমস্যা সমাধানে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান রাষ্ট্রপতির জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ট্রাম্পের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কুশল বিনিময় তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক: বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক আরও জোরদারের প্রত্যয় মার্কিন প্রেসিডেন্টের নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেলের সৌজন্য সাক্ষাৎ সমুদ্রের তলদেশে আটকা ১,৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ মবের শিকার হাজার শিক্ষক কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না

পরিমাণে বেশি, আয়ে কম: হাতছাড়া হচ্ছে উচ্চমূল্যের বিশাল বাজার

Reporter Name / ৪ Time View
Update : বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প বিশ্বজুড়ে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করলেও এর ভেতরে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। বহির্বিশ্বের বাজারে বাংলাদেশের এই বিশাল রপ্তানির সিংহভাগই দখল করে আছে সাধারণ বা ‘বেসিক’ ক্যাটাগরির পোশাক। টি-শার্ট, প্যান্ট, সোয়েটার কিংবা সাধারণ অন্তর্বাসের মতো অপেক্ষাকৃত কম মূল্যের পণ্যের ওপরই দেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধি এখনো আবর্তিত হচ্ছে। অন্যদিকে, বৈশ্বিক বাজারে বর্তমানে যে ধরনের উচ্চমূল্যের এবং বৈচিত্র্যময় পোশাকের কদর সবচেয়ে বেশি, সেই বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি একেবারেই নগণ্য। আউটারওয়্যার, স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল ওয়্যার কিংবা স্যুটের মতো বেশি দামের পোশাক রপ্তানিতে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ এখনো যোজন যোজন পিছিয়ে রয়েছে। সম্প্রতি ২০২৫ সালের ক্যালেন্ডার বছরের রপ্তানি উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেশের তৈরি পোশাক খাতের এমন হতাশাজনক চিত্র সামনে এসেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টারের (আইটিসি) হালনাগাদ তথ্য যাচাই করে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়ির এই বিস্তর ফারাক খুঁজে পেয়েছে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস (বিএভি)। ইপিবি প্রদত্ত তথ্যমতে, সদ্য বিদায়ী ২০২৫ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে মোট ৩৮ দশমিক ৮২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে। ঠিক একই সময়ে আইটিসির পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বজুড়ে তৈরি পোশাকের মোট বাণিজ্যের আকার ছিল প্রায় ৪২৬ বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল বৈশ্বিক বাণিজ্যের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে রপ্তানি হওয়া মোট পোশাকের প্রায় ৭৬ দশমিক ৯৪ শতাংশই হলো বেসিক বা সাধারণ ক্যাটাগরির পণ্য। অথচ সমগ্র বিশ্ববাজারে এই সাধারণ মানের পোশাকের চাহিদা বা অংশ হলো মাত্র ৬১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। পরিসংখ্যানগত দিক থেকে বিবেচনা করলে, বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় বাংলাদেশ প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি সাধারণ বা কম মূল্যের পোশাকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আছে।
বেসিক পোশাকের এই বিশাল ভলিউমের মধ্যে সবচেয়ে বড় দখল রয়েছে প্যান্ট বা বটমওয়্যারের। বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৩৩ দশমিক ৬৮ শতাংশই আসে এই শ্রেণির পণ্য থেকে, যেখানে সমগ্র বিশ্ববাজারে বটমওয়্যারের হিস্যা মাত্র ২১ দশমিক ৬৮ শতাংশ। একইভাবে টি-শার্ট রপ্তানির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। বিশ্বের মোট পোশাক বাণিজ্যে টি-শার্টের অংশ ১০ দশমিক ০৯ শতাংশ হলেও বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ১৮ দশমিক ৬৪ শতাংশই আসে এই একটিমাত্র পণ্য থেকে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, বেসিক পণ্যে এত আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও ছোটখাটো অ্যাক্সেসরিজ বা আনুষঙ্গিক পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ চরমভাবে পিছিয়ে আছে। বিশ্ববাজারে ছোট অ্যাক্সেসরিজের অবদান ৭ দশমিক ৫২ শতাংশ, কিন্তু বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িতে এর পরিমাণ মাত্র শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ, এই সম্ভাবনাময় উপখাতে বাংলাদেশ বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় ২১ গুণ পিছিয়ে রয়েছে, যা পণ্য বৈচিত্র্যকরণে দেশের চরম সীমাবদ্ধতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
সাধারণ বেসিক পণ্য এবং উচ্চমূল্যের পণ্যের মাঝামাঝি একটি স্তর রয়েছে, যাকে ‘সেমি-বেসিক’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। শার্ট এবং ব্লাউজ এই ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ১০ দশমিক ৩৩ শতাংশ আসে এই সেমি-বেসিক পণ্য থেকে, যা বিশ্ববাজারের গড় ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশের তুলনায় কিছুটা বেশি। কিন্তু বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এবং হতাশার জায়গাটি লুকিয়ে আছে ‘অ্যাডভান্সড’ বা উচ্চমূল্যের পোশাকের ক্ষেত্রে। আধুনিক বিশ্বে এখন আউটারওয়্যার, ড্রেস, টেকনিক্যাল ওয়্যার, স্পোর্টসওয়্যার এবং স্যুটের মতো উন্নত পোশাকের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বিশ্বব্যাপী মোট পোশাক বাণিজ্যের ৩০ দশমিক ৪৬ শতাংশই হলো এই উচ্চমূল্যের পণ্য। অথচ বাংলাদেশের বিশাল তৈরি পোশাক রপ্তানিতে এই দামি পণ্যগুলোর সম্মিলিত অবদান মাত্র ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
উচ্চমূল্যের পোশাকের এই বিশাল বাজারে সবচেয়ে বড় ফারাকটি দেখা যায় আউটারওয়্যার রপ্তানিতে। শীতপ্রধান দেশগুলোতে এবং বৈরী আবহাওয়ায় পরিধানযোগ্য এই পোশাকগুলোর দাম এবং মুনাফা দুই-ই অনেক বেশি থাকে। বিশ্ববাজারে মোট পোশাক রপ্তানির ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশই আসে আউটারওয়্যার থেকে। কিন্তু বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে এই আউটারওয়্যারের অংশ মাত্র ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ, বৈশ্বিক পোশাক বাণিজ্যের অন্যতম বৃহৎ এই ক্যাটাগরিটিতে বাংলাদেশ এখনো তার ন্যূনতম সক্ষমতার প্রমাণ রাখতে পারেনি। এর পাশাপাশি স্পোর্টসওয়্যার এবং টেকনিক্যাল টেক্সটাইলের মতো আধুনিক ও যুগোপযোগী পণ্যের বাজারেও বাংলাদেশের পদচারণা খুবই সীমিত পর্যায়ে আটকে আছে।
পোশাক খাতের এই সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিজিএমইএ-এর সাবেক পরিচালক এবং বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল অত্যন্ত গঠনমূলক মতামত তুলে ধরেছেন। তার মতে, বাংলাদেশের পোশাক খাত দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মূলত বেসিক পণ্যের ওপরই নিজেদের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রেখেছে। টি-শার্ট, সোয়েটার বা প্যান্ট তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কারখানাগুলোর দক্ষতা ও সক্ষমতা বিশ্বমানের। কিন্তু বিশ্ববাজারের রুচি, চাহিদা এবং ফ্যাশন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে। ক্রেতারা এখন ফাংশনাল বা বিশেষায়িত পোশাকের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। এমতাবস্থায় শুধু একই ধরনের গতানুগতিক পণ্যের পরিমাণ বা ‘ভলিউম’ বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। তিনি মনে করেন, উচ্চমূল্যের পণ্যের যে বিশাল বাজার বাংলাদেশ এখনো ধরতে পারেনি, ঠিক সেখানেই দেশের তৈরি পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় সুযোগ লুকিয়ে আছে।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের তৈরি পোশাক খাতকে এখন শুধু বেশি পরিমাণে কাপড় সেলাই করার দিকে না ঝুঁকে, বরং পণ্যের মান ও মূল্য সংযোজনের দিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। মহিউদ্দিন রুবেল স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, সনাতনী সুতি কাপড়ের নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে সিনথেটিক, নন-কটন পোশাক, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল এবং স্পোর্টসওয়্যারের উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি করতে হবে। বাংলাদেশ যদি বেসিক পণ্যের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের দামি পোশাকের বাজারে নিজেদের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে, তবে কারখানায় একই পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করেও বহুগুণ বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে। তাই দেশের পুরো পোশাক খাতের নীতিগত ও কৌশলগত লক্ষ্য এখন ‘ভলিউম’ বা পরিমাণের বদলে ‘ভ্যালু’ বা মূল্যের দিকে ধাবিত হওয়া উচিত। উল্লেখ্য, এই পরিসংখ্যানে ইপিবি এবং আইটিসির এইচএস-৬ কোডের তথ্যের মধ্যে প্রায় ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ বা ১ দশমিক ৩১৩ বিলিয়ন ডলারের সামান্য অমিল পাওয়া গেছে, যা বিশ্ববাজারের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ৫৯ শতাংশ। এই ছোট ব্যবধানটি মূলত দুই সংস্থার ডেটা রাউন্ডিং বা হিসাব পদ্ধতির পার্থক্যের কারণে হয়েছে, যা মূল চিত্রের সার্বিক বিশ্লেষণকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করে না।
তথ্যসূত্র: মানব জমিন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category