পবিত্র ঈদুল আজহা বা কুরবানির ঈদকে সামনে রেখে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সরকারি ছুটির তালিকায় বড় ধরনের রদবদল আনা হয়েছে। রাজ্য সরকারের পূর্বঘোষিত দুই দিনের ছুটি সম্পূর্ণ বাতিল করে এবার মাত্র এক দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শনিবার (২৩ মে) রাজ্যের প্রশাসনিক সদর দপ্তর নবান্ন থেকে প্রকাশিত এক জরুরি নির্দেশনায় এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। রাজ্যের শাসন ক্ষমতায় ঐতিহাসিক পালাবদলের পর নতুন সরকারের এই সিদ্ধান্ত সরকারি কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সহকারী মুখ্যসচিব পি কে মিশ্রের স্বাক্ষর করা নতুন এই সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে ছুটির দিনক্ষণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা সাধারণত চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। তবে সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে আগে থেকেই ছুটির একটি সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা থাকে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এ বছর পশ্চিমবঙ্গে কুরবানির ঈদ পালিত হবে ২৮ মে, বৃহস্পতিবার। আর তাই রাজ্য সরকার শুধুমাত্র ওই দিনটিতেই (২৮ মে) সরকারি ছুটি বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সরকারি ছুটির পরিবর্তন একনজরে:
নতুন এই নির্দেশনার ফলে বিগত সরকারের আমলে নেওয়া আগের সিদ্ধান্তটি বাতিল বলে গণ্য হচ্ছে। এর আগে, গত বছরের অর্থাৎ ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর তৎকালীন রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ২০২৬ সালের সরকারি ছুটির যে বার্ষিক ক্যালেন্ডার বা তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল, সেখানে ঈদুল আজহা উপলক্ষে ২৬ ও ২৭ মে (মঙ্গলবার ও বুধবার) দুই দিন সরকারি ছুটি নির্ধারণ করা হয়েছিল।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় চাঁদ দেখার হিসাব এবং নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর সিদ্ধান্তে সেই আগের ক্যালেন্ডারটি সংশোধন করা হয়েছে। নবান্নের জারি করা নির্দেশনায় স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আগের ঘোষিত ২৬ ও ২৭ মে আর সরকারি ছুটি থাকছে না। এই দুই দিন রাজ্যের সমস্ত সরকারি অফিস, আদালত, স্কুল-কলেজ এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ স্বাভাবিক নিয়মেই খোলা থাকবে এবং এগুলোকে নিয়মিত কর্মদিবস হিসেবেই গণ্য করা হবে।
সরকারি ছুটির এই পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটিকে কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক রদবদল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনের সবচেয়ে বড় কারণ হলো পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক দৃশ্যপটে ঘটে যাওয়া এক ভূকম্পনতুল্য পরিবর্তন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে, যা রাজ্যের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোতেও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
নির্বাচনী ফলাফল ও ক্ষমতার সমীকরণ:
বিজেপির নিরঙ্কুশ জয়: এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এক ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করেছে।
আসন সংখ্যা: ২৯৪ আসনের বিধানসভায় বিজেপি একাই জয়লাভ করেছে ২০৭টি আসনে, যা তাদের পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো সরকার গঠনের সুযোগ করে দিয়েছে।
তৃণমূলের পতন: অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের আসন সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে মাত্র ৮০টিতে নেমে এসেছে।
নতুন মুখ্যমন্ত্রী: এই বিশাল জয়ের পর রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী।
শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন এই নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই রাজ্যের প্রশাসনিক কাজে গতিশীলতা আনতে এবং পূর্ববর্তী সরকারের অনেক সিদ্ধান্তই নতুন করে মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে। ছুটির তালিকার এই সংশোধন তারই একটি প্রশাসনিক প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রশাসনিক মহলের মতে, আগের সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গে কথায় কথায় দীর্ঘ ছুটির একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল বলে প্রায়ই সমালোচনা হতো। নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার হয়তো সেই ‘হলিডে কালচার’ থেকে বেরিয়ে এসে রাজ্যে একটি কঠোর কর্মসংস্কৃতি বা ‘ওয়ার্ক কালচার’ প্রতিষ্ঠা করার প্রচ্ছন্ন বার্তা দিতে চাইছে।
উৎসবের দিনটিতে ছুটি বরাদ্দ রেখে বাকি দিনগুলোতে সরকারি কাজ স্বাভাবিক রাখলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে এবং প্রশাসনিক কাজে গতি আসবে বলে নতুন সরকার মনে করছে। বিশেষ করে নতুন সরকার গঠনের পরপরই জনগণের কাছে একটি ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল ভাবমূর্তি তুলে ধরার এটি একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হতে পারে।
নবান্নের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে রাজ্যের সাধারণ মানুষ এবং বিশেষ করে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
যাতায়াতে বিপত্তি: কুরবানির ঈদের ছুটিতে অনেক সরকারি কর্মী বা শহরের বাসিন্দা তাদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে উৎসব পালন করতে পছন্দ করেন। আগে দুই দিন ছুটি থাকায় এবং এর সাথে সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে অনেকেই দীর্ঘ ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন।
পরিকল্পনায় বদল: এখন ২৬ ও ২৭ মে অফিস খোলা থাকায় এবং শুধুমাত্র বৃহস্পতিবার (২৮ মে) ছুটি থাকায় দূরপাল্লার যাত্রায় অনেকেই অসুবিধায় পড়বেন। কারণ পরের দিন শুক্রবার আবারও অফিস খোলা।
ঈদ উদযাপনে প্রভাব: ছুটি কমে যাওয়ার কারণে অনেকেই হয়তো এবার আর গ্রামের বাড়িতে না গিয়ে শহরেই ঈদ উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
তবে অনেকেই সরকারের এই সিদ্ধান্তকে বাস্তবসম্মত বলে মনে করছেন। তাদের মতে, যেহেতু ঈদ বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে, তাই আগের মঙ্গল ও বুধবার ছুটি দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা ছিল না।
ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত কুরবানির ঈদ মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত পবিত্র একটি দিন। পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আবহে ছুটির দিন কমলেও উৎসবের আনন্দ ও ভাবগাম্ভীর্য বিন্দুমাত্র ম্লান হবে না বলেই সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা। নতুন সরকারের এই প্রশাসনিক রদবদলের মধ্য দিয়েই রাজ্যবাসী এবার ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে ঈদুল আজহা উদযাপন করতে যাচ্ছেন।