বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলের আঙিনায় বিদেশি খেলোয়াড় ও কোচদের আগমন কোনো নতুন বিষয় নয়। স্বাধীনতার পরপরই সত্তরের দশকে ঐতিহ্যের ধারক মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হাত ধরে ভারতীয় দুই ফুটবলারের মাধ্যমে এ দেশে বিদেশি খেলোয়াড়দের পদচারণা শুরু হয়েছিল। একই সময়ে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ঢাকা আবাহনী প্রথমবারের মতো আইরিশ কোচ এনে ডাগআউটে দাঁড় করায়। সেই থেকে বিগত পাঁচ দশক ধরে দেশের ক্লাব ফুটবলে বিদেশি তারকা ও কোচদের প্রভাব কেবল বৃদ্ধিই পেয়েছে। বিশেষ করে আশির দশক থেকে আফ্রিকার ফুটবলারদের আধিপত্য এবং ২০০৭ সালে পেশাদার লিগ চালুর পর থেকে বিদেশি খেলোয়াড়দের নৈপুণ্যই মূলত ঘরোয়া ট্রফি জয়ের প্রধান নিয়ামক হয়ে ওঠে। কিন্তু মাঠের সেই সাফল্য ও জৌলুশ এখন ফিফার একের পর এক কঠোর শাস্তিমূলক নিষেধাজ্ঞার নিচে ঢাকা পড়ে গেছে। চুক্তি অনুযায়ী বিদেশি ফুটবলার ও কোচদের সময়মতো পারিশ্রমিক পরিশোধ না করা এবং আর্থিক অব্যবস্থাপনার কারণে আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশনের (ফিফা) দলবদল নিষেধাজ্ঞার বা ‘ট্রান্সফার ব্যান’-এর কবলে পড়ে দেশের ফুটবল এখন এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে।
বিগত চার বছর ধরে দেশের শীর্ষ ক্লাবগুলোর সাথে বিদেশি খেলোয়াড় ও কোচদের দেনা-পাওনা নিয়ে চরম অস্থিরতা চলছে। একসময় খেলোয়াড়দের অভিযোগ বড়জোর দেশের ফেডারেশন পর্যন্ত পৌঁছালেও বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে তা সরাসরি গড়াচ্ছে ফিফার বিচারিক দরবারে। সেখানে ক্লাবগুলোর চরম গাফিলতি ও চুক্তিভঙ্গের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়ায় একের পর এক ক্লাবের ওপর এক থেকে তিন মৌসুমের জন্য দলবদলের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে। অতীতে ফেনী সকার ক্লাবের মতো দল থেকে এই ধারার শুরু হলেও পরবর্তীতে তা ছড়িয়ে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান, শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব, শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র, ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাব এবং দেশের ফুটবলের বর্তমান দুই পরাশক্তি বসুন্ধরা কিংস ও ঢাকা আবাহনীর ওপর। মোহামেডান কিংবা শেখ রাসেল একপর্যায়ে পাওনা পরিশোধ করে জটিলতা মুক্ত হলেও বর্তমান সময়ে ঘরোয়া ফুটবলের নতুন মৌসুমের ঠিক আগমুহূর্তে এই সংকট এক বিধ্বংসী রূপ ধারণ করেছে।
বিশেষ করে দেশের ফুটবলের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংস এবং সাবেক চ্যাম্পিয়ন আবাহনী লিমিটেডের ওপর নেমে আসা নিষেধাজ্ঞা পুরো ক্রীড়াঙ্গনকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। তথ্যানুযায়ী, একটি ক্লাবের বিরুদ্ধেই ফিফার একাধারে ১৪টি কার্যকর দলবদল নিষেধাজ্ঞা থাকার ঘটনা বৈশ্বিক ফুটবলেই বিরল। অন্যদিকে আবাহনীর কাঁধেও রয়েছে ৩টি সক্রিয় নিষেধাজ্ঞা। এই দুই শীর্ষ ক্লাব নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ করে ফিফার নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত হতে না পারলে নতুন ফুটবল মৌসুমে তাদের অংশগ্রহণ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। শীর্ষ দুই দলকে খেলায় রাখার স্বার্থে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) বারবার ক্লাব লাইসেন্সিং ও খেলোয়াড় নিবন্ধনের সময়সীমা বৃদ্ধি করে চলেছে। তবে ফিফার নিয়মের বেড়াজালে সেই সময়সীমাও শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। যদি শেষ পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ধনী দুই ক্লাব লিগ থেকে ছিটকে পড়ে, তবে তা কেবল তাদের জন্যই নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত বিপর্যয় ও জাতীয় লজ্জা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা ঘরোয়া ফুটবলে অতীতে এমন পরিস্থিতি কেন দেখা যায়নি আর এখনই কেন তা মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে—তা নিয়ে ফুটবলাঙ্গনে চলছে গভীর চুলচেরা বিশ্লেষণ। এটি কি নিছকই ফিফার আধুনিক নিয়মনীতি সম্পর্কে ক্লাব কর্মকর্তাদের অজ্ঞতা, নাকি পেশাদারিত্বের চূড়ান্ত অভাব? ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, সত্তরের বা আশির দশকে বিদেশি খেলোয়াড় বা কোচদের নিয়োগ ছিল মূলত মৌখিক বা আধা-আনুষ্ঠানিক সমঝোতার ভিত্তিতে। তখন চুক্তির আর্থিক অঙ্ক ছিল খুবই সীমিত এবং অপেশাদার বা অপেশাদারিত্বের কাঠামো থাকায় খেলোয়াড়রা সরাসরি ফিফায় যাওয়ার পথ পেতেন না। কিন্তু বর্তমানে আধুনিক পেশাদার ফুটবলে ফিফার ‘রেগুলেশনস অন দ্য স্ট্যাটাস অ্যান্ড ট্রান্সফার অব প্লেয়ার্স’ (আরএসটিপি) অত্যন্ত কঠোর ও বাধ্যতামূলক। এখন কোটি টাকার লিখিত চুক্তি সম্পাদিত হয় এবং খেলোয়াড় ও তাদের আন্তর্জাতিক এজেন্টরা নিজেদের আইনি অধিকার সম্পর্কে শতভাগ সচেতন। ফলে লিখিত চুক্তি ভেঙে পারিশ্রমিক আটকে রাখা বা একতরফাভাবে চুক্তি বাতিল করলে ফিফার প্লেয়ার্স স্ট্যাটাস কমিটি ক্লাবের ওপর তাত্ক্ষণিক দলবদল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
দেশের ক্লাবগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অজ্ঞতা ও পেশাদারিত্বের অভাব—দুটোই এখানে গভীরভাবে জড়িত। অনেক ক্লাবই নিজেদের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে খেলোয়াড়দের সাথে চুক্তি করে, যাকে ফুটবলের ভাষায় বলা হয় ‘ওভার ট্রেডিং’। পরবর্তীতে আর্থিক সংকট দেখা দিলে বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে ক্লাবের পরিচালনা পর্ষদ বদলে গেলে আগের চুক্তিগুলো অস্বীকার করার এক ধরনের সংস্কৃতি দেখা যায়। তাছাড়া স্থানীয় ফুটবলাররা বছরের পর বছর ক্লাবের কাছে লাখ লাখ টাকা বকেয়া থাকা সত্ত্বেও সম্পর্কের খাতিরে বা ক্যারিয়ারের ভয়ে চুপচাপ বাফুফের ধীরগতির শুনানির ওপর নির্ভর করে থাকেন। কিন্তু বিদেশি ফুটবলাররা কোনো ধরনের ছাড় না দিয়ে সরাসরি আন্তর্জাতিক ফোরামে নালিশ করেন। স্থানীয় খেলোয়াড়দের সাথে করা অপেশাদার আচরণের অভ্যাস বিদেশিদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে গিয়েই মূলত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে ফেঁসে যাচ্ছে দেশের ক্লাবগুলো।
অনেকের মনে এই ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ফিফা হয়তো একতরফাভাবে খেলোয়াড়দের পক্ষ নিয়ে ক্লাবগুলোকে শাস্তি দিচ্ছে। কিন্তু আরএসটিপির আইনি কাঠামো পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, নিয়মটি উভয় পক্ষের জন্যই সমান প্রযোজ্য। খেলোয়াড় যদি কোনো বৈধ কারণ ছাড়া চুক্তি ভেঙে চলে যান, তবে তাঁকেও চার থেকে ছয় মাসের জন্য মাঠ থেকে নিষিদ্ধ করা যায় এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ে বাধ্য করা যায়। তবে পারিশ্রমিক সংক্রান্ত বিরোধে শাস্তি সাধারণত ক্লাবের দিকেই বেশি যায়, কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্লাবগুলোই আগে চুক্তি লঙ্ঘন করে বেতন বন্ধ করে দেয়। ফিফার নিয়মানুযায়ী, কোনো খেলোয়াড়কে পর পর দুই মাস বেতন না দিলে তিনি লিখিত নোটিশ দিয়ে মাত্র ১৫ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে চুক্তি বাতিল করতে পারেন। সেই সময় পার হয়ে গেলে ক্লাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ ও ট্রান্সফার ব্যানের ঝুঁকিতে পড়ে। ফিফার ডিসপিউট রেজোলিউশন চেম্বার কেবল মুখের কথায় নয়, সম্পূর্ণ নথিপত্র ও ব্যাংক স্টেটমেন্টের ভিত্তিতে রায় প্রদান করে। ফলে ক্লাবের দুর্বল প্রমাণাদি তাদের আরও বেশি বিপদের মুখে ঠেলে দেয়।
দেশের সিনিয়র ক্রীড়া বিশ্লেষক ও সাবেক তারকা ফুটবলারদের মতে, বসুন্ধরা কিংসের মতো বিপুল আর্থিক সক্ষমতাসম্পন্ন আধুনিক ক্লাব কীভাবে ১৪টি নিষেধাজ্ঞার জালে আটকা পড়ল, তা এক বড় রহস্য ও গভীর বিস্ময়ের বিষয়। অর্থ সংকট না থাকলেও প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, অভ্যন্তরীণ গাফিলতি কিংবা ফিফার আইনকে হালকাভাবে নেওয়ার প্রবণতাই হয়তো এমন বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে। যে ক্লাবকে দেশের বাকি ক্লাবগুলো আধুনিক ফুটবলের ‘রোল মডেল’ হিসেবে অনুসরণ করার চেষ্টা করছিল, তাদের এমন পদস্খলন বাকি ক্লাবগুলোর সার্বিক পেশাদারিত্বের ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি অভিভাবক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের দায়ও কোনো অংশে কম নয়। শুরু থেকেই প্রতিটি ক্লাবের আর্থিক স্বচ্ছতা নজরদারি করা, সময়মতো দেনা মেটানোর বিষয়ে বাধ্যবাধকতা তৈরি করা কিংবা প্রয়োজনে মধ্যস্থতা করে বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক স্তরে যাওয়ার আগেই নিষ্পত্তি করার ক্ষেত্রে ফেডারেশনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এই নিষেধাজ্ঞার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হওয়া আমাদের ঘরোয়া ফুটবলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে। ভারত বা অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের ক্লাবগুলো হুটহাট করে চুক্তি করে না এবং তারা ফিফার প্রযুক্তিগত ও আইনি প্ল্যাটফর্মগুলো শতভাগ অনুসরণ করে পরিচালিত হয়। ফলে তাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের জটিলতা কদাচিৎ ঘটলেও বাংলাদেশের ফুটবলে তা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বিশ্বমঞ্চে যখন বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেম ও সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা তৈরি হচ্ছে, ঠিক তখন শীর্ষ ক্লাবগুলোর এমন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা দেশের সার্বিক সুনামকে ধুলায় মিশিয়ে দিচ্ছে।
এই অন্তহীন সংকট থেকে উত্তরণের পথ অত্যন্ত স্পষ্ট। পেশাদারিত্ব কেবল সুন্দর স্টেডিয়াম তৈরি বা বড় অঙ্কের ট্রফি জয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পেশাদারিত্বের মূল ভিত্তি হলো চুক্তির পবিত্রতা রক্ষা করা, আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। ক্লাবগুলোকে মুখের কথার বদলে সম্পূর্ণ পেশাদার ও আন্তর্জাতিক মানের লিখিত চুক্তির আওতায় আসতে হবে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী দল গঠন করতে হবে। একই সাথে বাফুফেকে একটি কার্যকর ও স্বচ্ছ মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে, যা ক্লাবগুলোর চুক্তি ব্যবস্থাপনা নিয়মিত তদারকি করবে। পুরোনো ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা ও দায়সারা মনোভাব পরিহার করে আধুনিক ফুটবলের কঠোর নিয়মাবলি মেনে চলা ছাড়া বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলের অস্তিত্ব ও আন্তর্জাতিক মান রক্ষা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।