• রবিবার, ১০ মে ২০২৬, ০৭:০০ অপরাহ্ন
Headline
সীমান্তে রক্তপাত বন্ধ না করলে ভারতের সঙ্গে স্থায়ী বন্ধুত্ব অসম্ভব: রুহুল কবির রিজভী নৌযাত্রা শতভাগ নিরাপদ করতে সর্বোচ্চ সতর্ক সরকার: নৌমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম আসন্ন বাজেটে জ্বালানি, খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় বিপুল ভর্তুকি বাড়াচ্ছে সরকার সোশ্যাল মিডিয়ার সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে জনসচেতনতা কার্যক্রমে বড় বাধা: তথ্যমন্ত্রী শুধু রাজনীতি নয়, অর্থনীতিতেও গণতন্ত্র থাকতে হবে: অর্থমন্ত্রী মা দিবসে মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে সেরা ৮টি স্মার্ট গ্যাজেট ‘পুলিশকে আর কখনো ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের হাতিয়ার হতে দেওয়া হবে না’ — পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জোড়া হত্যা মামলায় আসাদুজ্জামান নূরের জামিন: হাইকোর্টের আদেশে কারামুক্তির পথে ‘বাকের ভাই’ সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের আয়কর নথি জব্দের নির্দেশ নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে দ্বিতীয় পদ্মা ও দ্বিতীয় যমুনা সেতুর দিকে এগোচ্ছে সরকার

পশ্চিমবঙ্গের কট্টর হিন্দুত্ববাদের উত্থান: সীমান্তের ওপারে মেঘ, এপারে উদ্বেগের ঝড়

বিশেষ বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন / ৫ Time View
Update : রবিবার, ১০ মে, ২০২৬

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর গত সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে যে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বা ‘বাম-লিবারেল’ ধারার প্রাধান্য ছিল, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তার এক চূড়ান্ত অবসান ঘটল। প্রথমবারের মতো কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংস বা নবান্নের দখল নিল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তথা গেরুয়া শিবির। এই ঐতিহাসিক পালাবদল কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নয়, বরং প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বলয়ে এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে নবনিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর শপথ গ্রহণের পরপরই সীমান্তে রক্তপাত এবং কলকাতার সংখ্যালঘু প্রধান এলাকায় ‘বুলডোজার’ সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ সেই উদ্বেগকে আরও ঘনীভূত করেছে।


ঐতিহাসিক পালাবদল ও নতুন মেরুকরণ

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গেরুয়া শিবিরের এই উত্থানকে বিশ্লেষকরা দেখছেন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির এক বড় ধরনের মোড় হিসেবে। গত কয়েক দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশের জন্য একটি ‘বন্ধুত্বপূর্ণ বাফার জোন’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির জয়জয়কার এখন সেই সমীকরণকে আমূল বদলে দিচ্ছে। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পরপরই কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় বুলডোজার দিয়ে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়ার যে চিত্র বিশ্বগণমাধ্যমে উঠে এসেছে, তা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষত ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। এই প্রতীকী কর্মকাণ্ড কেবল উচ্ছেদ অভিযান নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রতি কট্টর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের ইঙ্গিত বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।


শুভেন্দু অধিকারীর বাগাড়ম্বর ও ‘অনুপ্রবেশকারী’ তত্ত্ব

পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও কট্টর অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষ। তিনি প্রকাশ্য জনসভায় ঘোষণা করেছিলেন, ‘বাংলাদেশি মুসলমানরা অনুপ্রবেশকারী। তাদের ঝেটিয়ে বিদায় করা হবে।’

একজন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতার মুখে এমন ‘অশোভন’ ও ‘উস্কানিমূলক’ বক্তব্য দুই দেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে ভোটারদের মেরুকরণ করতে এই ভাষা ব্যবহার করা হলেও, ক্ষমতায় আসার পর যদি এই নীতির বাস্তবায়ন শুরু হয়, তবে তা বাংলাদেশের জন্য এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।


‘পুশিং-ব্যাক’ আতঙ্ক ও ৩ লাখ ভোটারের ভাগ্য

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. আসিফ মোহাম্মদ শাহান বর্তমান পরিস্থিতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, পশ্চিমবঙ্গে এখনও প্রায় ৩ লাখ ভোটার তালিকায় জায়গা পাননি। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে বিশেষ করে আসামের এনআরসি (NRC) এবং সিএএ (CAA) কার্যকর করার যে অতীত অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে যে—এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার বা ‘পুশ-ব্যাক’ করার একটি প্রচেষ্টা শুরু হতে পারে।

ড. শাহান মনে করেন, নির্বাচনের বিজয়কে যারা যেভাবে শনাক্ত করার চেষ্টা করছে, তাতে এই শঙ্কার জায়গাটি অত্যন্ত জোরালো। যদি সত্যিই এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে সেটি কেবল সীমান্ত অস্থিরতাই বাড়াবে না, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি করবে।


র রক্তাক্ত সীমান্ত: উত্তেজনার পারদ ঊর্ধ্বমুখী

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাব যেন মুহূর্তেই সীমান্তে পড়তে শুরু করেছে। শুভেন্দু অধিকারীর শপথ নেওয়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শুক্রবার (৮ মে) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে দুই বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। ১৮ ঘণ্টা পর বিএসএফ সেই মরদেহ ফেরত দিলেও সীমান্তের এই অস্থিরতা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।

এর আগে গত বুধবার (৬ মে) লালমনিরহাটের বুড়িমারী সীমান্তে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করার সময় এক ভারতীয় নাগরিককে বিজিবি বাধা দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছে। সীমান্ত হত্যার এই ধারাবাহিকতা এবং কট্টরবাদী রাজনীতির উত্থান—এই দুইয়ের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র খুঁজে পাচ্ছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ওপারে যখন উগ্র জাতীয়তাবাদ মাথাচাড়া দেয়, তখন সীমান্তে বিএসএফের আচরণ আরও মারমুখী হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে।


কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস পশ্চিমবঙ্গের এই নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের আচরণের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ওপার থেকে যেভাবে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে গালি দেওয়া বা হুমকি দেওয়া হচ্ছে, তা কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। এটি দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের পারস্পরিক শ্রদ্ধাশীল আচরণের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। অধ্যাপক ফেরদৌসের মতে, ওপারে মুসলিম নির্যাতন বাড়লে বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তৈরি হলে তার নেতিবাচক প্রভাব এপারেও পড়তে পারে, যা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ।


নিরাপত্তার হুমকি ও বিজিবির সর্বোচ্চ সতর্কতা

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. আব্দুর রব খান এই পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি ‘বড় ধরনের হুমকি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, ওপারে রাজনীতির ধরন বদলে যাওয়ার কারণে সীমান্তে এখন ড্রোন নজরদারি থেকে শুরু করে টহল অনেক গুণ বাড়াতে হবে। সীমান্ত সুরক্ষিত না করতে পারলে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ এবং চোরাচালানের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. সাবের আহমেদ চৌধুরী অবশ্য আশার কথা শুনিয়েছেন। তিনি মনে করেন, সীমান্ত স্থিতিশীল রাখা এবং দুই প্রান্তের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও আত্মিক সম্পর্ক বজায় রাখাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এই সম্পর্কের অবনতি হলে শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতকেও তার নেতিবাচক পরিণতি ভোগ করতে হবে। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে কৌশলগত সহযোগিতা ভারত পায়, সীমান্ত অস্থিতিশীল হলে তা ব্যাহত হতে পারে।


দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার ভবিষ্যৎ

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই উত্থান এবং শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্ব কেবল একটি রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক অস্থিরতার সংকেত দিচ্ছে। একদিকে বুলডোজার সংস্কৃতি আর অন্যদিকে সীমান্ত হত্যা—এই দুই মিলে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এরই মধ্যে লালমনিরহাটসহ গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে নজরদারি কয়েক গুণ বাড়িয়েছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশ বা সীমান্ত ঘিরে অস্থিতিশীলতা মোকাবিলায় তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তবে কেবল সামরিক প্রস্তুতি দিয়ে এই সংকট মেটানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের যৌক্তিক উদ্বেগগুলো তুলে ধরা।

পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার কি শেষ পর্যন্ত তাদের কট্টর অবস্থান থেকে সরে এসে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করবে, নাকি সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়ে অঞ্চলটিকে অস্থিতিশীল করে তুলবে—সেই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ।


সূত্র: সময় নিউজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category