দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে ভারত একটি বিশাল এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র। ভৌগোলিক অবস্থান, বিপুল জনসংখ্যা, চার ট্রিলিয়ন ডলারের শক্তিশালী অর্থনীতি এবং বিশাল সামরিক শক্তির কারণে এই অঞ্চলে ভারতের প্রভাব অনস্বীকার্য। ভারতের মোট নয়টি প্রতিবেশী দেশ রয়েছে। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণভাবে ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ বা ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির ঘোষণা দিয়েছিলেন। কাগজে-কলমে এই নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল আশপাশের দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং পারস্পরিক উন্নয়নের মাধ্যমে পুরো অঞ্চলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। বাহ্যিকভাবে এই ঘোষণা অত্যন্ত ইতিবাচক শোনালেও, এক দশক পর আজ যখন এই নীতির বাস্তব ফলাফল মূল্যায়ন করা হচ্ছে, তখন এক চরম বৈপরীত্য এবং হতাশার চিত্র ফুটে ওঠে। বর্তমানে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর সাধারণ মানুষের মনে এই বিশাল দেশটির প্রতি এক গভীর ক্ষোভ, বিরক্তি এবং আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। কূটনৈতিক পর্যায়ে দেশের নেতারা হয়তো ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে করমর্দন করছেন, কিন্তু পর্দার আড়ালে এবং সাধারণ মানুষের মনে ভারতের ভূমিকা নিয়ে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন ঝুলছে। ভারত কি এই অঞ্চলে একটি দায়িত্বশীল নেতার ভূমিকা পালন করছে, নাকি কেবলই নিজের আধিপত্য বিস্তারের আগ্রাসী খেলায় মেতে উঠেছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রতিটি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভারতের বর্তমান সম্পর্কের দিকে বিস্তারিত নজর দিতে হবে।
বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যকার সম্পর্কের ইতিহাস অত্যন্ত গভীর এবং বহুমাত্রিক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ঐতিহাসিক এবং সামরিক অবদানকে বাংলাদেশের মানুষ চিরকাল গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কেবল অতীত ইতিহাসের কৃতজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকতে পারে না। স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন অমীমাংসিত ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কের ভেতরে নানা মাত্রিক অস্বস্তি জমা হতে শুরু করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং সংবেদনশীল বিষয়টি হলো তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি। বছরের পর বছর ধরে এই চুক্তিটি ঝুলে আছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি এবং পরিবেশ ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কিন্তু চুক্তির খসড়া আজও ভারতের কোনো সরকারি দপ্তরের ধুলোমাখা আলমারিতে বন্দী হয়ে আছে। এর পাশাপাশি রয়েছে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ-এর গুলিতে নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের নিহত হওয়ার ঘটনা। এই সীমান্ত হত্যাকাণ্ড দুই দেশের মানুষের মধ্যকার আস্থার ভিত্তিকে প্রতিনিয়ত দুর্বল করে দিচ্ছে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও বৈষম্য অত্যন্ত প্রকট। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বর্তমান বাণিজ্য ঘাটতি ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ হলো, ভারত তাদের বিশাল বাজারটি বাংলাদেশি পণ্যের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত করে না, বরং নানা অশুল্ক বাধা তৈরি করে রাখে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের বাজারে ভারতীয় পণ্যের একচেটিয়া আধিপত্য। ট্রানজিট সুবিধা, বন্দর ব্যবহার কিংবা বিদ্যুৎ খাতের মতো বড় চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়েছে যে, এই সমীকরণে ভারত একতরফাভাবে বেশি সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের কথিত হস্তক্ষেপের বিষয়টি এই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে। দেশের তিনটি বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনে ভারতের পরোক্ষ এবং নীরব সমর্থনের বিষয়টি জনমনে তীব্র সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সঙ্গে ভারতের গভীর যোগাযোগের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারতবিরোধী ক্ষোভ এখন স্মরণকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অনেকেই এখন ভারতকে আর সমমর্যাদার বন্ধু মনে করেন না, বরং এমন এক সুবিধাবাদী প্রতিবেশী মনে করেন যে নিজের স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে মুখ ফিরিয়ে নিতে দ্বিধা করে না।
নেপালের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েনও এই আধিপত্যবাদী মানসিকতারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ। ভৌগোলিক আয়তনে এবং অর্থনীতিতে নেপাল ছোট হতে পারে, কিন্তু তাদের আত্মসম্মানবোধ এবং সার্বভৌমত্বের চেতনা অত্যন্ত প্রখর। ২০১৫ সালে নেপাল যখন নিজেদের মতো করে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করছিল, তখন ভারতের প্রচ্ছন্ন সমর্থনে নেপালের ওপর এক ভয়াবহ অঘোষিত অর্থনৈতিক অবরোধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। একটি স্থলবেষ্টিত দেশের জন্য এই অবরোধ ছিল চরম অমানবিক। এই ঘটনা নেপালের সাধারণ মানুষের মনে ভারতের প্রতি এক গভীর এবং স্থায়ী ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তাছাড়া লিপুলেখ, কালাপানি এবং লিম্পিয়াধুরা নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সীমান্ত বিরোধ তো রয়েছেই। নেপালের জনগণের একটি বড় অংশ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, ভারত তাদের স্বাধীন অস্তিত্ব এবং সার্বভৌমত্বকে কখনোই সমমর্যাদার চোখে দেখে না এবং প্রতিনিয়ত তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করে।
ভারত মহাসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে ভারতের কূটনৈতিক ব্যর্থতা আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত বছর মালদ্বীপের নির্বাচনে ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতার মসনদে বসেন মোহাম্মদ মুইজ্জু। তার নির্বাচনী প্রচারণার প্রধান হাতিয়ারই ছিল ‘ইন্ডিয়া আউট’ বা ভারত হঠাও স্লোগান, যা মালদ্বীপের সাধারণ মানুষের কাছে অভাবনীয় সাড়া ফেলেছিল। ক্ষমতায় বসার পরপরই তিনি মালদ্বীপে অবস্থানরত ভারতীয় সেনাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কঠোর দাবি তোলেন। ভারতের যাবতীয় কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক চাপকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে মালদ্বীপ অত্যন্ত সচেতনভাবে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। ভারত যত বেশি চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করেছে, মালদ্বীপ যেন তত বেশি ভারতের নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসার পথ প্রশস্ত করেছে। এটি ভারতের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ নীতির গালে একটি বিশাল চপেটাঘাত।
শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও ভারতের ভূমিকার মধ্যে এক ধরনের মহাজনি মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা যখন তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্বের মুখে পড়েছিল, তখন ভারত তাদের দিকে আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। প্রাথমিকভাবে এটিকে বন্ধুত্বের এক নতুন অধ্যায় মনে হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে যায় যে এই সহায়তার আড়ালে ভারতের সুদূরপ্রসারী কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের হিসাব লুকিয়ে ছিল। ভারত নিজেদের নিরাপত্তার অজুহাত তুলে শ্রীলঙ্কায় চীনের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে প্রকাশ্য বাধা প্রদান করে এবং চীনা জাহাজের লঙ্কান বন্দরে ভেড়ার বিষয়ে আপত্তি জানায়। এর ফলে দুই দেশের সম্পর্কে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন অস্বস্তি তৈরি হয়। এর ওপর ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মেরুকরণের জন্য নরেন্দ্র মোদী সরকার নির্বাচনের আগে হঠাৎ করেই কাচ্চাতিভু দ্বীপের মালিকানার প্রসঙ্গটি নতুন করে খুঁচিয়ে তোলে। অথচ ১৯৭৪ সালে খোদ ভারতের কংগ্রেস সরকারই একটি চুক্তির মাধ্যমে এই দ্বীপটি আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রীলঙ্কাকে হস্তান্তর করেছিল। ভোটব্যাংকের রাজনীতির জন্য এমন পুরোনো এবং মীমাংসিত ইস্যু তুলে আনায় শ্রীলঙ্কার মানুষের মনে ভারতের উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে সন্দেহের দানা বেঁধেছে।
অন্যদিকে, হিমালয় কন্যখ্যাত ভুটানকে সব সময় ভারতের সবচেয়ে অনুগত এবং ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সামরিক সুরক্ষা থেকে শুরু করে বৈদেশিক নীতি এবং অর্থনীতি—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভুটান ভারতের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু ভূ-রাজনীতির পরিবর্তনের হাওয়ায় এখন সেই ভুটানও ভারতের ছায়া থেকে বেরিয়ে চীনের সঙ্গে আলাদাভাবে সীমান্ত আলোচনা শুরু করেছে। চীনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, ভুটান তা সরাসরি নাকচ না করে বরং ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে। এটি ভারতের পররাষ্ট্রনীতির জন্য এক বিশাল অশনিসংকেত। পূর্ব সীমান্তের দিকে তাকালে মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ এবং জান্তা সরকারের পতনের আশঙ্কায় সেখানে ভারতের করা শত শত কোটি টাকার কৌশলগত বিনিয়োগ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঝুলছে। আর চিরশত্রু পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। ১৯৪৭ সালের রক্তক্ষয়ী দেশভাগ, কাশ্মীর সংকট, একাধিক প্রত্যক্ষ যুদ্ধ এবং নিয়মিত সীমান্ত উত্তেজনার কারণে এই দুই দেশের সম্পর্কে আস্থার কোনো স্থান নেই। ১৯৬০ সালের সিন্ধু নদ পানি চুক্তি থাকলেও তা নিয়ে প্রতিনিয়ত মতবিরোধ এবং অভিযোগ লেগেই আছে। আফগানিস্তানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গেও ভারত এখনো একটি স্থিতিশীল এবং পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়নি।
এই পুরো সমীকরণে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি। যদিও চীন ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার অংশ নয়, কিন্তু কৌশলগত দিক থেকে এই অঞ্চলে চীনের ছায়া প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হচ্ছে। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটায় বিশাল বন্দর নির্মাণ, পাকিস্তানে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপিইসি, নেপালে ব্যাপক অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এবং মালদ্বীপে চীনের প্রভাব বলয় তৈরি—সব মিলিয়ে চীন এমনভাবে এই অঞ্চলে নিজের শেকড় গাড়ছে যা ভারতের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত এই পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে প্রায়শই তার ছোট প্রতিবেশীদের ওপর চীনের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার জন্য একতরফা চাপ প্রয়োগ করে। কিন্তু বলপ্রয়োগের এই নীতি হিতে বিপরীত ফল বয়ে আনছে। ছোট দেশগুলো ভারতের এই অভিভাবকসুলভ আচরণকে সহজভাবে মেনে নিতে পারছে না।
মূল সমস্যাটি লুকিয়ে আছে ভারতের কাঠামোগত এবং মনস্তাত্ত্বিক অবস্থানের ভেতরে। দক্ষিণ এশিয়ার মোট আয়তন এবং জনসংখ্যার প্রায় ৭৫ শতাংশই ভারতের দখলে। এত বিশাল অর্থনৈতিক এবং সামরিক ব্যবধানের কারণে ছোট প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। ভারত যখন সমমর্যাদার অংশীদার হওয়ার বদলে অভিভাবক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তখনই বিপত্তি ঘটে। আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কে কোনো রাষ্ট্রই অন্যের অভিভাবকত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের জটিল অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির গ্যাঁড়াকলে আটকে আছে তিস্তা চুক্তি। আসামের এনআরসি এবং সিএএ-এর মতো আইন বাংলাদেশে গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। তামিলনাড়ুর রাজ্য রাজনীতির কারণে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণ বারবার বাধাগ্রস্ত হয়। মূলত ভারতের কেন্দ্রীয় কূটনীতি অনেক ক্ষেত্রেই রাজ্যগুলোর সংকীর্ণ রাজনীতির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এই সমস্ত বিরোধের জেরে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম সার্ক আজ কার্যত মৃত একটি সংগঠনে পরিণত হয়েছে।
ভারতের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ভুলটি হলো, তারা বছরের পর বছর ধরে মনে করেছে যে কেবল প্রতিবেশী দেশের ক্ষমতাসীন সরকারগুলোকে তুষ্ট রাখতে পারলেই পুরো দেশটিকে পকেটে রাখা সম্ভব। কিন্তু একটি আধুনিক রাষ্ট্র কেবল সরকার দিয়ে চলে না, রাষ্ট্রের প্রকৃত চালিকাশক্তি হলো দেশের সাধারণ জনগণ। গত এক দশকে প্রতিবেশী দেশগুলোর অনেক স্বৈরাচারী বা অগণতান্ত্রিক সরকার নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ভারতের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। কিন্তু সেই সব দেশের সাধারণ মানুষ যখন বুঝতে পেরেছে যে এই সম্পর্কটি পুরোপুরি একপাক্ষিক এবং যাবতীয় ক্ষতির বোঝা তাদেরকেই বহন করতে হচ্ছে, তখন তাদের মনে ভারতের বিরুদ্ধে এক বিশাল ক্ষোভ এবং ঘৃণার পাহাড় জমেছে। বাংলাদেশ, নেপাল এবং মালদ্বীপের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ভারত স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের কথা অনেক বললেও প্রতিবেশী দেশের মানুষের অভিমান এবং সার্বভৌমত্বের বোধকে কখনোই ন্যূনতম সম্মান দেখায়নি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে সবচেয়ে বড় পুঁজি কোনো অস্ত্র বা ডলার নয়, বরং এটি হলো মানুষের আস্থা। একবার সেই আস্থা ভেঙে গেলে তা সহজে জোড়া লাগানো সম্ভব নয়। ভারত যদি সত্যিই দক্ষিণ এশিয়ার অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে নিজেকে দেখতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই আধিপত্যবাদী বড় ভাইয়ের আসন থেকে নেমে আসতে হবে। বাণিজ্যে ভারসাম্য আনা, অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা প্রদান করা এবং সীমান্তে মানবাধিকার রক্ষা করার মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে ভারতের আন্তরিকতা প্রমাণ করা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে বিপুল শক্তি আর আয়তন থাকা সত্ত্বেও ভারত তার নিজের উঠোনেই ধীরে ধীরে একঘরে হয়ে পড়বে। একটি বিশাল দৈত্য হওয়া হয়তো খুব সহজ, কিন্তু একজন সত্যিকারের নিঃস্বার্থ বন্ধু হওয়া অত্যন্ত কঠিন। ভারত শেষ পর্যন্ত কোনটি হতে চায়, সেটিই এখন দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির সবচেয়ে বড় এবং প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন।
তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস ২৪