• সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৯ পূর্বাহ্ন

পূর্বাভাস সতর্কবার্তায় প্রস্তুতি কোথায়?

Reporter Name / ৫ Time View
Update : সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬

অর্থনীতির বড় বড় সংখ্যা সাধারণ মানুষের কাছে অনেক সময় বিমূর্ত মনে হতে পারে। প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ না ৪ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি কত দশমিক পয়েন্ট বাড়ল কিংবা খেলাপি ঋণের হার কত হলো—এসব পরিসংখ্যানের সঙ্গে একজন বাজারফেরত মানুষের বাস্তবতার দূরত্ব খুব বেশি নয়। কারণ এসব সংখ্যার প্রতিফলন শেষ পর্যন্ত দেখা যায় বাজারের ব্যাগে, পরিবারের মাসিক বাজেটে, চাকরির সুযোগে এবং ব্যবসার হিসাবের খাতায়। তাই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর একের পর এক সতর্ক পূর্বাভাসকে নিছক পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে কিছু পার্থক্য থাকলেও মূল বার্তাটি প্রায় অভিন্ন। প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে, মূল্যস্ফীতির চাপ রয়ে গেছে, বিনিয়োগ দুর্বল এবং ব্যাংক খাতের সংকট অর্থনীতির ওপর বাড়তি বোঝা তৈরি করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা এবং খাদ্য ও জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে বাড়তি ঝুঁকি। প্রশ্ন হলো, এসব পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা আমরা কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছি।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসা এবং দারিদ্র্যের হার ২২ দশমিক ৫ শতাংশে ওঠা শুধু অর্থনীতির দুর্বলতার পরিসংখ্যান নয়। এর পেছনে রয়েছে মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের বাস্তব সংকট। এক বছরে বিপুলসংখ্যক মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়লে সেটি উন্নয়নের ধারাবাহিকতার জন্য স্পষ্ট সতর্ক সংকেত। একই সঙ্গে সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর একটি বড় অংশ সামাজিক সুরক্ষার বাইরে থাকা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলছে।

এডিবি ও আইএমএফও প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তাদের মূল্যায়নে জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা, দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থা, রাজস্ব ঘাটতি এবং মূল্যস্ফীতির মতো বিষয়গুলো বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে সীমিত করছে। সংখ্যার পার্থক্য নিয়ে বিতর্কের চেয়ে বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতার দিকে নজর দিচ্ছে। অর্থাৎ সমস্যাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।

জ্বালানি সংকট এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ। গ্যাসের চাপ কমলে কারখানার উৎপাদন কমে, বিদ্যুতের ঘাটতি হলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, কর্মঘণ্টা কমে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শ্রমিকের কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়ে। উৎপাদন কমলে সরবরাহ কমে, কিন্তু ব্যয় বাড়ে। সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামে যুক্ত হলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। ফলে জ্বালানি সংকট শুধু শিল্পের সমস্যা নয়, এটি একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে যুক্ত একটি অর্থনৈতিক সমস্যা।

বিশ্ব অর্থনীতির বাইরের ঝুঁকিও এখন কম নয়। যুদ্ধ, খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে এসব ধাক্কার প্রভাব দ্রুত পৌঁছে যায়। জ্বালানি, সার কিংবা খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক দাম বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় বাড়ে, চাপ পড়ে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর, বাড়ে উৎপাদন ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত তার বোঝা এসে পড়ে ভোক্তার ওপর।

এ অবস্থায় ব্যাংক খাতের দুর্বলতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকলে ব্যাংকের সক্ষমতা কমে যায়। তখন ভালো ব্যবসায়ীও ঋণ পেতে সমস্যায় পড়েন। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। বিনিয়োগ কমলে নতুন কারখানা, নতুন ব্যবসা ও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও কমে যায়। ফলে অর্থনীতি ধীর হয়ে যাওয়ার সঙ্গে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা যুক্ত হয়ে একটি নেতিবাচক চক্র তৈরি করতে পারে।

এই চক্র ভাঙতে হলে ব্যাংক খাত সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি দরকার। শুধু তারল্য সহায়তা দিয়ে দুর্বল প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখলে সমস্যার মূল কারণ দূর হবে না। ঋণখেলাপির কারণ, ব্যাংক পরিচালনার দুর্বলতা এবং ঋণ বিতরণে অনিয়ম—সবকিছুর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষা ও উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।

রাজস্বের দুর্বলতাও দীর্ঘমেয়াদি বড় সমস্যা। সরকারের ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু রাজস্ব আদায় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, জ্বালানি এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য সরকারের যে অর্থ দরকার, তা সংগ্রহ করতে হলে করের আওতা বাড়াতে হবে। তবে এর অর্থ সাধারণ করদাতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা নয়। বরং কর ফাঁকি কমানো, কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো এবং করের ভিত্তি সম্প্রসারণ করাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।

খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টিও এখন থেকেই গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বাড়লে আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই খাদ্যশস্য, সার ও জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুদ, আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং কৃষকের উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। সংকট দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগেই প্রস্তুতি নেওয়া অনেক কম ব্যয়বহুল এবং কার্যকর।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অর্থনীতির সাফল্য শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধি দিয়ে বিচার করা যাবে না। মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ছে কি না, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে কি না, দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমছে কি না, শিল্পকারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে কি না এবং ব্যাংক থেকে উৎপাদনশীল খাতে ঋণ যাচ্ছে কি না—এসব সূচকও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও আইএমএফের পূর্বাভাস শেষ পর্যন্ত কতটা নির্ভুল হবে, সেটিই মূল প্রশ্ন নয়। বরং তিনটি প্রতিষ্ঠানই যখন একই ধরনের ঝুঁকির কথা বলছে, তখন সেটিকে সতর্ক সংকেত হিসেবে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। পূর্বাভাস ভুল প্রমাণ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়া। অর্থনীতির দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে এখনই সংস্কার করা গেলে বৈশ্বিক ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা বাড়বে। আর সতর্কবার্তাগুলো উপেক্ষা করে সংকট গভীর হওয়ার অপেক্ষায় থাকলে তখন নীতিনির্ধারকদের হাতে থাকবে শুধু ক্ষয়ক্ষতি সামলানোর কঠিন কাজ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category